ই-সাইকেলে বিপ্লব এক মহিলা উদ্যোগপতির

0

একটি কনফারেন্সে যোগ দিতে স্বামীর সঙ্গে জাপান গিয়েছিলেন হেমলতা আন্নামালাই। সেখানে একজন বক্তা খুব জোরের সঙ্গেই জানান, ICE (Internal Combustion Engine) যুগ এখন অতীত, আগামী দিন হতে চলেছে ইলেকট্রিক চালিত গাড়ির। পেট্রোল-ডিজেল লাগবে না, গাড়ি দৌড়বে বিদ্যুতে। একাধিক স্টার্টআপ ব্যবসার অভিজ্ঞতা ছিল হেমলতার। কিন্তু উৎপাদন-ভিত্তিক কোনও ব্যবসা তাঁর কাছে নতুন। সেই নতুনের পথেই পা বাড়িয়ে দেন হেমলতা। ২০০৭ সালে প্রতিষ্ঠা করেন অ্যাম্পিয়ার ইলেকট্রিক (Ampere Electric). পূর্ব অভিজ্ঞতা না থাকা একটি বিষয়ে কাজ করতে গিয়ে পদে-পদে হোঁচট খেতে হয়। কিন্তু নাছোড় মনোভাব আর আত্মবিশ্বাস নিয়ে সব চ্যালেঞ্জেরই মোকাবিলা করেন হেমলতা। ফলও মিলেছে। ইলেকট্রিক গাড়ি নির্মাণে ভারতে নিজের জায়গা পাকা করে নিয়েছে অ্যাম্পিয়ার ইলেকট্রিক। এই সংস্থার প্রোডাক্টের মধ্যে রয়েছে ই-সাইকেল, ই-স্কুটার, ই-ট্রলি (মালপত্র বহনের জন্য), বর্জ্য পদার্থ বহনের বিশেষ গাড়ি। এমনকী প্রতিবন্ধীদের কথা ভেবেও গাড়ি বের করেছে অ্যাম্পিয়ার।

নেশায় উদ্যোগ

অস্ট্রেলিয়ার রয়্যাল মেলবোর্ন ইনস্টিটিউট অব টেকনোলজি থেকে MBA করেন হেমলতা। কম্পিউটার সায়েন্স ও ইঞ্জিনিয়ারিংয়ে ব্যাচেলরস ডিগ্রিও রয়েছে তাঁর। তবে ডিগ্রির থেকেও তাঁর বেশি রয়েছে নতুন কিছু করার তাগিদ। একজন উদ্যোগপতি হওয়ার স্বপ্ন ও প্রবল ইচ্ছাশক্তি। তাই মাত্র ২৭ বছর বয়সেই উদ্যোগপতির ভূমিকায় দেখা যায় হেমলতাকে। তাঁর প্রথম কয়েকটি উদ্যোগের মধ্যে রয়েছে প্রফেশন্যাল সার্ভিসেস, প্রযুক্তি প্রশিক্ষণ, ট্যুরস অ্যান্ড টিকেটিং, ইন্টারন্যাশনাল কনসালটেন্সি। গত ১৫ বছর ধরে এভাবেই একের পর এক উদ্যোগের সঙ্গে জড়িয়েছেন হেমলতা। তিনি মনে করেন, এই ধরনের উদ্যোগে রোজই নতুন চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হতে হয়, সাফল্য-ব্যর্থতা থাকে, কিন্তু সবমিলিয়ে প্রাপ্তির ভাঁড়ারটা অনেক বেশি। আর সেটাই তাঁকে বেশি করে টানে।

অ্যাম্পিয়ারে পুঁজির যোগান

২০০৭ সালে ৫ কোটি টাকা লাগিয়ে অ্যাম্পিয়ারের শুরুটা হয়। সম্প্রতি কোয়েম্বাতুর ভিত্তিক এই স্টার্টআপে বড় লগ্নি করেছেন রতন টাটাও। এই লগ্নি কাজে লাগান হচ্ছে ইলেকট্রিক গাড়ির মূল চারটি অংশের (ব্যাটারি, মোটর, চার্জার ও কন্ট্রোলার) উৎপাদন ও গবেষণায়। বিদেশের ওপর নির্ভরশীলতা কমিয়ে দেশেই এইসব জিনিস তৈরি করে নেওয়াটাই লক্ষ্য। ই-সাইকেল ও ই-স্কুটারের জন্য প্রয়োজনীয় 36V ও 48V চার্জার ইতিমধ্যেই তৈরি করে ফেলেছে অ্যাম্পিয়ার। B2C সেগমেন্টে সংস্থার প্রোডাক্টের মধ্যে রয়েছে ই-সাইকেল ও ইলেকট্রিক টু হুইলার। B2B ক্ষেত্রে সংস্থা বিক্রি করে থাকে ই-স্কুটার। টেক্সটাইলস ও স্পিনিং মিলের মহিলা কর্মীদের কথা মাথায় রেখে ডিজাইন করা হয়েছে 'ত্রিশূল'। এটি এমনই এক ধরনের ইলেকট্রিক চালিত গাড়ি যা চেপে সহজেই কারখানার বিভিন্ন প্রান্তে যেতে পারবেন ওই শ্রমিকরা।


হেমলতা আন্নামালাই
হেমলতা আন্নামালাই

অ্যাম্পিয়ারের উৎপাদন প্রক্রিয়া

শুরুর দিন থেকে রিসার্চ অ্যান্ড ডেভেলপমেন্টকে বিশেষ গুরুত্ব দিয়ে এসেছে অ্যাম্পিয়ার। সেই পথেই ভারতের প্রথম কোম্পানি হিসাবে ইলেকট্রিক গাড়ির জন্য 36V ও 48V চার্জার তৈরি করে তাক লাগিয়ে দিয়েছে এই স্টার্টআপ। ভারতে ইলেকট্রিক গাড়ি তৈরির ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় সমস্যা এই চার্জারই। বিদেশ থেকে যে সব চার্জার আমদানি করা হয় সেগুলি ভারতীয় রাস্তার উপযোগী নয়। পাওয়ার সাপ্লাইও ঠিকঠাক হয় না। শুধু চার্জার নয়, অ্যাম্পিয়ারের সব ই-গাড়ির মোটর ও কন্ট্রোলারের ডিজাইনও তৈরি করেছে সংস্থার রিসার্চ টিম। তৈরি করা হয়েছে বিশেষ এক ধরনের ব্যাটারি চিপ। যা ব্যাটারির কার্যকারিতা বাড়িয়ে দিয়েছে।রিসার্চ অ্যান্ড ডেভেলপমেন্টকে এতটাই গুরুত্ব দেওয়া হয় যে আয়ের একটা বড় অংশই এই খাতে ব্যয় করা হয়। এমনকী কর্মীদের ২০ শতাংশও এই টিমের সঙ্গে যুক্ত। আসলে এ সব কিছুই বিদেশি যন্ত্রাংশের নির্ভরশীলতা কমানোর লক্ষ্যে। ইলেকট্রিক গাড়ি তৈরির জন্য যে সব জিনিস লাগে তা মোটামুটি ভারতের বিভিন্ন প্রান্ত থেকেই সংগ্রহ করা হয়। তবে ব্যাটারির জন্য সীসা ও মোটরের জন্য ম্যাগনেট চিন থেকেই আমদানি করতে হয়। সেই নির্ভরশীলতাও কমানোর চেষ্টা হচ্ছে। হেমলতার সংযোজন বর্তমানে বছরে প্রায় ৩০ হাজার গাড়ি তৈরির ক্ষমতা রাখে অ্যাম্পিয়ার।

ই-সাইকেলের দাম কত?

সাধারণ দু'চাকার সাইকেলের তুলনায় ই-সাইকেলের দাম বেশি হওয়াটাই স্বাভাবিক। অ্যাম্পিয়ার বিভিন্ন মডেলের ই-সাইকেল তৈরি করে থাকে। মডেল অনুযায়ী দাম পড়বে ২০ থেকে ৩০ হাজার টাকা। আর ই-স্কুটারের ক্ষেত্রে সর্বনিম্ন দাম ২০ হাজার টাকা, আর সর্বোচ্চ দাম ৪৫ হাজার টাকা।

ব্যবসা বাড়ানোর পরিকল্পনা

একটা সময় মাসে ২০০টির মতো ই-স্কুটার বিক্রি করত অ্যাম্পিয়ার। ২০১০-১২ আর্থিক বছরে সরকার এই ক্ষেত্রে ভর্তুকি দেওয়ায় গাড়ির বিক্রি অনেকটাই বেড়ে যায়। একটা সময় মাসে সাতশোর মতো ই-স্কুটার বিক্রি করেছে এই সংস্থা। আসলে অ্যাম্পিয়ারের ব্যবসা অনেকটাই সীমাবদ্ধ রয়েছে দক্ষিণের চারটি রাজ্যে। আগামী তিন বছরের মধ্যে তা বাড়িয়ে দশটি রাজ্যে প্রসারিত করা হবে। চলতি বছরেই নামানো হবে নতুন দুটি মডেল। আর আগামী তিন বছরের মধ্যে তৈরি করা হবে সম্পূর্ণভাবে মহিলাদের দ্বারা পরিচালিত একটি ই-সাইকেল কারখানা। অ্যাম্পিয়ারে শুরু থেকেই মহিলা কর্মীদের বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়ে থাকে। সংস্থার মোট কর্মীসংখ্যার ৩০ শতাংশই যে মহিলা।


হেমলতা আন্নামালাই
হেমলতা আন্নামালাই

চাই সরকারি পৃ্ষ্ঠপোষকতা

বিশ্বজুড়ে জ্বালানির দাম উর্ধ্বমুখী। বাড়ছে পরিবেশ দূষণ। এই অবস্থায় বিকল্প পথের দিশা দিয়েছে ইলেকট্রিক চালিত দু'চাকার গাড়ি। ভারতে এখনও সেভাবে এই ক্ষেত্রে নজর পড়েনি। তবে আশার কথা, ২০২০ সালের মধ্যে প্রতি বছর ৭০ লক্ষ এই ধরনের যানবাহন পথে নামানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছে কেন্দ্রীয় সরকার। এই সিদ্ধান্তকে স্বাগত জানিয়েই হেমলতার বক্তব্য, ভারতে রাজ্যে-রাজ্যে কর ব্যবস্থাতেও (CST/VAT/LBT) সরলীকরণ দরকার ইলেকট্রিক গাড়ির জন্য। একইসঙ্গে দরকার সাইকেল চালানোর জন্য পৃথক রাস্তা।এমনকী যে সব পরিবার শুধুমাত্র ই-গাড়ি ব্যবহার করেন তাদের উৎসাহিত করতে বিশেষ আয়কর ছাড়েরও প্রস্তাব রেখেছেন তিনি।