অ্যানিমেশনের হাত ধরেই স্বপ্নের উড়ান সুরেশ এরিয়াতের

0

সৃজনশীলতা তাঁর মজ্জায়। সৃষ্টি তাঁর রক্তে। তবু সুরেশ কোনওদিন বিশ্বাস করতেন না যে তাঁর নেশা কোনওদিন পেশাও হতে পারে। কিন্তু কেউ কেউ বুঝেছিলেন। যেমন তাঁর অভিভাবক, তাঁর শিক্ষক। আজ এত বছর পর নিজের যাবতীয় সাফল্যের জন্য বারবার তাঁদের প্রতিই কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন সুরেশ এরিয়াত। স্টুডিও একসরাসের প্রতিষ্ঠাতা। ৩৫০-র বেশি অ্যাড ফিল্ম তাঁর ঝুলিতে। পেয়েছেন একেশার বেশি পুরস্কার।

কেরলের কোচির নিকটবর্তী ছোট্ট শহর ত্রিপুনিথুরা। সেখানেই ছোটবেলা কাটিয়েছেন সুরেশ। স্থানীয় চিন্ময়া বিদ্যালয়ে পড়ার সময়েই তাঁর আঁকা ছবি আর গান জনপ্রিয় হতে শুরু করে। মূলত অভিভাবক আর শিক্ষকের উদ্যোগেই স্থানীয় এবং রাজ্যস্তরের বিভিন্ন প্রতিযোগিতায় অংশ নিতেন সুরেশ। কিন্তু পরিবারের এত সমর্থন সত্ত্বেও সুরেশ কোনওদিন বিশ্বাস করতেন না যে নেশাই তাঁর পেশা হতে পারে। ফলে সাবধানী সুরেশ ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অফ ডিজাইনের পাশাপাশি আইআইটি-জয়েন্টের জন্যও প্রস্তুতি নিতে শুরু করে দেন।

“আমি আইআইটির জন্য প্রথমদিনের পরীক্ষাও দিয়ে এসেছিলাম। সেদিনই সন্ধেবেলা আমার পরিবার জানতে পারল যে আমি এনআইডি‍র প্রবেশিকা উতরে গেছি। এরপর আর আইআইটির দ্বিতীয় দিনের পরীক্ষা দিতে যাইনি। আমেদাবাদ যাওয়ার আগের এক মাস পরিবারের সঙ্গো সময় কাটিয়েছিলাম। ”


প্রথম পথ চলা

সালটা ছিল ১৯৯৮। তখনও অ্যানিমেশন একটা কনসেপ্ট ছিল। সেভাবে বাজার পায়নি। সুরেশ মুম্বইয়ের ফেমাস স্টুডিওজ-এর সঙ্গে গাঁটছড়া বেঁধে একটি অ্যানিমেশন ডিভিশন তৈরি করলেন যেখানে ভারতীয় পুরাতত্ত্ব আর ইতিহাস নিয়ে কনটেন্ট তৈরি হত। তাঁর কথায়, সেই সময়টায় হাতেকলমে কাজ শেখার দারুণ সুযোগ পেয়েছিলেন। পাশাপাশি অ্যাডফিল্ম আর অ্যানিমেশন ব্যবসারও অভিজ্ঞতা হতে শুরু করেছিল।


মূল চ্যালেঞ্জ

তবে ভাগ্য এত সহজে সুপ্রসন্ন হয়নি তাঁর। সাফল্য পায়নি তাঁর তৈরি লেজেন্ড অফ শিবাজি। কারণ সম্প্রচারকারী চ্যানেল আধ ঘণ্টার এপিসোডের জন্য ৭০ হাজার টাকার বেশি দিতে রাজি হচ্ছিল না। লোকসানের আশঙ্কায় ফেমাস স্টুডিওজ তাদের অ্যানিমেশন ডিভিশনের ঝাঁপ ফেলে দিল। কিন্তু তাও পিছপা হননি সুরেশ। নিজের টিমকেও হার মানতে দেননি। আরেকটি সুযোগের আর্জি নিয়ে ফেমাস স্টুডিওজের সঙ্গে আলোচনা চালিয়ে যান। পাশাপাশি বিভিন্ন অ্যাড এজেন্সির সঙ্গেও কথা চালাচালি শুরু করেন। ২-১টি প্রজেক্টও হাতে পান। কিন্তু তা যথেষ্ট ছিল না সুরেশের জন্য।

“ অনেক চেষ্টার পর চ্যানেল ভি আর এম টিভিকে কাজ দেওয়ার জন্য রাজি করলাম। এবার আমাদের কাজ সত্যিই ভাল হতে শুরু করল। ”

চ্যানেল ভি-র সিম্পু সিরিজ হোক বা এম টিভির পোগা সিরিজ। অ্যামারন ব্যাটারি, আইসিআইসিআই-এর চিন্তামণি ক্যাম্পেন যথেষ্ট জনপ্রিয় হয়েছিল সুরেশ অ্যান্ড কোম্পানির। ভারতের প্রথম অ্যানিমেটেড মিউজিক ভিডিও বিন্দু-ও সুরেশেরই সৃষ্টি।

একসরাসের জন্ম

ফেমাস হাউজ অফ অ্যানিমেশনের জন্মের এক দশক পর সুরেশ ও তাঁর স্ত্রী নীলিমা এরিয়াত পরবর্তী প্রকল্পের দিকে মন দেন। ২০০৯ সালে ফেমাস স্টুডিওজের কর্ণধার অরুণ রুঙ্গতার সহযোগিতায় নিজস্ব অ্যানিমেশন সংস্থা ‘একসরাস’ প্রতিষ্ঠা করেন। নীলিমা দিল্লি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ফাইন আর্টস-এ স্নাতক হওয়ার পর অ্যানিমেটর হিসেবে তাঁর পেশা জীবন শুরু করেন রাম মোহন বায়োগ্রাফিক্স-এ। সময়টা ছিল ১৯৯৪ সাল। অ্যানিমেশনে কোনও ডিগ্রি না থাকা সত্ত্বেও শুধুমাত্র আগ্রহের বশেই অ্যানিমেশন ইন্ডাস্ট্রিতে পা রেখেছিলেন নীলিমা। ১৯৯৮ সালে তিনি ফেমাস হাউজ অফ অ্যানিমেশনে যোগ দেন।

বর্তমানে ৩০ সদস্যের সংস্থা একসরাস। ডিজিটাল, সিনেমা, ওয়েব, টিভি যেকোনও চলনশীল মাধ্যমেই কাজ করার অভিজ্ঞতা রয়েছে এই অ্যানিমেশন সংস্থার।

“আমাদের ইউএসপি হল ডিজাইন। আমরা সেই ইউএসপিকে কাজে লাগিয়ে প্রোডাক্ট, বাই-প্রোডাক্ট তৈরি করি। অ্যানিমেশন আর ফিল্ম মেকিংয়ের গতে ধরা ছকের বাইরে বেরিয়ে সবসময় উদ্ভাবনের ছোঁয়া রাখার চেষ্টা করি।” নিজস্ব অ্যানিমেটেড শর্ট ফিল্মও তৈরি করে একসরাস।

কিন্তু একসরাসের পথ বরাবরই এমন মসৃণ ছিল না। ব্যবসায় নেমেছিলেন ১০ লক্ষ টাকা পুঁজি নিয়ে যার প্রায় পুরোটাই টিম তৈরি করতে এবং পরিকাঠামোর পিছনে খরচ হয়ে গিয়েছিল। সুরেশ এমনকী এও স্বীকার করে নেন যে তখন কর্মীদের পুরো মাসের মাইনে জোগাড় করতে, অফিসের ভাড়া জোগাড় করতেই কালঘাম ছুটে যেত। এর ওপর ছিল যন্ত্রপাতি আর সফটওয়্যারের পিছনে খরচ।

এখানেই শেষ ছিল না সমস্যার। তখন সুরেশদের কাছে ফেমাস স্টুডিওজের ব্র্যান্ডও ছিল না। ফলে ভাল প্রজেক্ট পেতেও সমস্যা হয়েছিল। কিন্তু সৌভাগ্যক্রমে ঊষা জানোম পার্ট ওয়ান পার্ট টু, ইয়ালোপেজেস, গোদরেজ ইজি, গুগল তাঞ্জোরের মতো প্রকল্প সফল হয়েছিল।

বর্তমানে একসরাসের ৫০টি ক্লায়েন্ট। এরমধ্যে রয়েছে হন্ডা, কার্টুন নেটওয়ার্ক, স্যামসাং, আইসিআইসিআই, ব্রিটানিয়া নিউট্রিচয়েস, নেসলে, হরলিক্স, সোনি পিক্স ফিল্মস, গুগল, ক্যাডবেরি জেমস, লিভাইস। ৮০-র বেশি প্রজেক্ট করার পরও একসরাসের কিন্তু কোনও নিজস্ব আয়ের মডেল নেই। সুরেশ জানালেন, প্রজেক্ট-বাবদ যা খরচ হয় তার ১৫-২৫ শতাংশ মার্জিনে লাভ থাকে সংস্থার।

সুরেশ বলেন,

“ব্যবসা আর উদ্ধাবন দুইয়ের মধ্যে ভারসাম্য রেখে চলি আমরা। যদি কোনও প্রজেক্টের সেই দক্ষতা না থাকে তবে আমরা সেই কাজ হাতে নিই না। তা সে যে এজেন্সি থেকে আসা কাজই হোক।”

স্বীকৃতি

সুরেশের কাজ সারা বিশ্বে বন্দিত। বিজ্ঞাপনের দুনিয়ায় ‘অস্কার’ বলে পরিচিত ক্লিও অ্যাওয়ার্ডসের জুরিদের একজন তিনি। ২০০৭ সাল থেকে একাধিক জাতীয় ও আন্তর্জাতিক জুরির সদস্য হয়ে আসছেন সুরেশ। ২০১৫-তে ফ্রান্সের আন্তর্জাতিক অ্যানিমেশন ফিল্ম ফেস্টিভ্যাল অ্যানেসি-তে পুরস্কৃত হন। ভারতের তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রকের উপদেষ্টা প্যানেলের অন্যতম সুরেশ এরিয়াত।


ভবিষ্যৎ

বিশুদ্ধ অ্যানিমেটেড কনটেন্টকে শর্ট ফিল্ম, ফিচার ফিল্ম, মিউজিক ভিডিওতে রূপান্তরিত করার পরিকল্পনা রয়েছে একসরাসের। পাশাপাশি ব্ৰ্যান্ডের জন্য একটু হটকে লাইভ অ্যাকশন অ্যাড ফিল্ম তৈরির ভাবনাও রয়েছে। কিন্তু নিজের কোর টিমের সম্প্রসারণ চান না তিনি। বরং অন্যান্য প্রোডাকশন সংস্থাকে আউটসোর্স করতে চান।

দেশের যুব সমাজকে তাঁর টিপস

যেই সমস্যাই আসুক, নিজের স্বপ্ন পূরণের লক্ষ্যে অবিচল থাকো। যদি নিজের কাজ নিয়ে তুমি সন্তুষ্ট থাক আর খুশি থাক, তবে অন্য কাজ খোঁজার প্রয়োজন পড়ে না। আজকের প্রতিযোগিতামূলক দুনিয়ায় খুব জরুরি নিজেকে আর পাঁচজনের থেকে আলাদা করে রাখা। তাই ক্রমাগত উদ্ভাবন প্রক্রিয়ার মধ্যে থাকা অত্যন্ত জরুরি। এই বিশ্বায়নের যুগে যেখানে রসদ ক্ষীণ হয়ে আসছে, সেখানে বিকল্পের সন্ধান করাটাও সমান গুরুত্বপূর্ণ। চটজলদি লাভের আশায় মত্ত হবে না। কারণ ক্ষণস্থায়ী লাভে বিশ্বের ক্ষতি হয় অনেক বেশি, দীর্ঘমেয়াদে যাতে আমাদেরই লোকসান।

লেখক অপরাজিতা চৌধুরী

অনুবাদ শিল্পী চক্রবর্তী