প্রকৃতিকে ভালোবাসতে শেখায় SHER

0

ঝাঁ চকচকে শপিং মল, আকাশছোঁয়া বিশালাকায় বহুতল, মসৃণ কংক্রিটের রাস্তা ধরে সার দিয়ে চলতে থাকা হরেক মডেলের দু-চাকা, চার চাকার যান। কেবলমাত্র মহানগর বা বড় শহর নয়, আধাশহর, শহরতলি বা মফস্বলে দাঁড়ালেও আজকের দিনে ছবিটা এরকমই। শহুরে আধুনিকতা আর নিত্যনতুন আবিস্কার হতে থাকা প্রযু্ক্তির দাপটে কখন যেন প্রকৃতি থেকে অনেক দূরে সরে গেছি আমরা। খেলার মাঠ, ফুলের বাগান, গাছপালা এখন আর আমাদের তেমন ভাবায় না। 'একটি গাছ একটি প্রাণ' কেবল একটা স্লোগান মাত্র। অন্যান্য জীবের তুলনায় শ্রেষ্ঠত্বের দম্ভে কবে যেন পিছনে ফেলে এসেছি 'বাস্তুতন্ত্র' শব্দটা। তাই তো, আমাদের প্রতি মুহূর্তে চোখে আঙুল দিয়ে বলে দিতে হয়, নিজের পাশাপাশি একবার অন্তত অন্যান্য জীবজন্তুর কথাও ভাবো। আর এই মনে করিয়ে দেওয়ার কাজটাই দক্ষতার সঙ্গে করে চলেছে SHER - Society for Heritage and Ecological Researches ।

এই সংস্থার কাজ সম্পর্কে কথা বলার আগে এই ভাবনার দুই রূপকার জয়দীপ কুণ্ডু এবং সুচন্দ্রা কুণ্ডুর সঙ্গে পরিচয় হওয়া দরকার। চিত্রগ্রাহক, প্রকৃতিপ্রেমী, অভিনেতা - নানা ভূমিকায় জয়দীপ আমাদের অনেকের কাছেই পরিচিত মুখ। তিনি এবং তাঁর স্ত্রী সুচন্দ্রা ওয়াল্ডলাইফ ফোটোগ্রাফি করতে গিয়ে এদেশের বিভিন্ন জঙ্গল চষে বেড়িয়েছেন। ওয়াইল্ডলাইফ ফোটোগ্রাফি অনেকেই করে থাকেন। তবে কুণ্ডু দম্পতি কিন্তু কেবল ছবি তুলেই থেমে থাকেননি। যাদের ছবি তুলে জনপ্রিয়তা অর্জন করেছেন সেইসব জীবজন্তুর কথা, তাদের নানা সমস্যা ভাবিয়েছে দুজনকেই। জয়দীপের মতে, "আমার ছবির যে বা যারা মূল বিষয়বস্তু, তাদের কথাই যদি না ভাবতে পারি তাহলে আমার ছবির মূল্য কী?" এই ভাবনার জায়গা থেকেই জয়দীপ এবং সুচন্দ্রা ধীরে ধীরে বনদফতরের সঙ্গে কাজ করতে শুরু করেন। তাঁদের কাজের কেন্দ্রবিন্দু ছিল 'বাঘ'। ব্যাঘ্রশুমারির কাজও করেছেন বেশ কয়েকবার। এভাবে চলতে চলতে দুজনেই উপলব্ধি করেন নির্দিষ্ট একটা সংস্থা গড়ে তুলতে না পারলে সঠিকভাবে কাজ করা সম্ভব নয়। যেভাবে একের পর এক প্রজাতি লুপ্তপ্রায় হয়ে পড়ছে তা ভাবাচ্ছিল জয়দীপ, সুচন্দ্রাদের। বিশেষ করে এরাজ্যের ঐতিহ্য হিসেবে সুন্দরবনের যে বাঘের কথা আমরা গর্ব করে বলি তার সংখ্যাতত্ত্বও তাঁদের কপালে দুশ্চিন্তার ভাঁজ ফেলেছিল। ভাবনাচিন্তা এগোতেই পাশে পেলেন কৌশিক ব্যানার্জী, সর্বরঞ্জন মণ্ডলের মতো বেশ কয়েকজন সমমনস্ক মানুষকে। ২০১১ সালে আনুষ্ঠানিকভাবে পথচলা শুরু করল SHER।

প্রথম থেকেই মানুষকে সচেতন করার বিষয়টিতে বিশেষভাবে গুরুত্ব দিয়েছে SHER। নেচার এডুকেশন তাদের কাজের একটা বড় ক্ষেত্র। ফুটবল ম্যাচ, স্কুলের ছাত্রছাত্রীদের নিয়ে Paint your green bag প্রতিযোগিতা, পথনাটিকার আয়োজন থেকে শুরু করে নন্দনে বিশেষ ছবির প্রদর্শনী - ছোট থেকে বড় সকলকে প্রকৃতি সম্পর্কে সচেতন করে তুলতে এধরনের নানা উদ্যোগ গ্রহণ করে চলেছে এই সংস্থা।

বিভিন্ন জঙ্গল এবং বনাঞ্চলের মানুষের জন্যেও বিশেষভাবে কাজ করছে SHER। সুন্দরবন টাইগার রিজার্ভের সঙ্গে যৌথভাবে নিয়মিত সেখানকার মানুষের জন্য হেল্থ চেক আপ এবং মেডিক্যাল ক্যাম্পের আয়োজন করে থাকেন তাঁরা। বনদফতরের সঙ্গে এইসব এলাকার মানুষদের সুসম্পর্ক বজায় রাখার বিষয়টিতেও বিশেষভাবে নজর দেওয়া হয়। ফরেস্ট গার্ডদেরকেও বিভিন্নভাবে সহায়তার ব্যবস্থা করা হয়েছে। জোর দেওয়া হচ্ছে  ফরেস্ট এবং ফ্রিঞ্জ এরিয়ার দুরত্ব কমানোর বিষয়টিতেও।

এই পৃথিবী সত্যিই সুন্দর। কেবলমাত্র আমাদের বুদ্ধিমত্তার অতিব্যবহার এবং সময়বিশেষে অপব্যবহারের দরুণ প্রযুক্তির কাছে হার মানতে বাধ্য হয়েছে প্রকৃতি। উষ্ণায়ন থেকে শুরু করে ভূমিকম্প বা সুনামি - সবকিছুর মূলেই আজ প্রাকৃতিক ভারসাম্যের অভাব। মানুষের ভুলেই সৃষ্টি হয়েছে এই পরিস্থিতি। তবে SHER-এর সদস্যরা মনে করেন ভালো কাজ করার সঠিক সময় বলে কিছু হয় না। আগামী প্রজন্মকে একটা সুন্দর পরিবেশ উপহার দিতে চায় SHER। আর সেই কারণেই, লক্ষ্য স্থির রেখে অক্লান্ত পরিশ্রম করে চলেছেন জয়দীপ কুণ্ডু এন্ড কোং।