সফল উদ্যোগপতির চোখে শুরুয়াতি ব্যবসার টোটকা

0

১৮ বছর আগে পারিবারিক ডাল প্রক্রিয়াকরণ (Pulse Processing) ব্যবসায় যোগ দিয়েছিলাম। সেইসময় কয়েকটি সমস্যার মুখোমুখি হয়েছিলাম। বাজারে ঠিকমত দানাশস্য মিলত না, গুদামে রাখার সময় শস্যের ক্ষতি ও সেভাবে আর্থিক সহায়তাও মিলত না। আমি এইসব সমস্যার সমাধান খুঁজতে শুরু করি। এই পথেই জন্ম নিল আমার সংস্থা SLCM Group (Sohan Lal Commodity Management). নামেই বোঝা যায় পারিবারিক ব্যাপার কতটা মিশে রয়েছে সংস্থার সঙ্গে।

এখনও পর্যন্ত এই গ্রুপ ভালোই কাজ করছে। ব্যবসায়িক বৃদ্ধিও হয়েছে। কিন্তু যাত্রাপথ ততটা সহজ ছিল না। বিভিন্ন প্রেক্ষিতে নেওয়া ভালো-খারাপ সিদ্ধান্ত থেকে আমি কিছু শিক্ষা পেয়েছি। এখন আমাদের সংস্থার ভিত্তি মজবুত। তাই চলার পথে যা জেনেছি বা শিখেছি তা অন্যদেরও জানাতে চাই। যে সব তরুণ নিজেদের মতো করে কিছু করার ইচ্ছা রাখেন আশাকরি তা তাদের কাজে লাগবে। ছ'টি পয়েন্টে ব্যাপারটা তুলে ধরলাম।

নিজের ওপর বিশ্বাস

তুমি যদি নিজেকে বিশ্বাস কর, একমাত্র তাহলেই অন্যরাও তোমাকে বিশ্বাস করবে। যে আইডিয়ার ওপর ভিত্তি করে তুমি কাজ করছ তাতে তোমার সম্পূর্ণ বিশ্বাস থাকা উচিত। তাহলেই তুমি তা অন্যদের বোঝাতে পারবে এবং কাজটা বাস্তবে রূপদান করতে পারবে। আমি যখন SLCM শুরুর সিদ্ধান্ত নিই, লোকজন খুব একটা উৎসাহ দেখায়নি। পরিবারের লোকজন ও বন্ধুরা আশঙ্কা প্রকাশ করেছিল। একই ক্ষেত্রে বহুদিন কাজ করা স্থানীয় কয়েকটি সংস্থাও আমার আইডিয়ায় ভরসা রাখতে পারেনি। সকলেই ভাবছিল, এতে আর কী হবে!এই আশঙ্কার একটা কারণ ছিল। বহুদিন চলে আসা একটা নিয়মের বাইরে আমি কাজ করার কথা ভাবছিলাম। আমি এমন একটা ধারণার ওপর কাজ করতে চাইছিলাম যা আগে হয়নি। বলতে পারেন এক্সক্লুসিভ আইডিয়া। আমার সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ ছিল, এই ক্ষেত্র সম্পর্কে প্রথাগত ধারণায় বদল আনা। আসলে এই ক্ষেত্রটাও তো গ্ল্যামারাস ছিল না। লোকে তাই ভাবত, যাহোক তাহোক ভাবে কাজ হলেই হল। আমি পুরো প্রসেসটাতেই বদল আনার চেষ্টা করলাম। এমনকী পলিসির ক্ষেত্রেও। আজ বলতে দ্বিধা নেই, আমার সংস্থা কিন্তু কাজটা পেরেছে। পুরো সাপ্লাই চেন প্রসেসটাকেই পণ্য ও পরিষেবায় নতুন রূপ দেওয়া গিয়েছে। আমি যা পরিকল্পনা করেছিলাম, বিশ্বাস রেখেছিলাম ঠিক সেটাই হয়েছে।

ভুল সিদ্ধান্ত থেকে শিক্ষা নিন

মানুষ মাত্রই ভুল করে থাকে। কাজ করতে গিয়ে সকলেরই ভুল হয়। কোনও সিদ্ধান্তই যেন মনের মতো হতে চায় না। কোনও একটা সিদ্ধান্ত নিতে ঘণ্টার পর ঘণ্টা লেগে যায়। কিছু-কিছু সিদ্ধান্তের ফলে সংস্থার ক্ষতিও হয়। কিন্তু থেমে থাকলে তো চলবে না। ভুল সংশোধনের মাধ্যমে এগিয়ে চলতে হবে। খুঁজে নিতে হবে পথ। এ ব্যাপারে আমার শুরুর দিকের একটা কথা জানাতে চাই। ব্র্যান্ডিংয়ের খরচকে আমি বাহুল্য মনে করতাম। খরচা কমানোর জন্য আমি তাই ব্র্যান্ডিংয়ে জোর দিতাম না। কিন্তু আমার এই সিদ্ধান্ত ঠিক ছিল না।বলা উচিত খুব বাজে একটা সিদ্ধান্ত ছিল। ব্র্যান্ডিং থেকেই কোনও জিনিস সম্পর্কে ভালো ধারণা তৈরি হয়। কোনও খারাপ ধারণা থাকলে তাতে পরিবর্তন আনা যায়। ব্র্যান্ডিং বাজে খরচ নয়, ব্র্যান্ডিংকে লগ্নি মনে করাই উচিত। পরে আমি ভুল শুধরে নিই। কিন্তু এই টানাপোড়েনে কিছুটা সময় নষ্ট হয়েছিল।

গ্রাহকের সুযোগ-সুবিধায় অগ্রাধিকার

কোনও সংস্থার পণ্য বা পরিষেবায় যদি গ্রাহক সন্তুষ্ট থাকেন, সেই সংস্থায় সাফল্য ধরা দেবেই। সেই সংস্থার শ্রীবৃদ্ধিও ঘটবে। মাথায় রাখতে হবে গ্রাহকের জন্য আমাদের খরচা করতে হয় না, উল্টে তারাই আমাদের টাকা দেয়। তাই গ্রাহককে কীভাবে সেরা জিনিসটি তুলে দেওয়া যায় তা সবসময় নজরে রাখতে হবে। পরিষেবায় এতটুকু ঢিলেমি দিলে চলবে না। SLCM-এ আমি পুরো প্রসেসটাকে এমনভাবে রেখেছিলাম যেখানে গ্রাহক বা কাস্টমার ছিল সর্বাগ্রে। এমন একজন আছেন যিনি ২০০৯ সাল থেকে আমাদের নিয়মিত গ্রাহক। আসলে তিনি আমাদের পরিষেবায় খুশি। গ্রাহকের এই খুশিকেই অগ্রাধিকার দিতে হবে।

খোলা মনে সকলের কথা শুনুন

Be open to suggestions. আপনি যতই শিক্ষিত হোন না কেন, যত বড়-বড় ডিগ্রিই আপনার থাকুক না কেন, অন্যদের মতামতকে অগ্রাহ্য করলে চলবে না। সংস্থার CEO বা MD হিসাবে আপনিই সবটা বোঝেন, এমন হামবড়া ভাব থাকা উচিত নয়। ভালো কোনও প্রস্তাব যে কারোর থেকেই আসতে পারে। সে তিনি টপ ম্যানেজমেন্টের লোক হতে পারেন, আবার একজন ট্রেনিও হতে পারেন। আবার এমন কেউ হতে পারেন আপনার সংস্থার সঙ্গে যার কোনও সম্পর্কই নেই। এবার আপনি খোলা মনে ভাবুন। সংস্থার প্রধান হিসাবে ফাইনাল কলটা তো আপনাকেই নিতে হবে। আর সেটা আপনার অধিকারও।

নিজের টিমের ওপর ভরসা রাখুন

আপনি আপনার সংস্থার কর্মীদের সঙ্গেই দিনের অনেকটা সময় কাটিয়ে থাকেন। বলতে পারেন তারাই আপনার দ্বিতীয় পরিবার। সংস্থার উন্নতির জন্য কর্মীদের সঙ্গে একাত্রতা খুবই জরুরি। দীর্ঘমেয়াদি ভিত্তিতে তাদের কার কী দক্ষতা তা আপনার কাছে স্পষ্ট হবে এবং সেই অনুপাতে আপনার সংস্থাও উন্নতি করবে। আবার একথাও বলব, প্রয়োজনে আপনাকে কড়াও হতে হবে। যে কাজের উপযুক্ত নয় বা আপনার দেখানো পথে চলতে চাইছে না তাকে বাদ দিতেই হবে। আপনার সেই সিদ্ধান্ত ঠিক না ভুল, তার উত্তরও সময় হলেই পেয়ে যাবেন।

নিজের স্বাস্থ্যের দিকে নজর রাখুন

স্টার্টআপ মানেই অনেকটা সময় দেওয়া, ঝুঁকি আর চাপ। সেই চাপ আপনাকে মানসিক অবসাদের দিকে ঠেলে দিতে পারে। আপনার স্বাস্থ্যেরও দ্রুত অবনতি ঘটতে পারে। কিন্তু তা হতে দিলে চলবে না। আপনার লিডারশিপের ওপরই দাঁড়িয়ে রয়েছে আপনার সংস্থা। আপনি যতটা প্রাণবন্ত হবেন, আপনার সংস্থাও ততটাই চনমনে থাকবে। তাই শরীর আর মন, কোনওটাকেই অবহেলা করলে চলবে না।

লেখক সম্পর্কে দু'কথা

এই প্রবন্ধের লেখক Mr. Sandeep Sabharwal. SLCM-এর Group CEO সন্দীপ। একসময় শুরুয়াতি সংস্থা হিসাবে কাজ করা এই সংস্থা এখন agri-logistics sector-এ প্রথম সারির কোম্পানিগুলির মধ্যে অন্যতম। প্রযুক্তি নির্ভর এই সংস্থার নেটওয়ার্কের মধ্যে রয়েছে ১৭টি রাজ্যে ছড়িয়ে থাকা ৭৬০টি গুদামঘর আর ১৫টি হিমঘর।