কলকাতাকে সুস্থ রাখতে তিন তরুণের সারজিকা

0

অমিত ভাগত, কলকাতার মধ্যবিত্ত পরিবারের ছেলে। তথাকথিত ফ্যামিলি ডক্টর বলতে যা বোঝায় তাঁদের সেটা ছিল না। "এক রাতে হঠাৎ বাবার হার্ট অ্যাটাক হয়। ‘আমার মনে হচ্ছিল এভারেস্টের চূড়ায় নির্বান্ধব একাকী বোকার মতো দাঁড়িয়ে আছি। বুক ফেটে বেরিয়ে আসছিল একটাই প্রশ্ন। কী করব?" সেই দিনের কথা কোনও দিন ভুলবেন না অমিত। নেটে ভালই সড়গড়। কিন্তু কীভাবে এগোবেন? কোথায় বাবার চিকিৎসা করাবেন? এই সব প্রশ্নের উত্তরে পুরপুরি তথ্য দিয়ে তাঁকে সাহায্য করবে এমন কোনও সাইট খুঁজে পাচ্ছিলেন না। চিকিৎসার জন্য কত টাকা খরচ হবে আগে থেকে জেনে নিতে চাইছিলেন যাতে টাকাটা জোগাড় করে রাখা যায়। কিন্তু কোথায় কী? শেষ পর্যন্ত ঠিক করলেন বাবাকে নিয়ে বেঙ্গালুরু যাবেন। ভাগ্য সঙ্গে ছিল। সবকিছু ঠিকঠাক পেয়ে যাওয়ায় বাবাকে সুস্থ করে তুলতে পেরেছিলেন অমিত। সেদিনের সেই ঘটনা মনে গেঁথে থাকে কলকাতার এই বিজনেস গ্র্যজুয়েট তরুণের।

আরও মারাত্মক এক অভিজ্ঞতার কথা শুনুন। ২০১১ সালের ঘটনা। অমিতেরই আরেক বন্ধু অমরেন্দ্রকুমার। তাঁর ছোট্ট ভাইঝিকে ডাক্তার দেখে বলেছিলেন হৃদযন্ত্রে ফুটো আছে। দিল্লির এক নামি হাসপাতালের চিকিৎসক অপারেশন করানোর জন্য নাকি বারবার চাপ দিচ্ছিলেন। আরও কয়েকজন ডাক্তারের পরামর্শ নিয়ে জানা গেল অপারেশনের কোনও প্রয়োজনই নেই। তাহলে কী প্রতারণার শিকার হতে যাচ্ছিল অমরেন্দ্রর পরিবার?

অমিত এবং অমরেন্দ্র, দুই বন্ধু চিকিৎসা ব্যবস্থা নিয়ে নিজেদের এইসব অভিজ্ঞতার গল্প করতে করতেই ঠিক করে ফেলেন কিছু একটা করতে হবে। ‘একটা তথ্য দেখে অবাক হয়ে যাই। ১.২২ বিলিয়ন মানুষের মধ্যে অন্তত ৮৬ শতাংশ নিজেদের পকেট থেকে চিকিৎসার খরচ দেন। কারণ তাঁদের ইনসুরেন্স নেই’, দুজনেই হতবাক। আর যাদের ইনসুরেন্স আছে তাঁরা আবার হাসপাতাল এবং ডাক্তারের সম্পর্কে আগে থেকেই খোঁজ খবর নিয়ে নিতে চান। 

অমিত এবং অমরেন্দ্রর সঙ্গে যোগ দেন ওদেরই বন্ধু পিযুষ গুপ্তা। এই তিনজনের হাত ধরে স্বাস্থ্য সম্পর্কিত সমস্যা সমাধানে তাঁদের প্রথম স্টার্টআপ কলকাতা কেন্দ্রীক ওয়েবসাইট ‘সারজিকা’র আবির্ভাব।

স্বাস্থ্য পরিষেবার স্বচ্ছতা আনতে সাহায্য করে ‘সারজিকা’। চিকিৎসার খরচের তুল্যমূল্য বিচার, হাসাপাতালগুলি সম্পর্কে নানা তথ্য এবং অন্যান্য স্বাস্থ্য পরিষেবা যেমন, কোনও কিছুর ব্যাপারে দ্বিতীয় পরামর্শ নেওয়া, অ্যাপয়েন্টমেন্ট বুক করে দেওয়া এবং ভিডিও কনফারেন্স বা ভিডিও ক্লিপের মাধ্যমে পরামর্শ, আলোচনার ব্যবস্থা করে। গ্রাহক তাঁদের বক্তব্য এবং প্রশ্ন সাইটে পোস্ট করতে পারেন, সারা বিশ্ব থেকে বেছে নেওয়া চিকিৎসকরা তার উত্তর দেন। ২০১২ সালে শুরু হয়। এই অল্প কদিনেই বড় বড় প্রথম সারির হাসপাতাল এবং নার্সিংহোম যেমন, অ্যাপলো, নারায়াণা রুদ্রালয়া, ফোরটিস, মণিপাল হসপিটালের সঙ্গে গাঁটছড়া বাঁধা হয়ে গিয়েছে। একই সঙ্গে নামি ডাক্তারদেরও সঙ্গে পেয়েছে ‘সারজিকা’। আনুমানিক খরচ সহ চিকিৎসা পদ্ধতির নানা তথ্য রয়েছে। অমিত জানান, ‘বর্তমানে সারা দেশে আমাদের চারশরও বেশি হাসপাতাল এবং সাড়ে তিনশর ওপর ডাক্তার রয়েছেন’। অমিতের মতে, সাইটের প্রথম টার্গেট হচ্ছে সেইসব গ্রাহক, যারা অনলাইনে ডাক্তারদের কাছ থেকে চিকিৎসা সম্পর্কে পরামর্শ চান। তিনি জানান, গ্রহকদের কী কী জিজ্ঞাস্য রয়েছে সেগুলি নিয়মিত দেখা হয়। শুধু দেশের মধ্যে নয় বিদেশের যেমন, সিঙ্গাপুর এবং তাইল্যান্ডের নানা হাসপাতালের সুলুক সন্ধানও দেয় এই ওয়েবসাইট।

‘সারজিকা’ ওয়েবসাইটে সাইন আপ করার আগে ব্যবহারকারীকে রেজিস্ট্রেশন ফি বাবদ ৫৫ টাকা দিতে হয়। আরও হাজারের ওপর ইউসারের দেখা মিলবে সাইটে। ওয়েবসাইট থেকে যে B2C পরিষেবা পাওয়া যাবে সেগুলি হল-

  1. ট্রিটমেন্ট কানেক্ট- ১ ডলার বা ৫৫ টাকা দিলেই মিলবে এই পরিষেবা। হাসপাতাল সম্পর্কে সংক্ষিপ্ত পরামর্শ, চিকিৎসার আনুমানিক খরচ এবং চিকিৎসার কী কী ব্যবস্থা আছে রোগী জানতে চান। বিশ্বাসযোগ্য তথ্য রোগীর হাতে তুলে দিয়ে সিদ্ধান্ত নিতে সাহায্য করে।
  2. ই-কানেক্ট- ৯ ডলার বা ৪৫০ টাকা দিলেই কোনও নির্দিষ্ট রোগের চিকিৎসা নিয়ে চিকিৎসকদের পরামর্শ এবং তথ্য পাওয়া যাবে।
  3. ভিডিও কানেক্ট- ১৯ ডলার বা ১০৫৫ টাকা থেকে শুরু হয় এই পরিষেবা। বিভিন্ন হাসপাতালের সঙ্গে পার্টনারশিপের মাধ্যমে এই পরিষেবা দেওয়া হয়। যার লক্ষ্য, ভিডিওর মাধ্যমে আলোচনার ফলে রোগীর মনে বিশ্বাস জন্মানো এবং সন্দেহ দূর করা, বিশেষ করে রোগী যখন এক শহর থেকে অন্য শহরে চিকিৎসার জন্য যাবেন বলে ঠিক করেন।
  4. ইনবিল্ট নলেজ ব্যাঙ্ক- এই ক্ষেত্রে রোগী সারজিকার ডাটাবেস থেকে নিখরচায় দেখে নিতে পারেন চিকিৎসার মোটামুটি খরচ কী দাঁড়াবে।

সার্জিকা আপাতত তথ্য সংগ্রহের উপর জোর দিচ্ছে। এই তথ্যে ভর করে রোগী বা তাঁর আত্মীয়রা চিকিৎসা পরিষেবা সম্পর্কে সম্যক জ্ঞান পাবেন। যে কোনও চিকিৎসক বা হাসপাতাল সম্পর্কে আরও স্বচ্ছ ধারনা দিয়ে দেবে এই ওয়েবসাইট। এখানেই থেমে থাকতে চায় না সারজিকা। 

তিন তরুণ উদ্যোক্তা মনে করেন আরও অনেক কিছু করার আছে। ‘হাসপাতাল, নার্সিংহোমগুলির জন্য সাবস্ক্রিপশন ভিত্তিক কিউ ডেস্ক লঞ্চ করার পরিকল্পনা আছে আমাদের। এই কিউ ডেস্কের মাধ্যমে হাসপাতাল এবং ক্লিনিকগুলি পরস্পরের সঙ্গে জুড়ে থাকবে এবং হেলথ কেয়ার সার্ভিস ডেলিভারির জন্য সিআরএম ডিজাইনের ফিচার থাকবে’, বলেন অমিত। খুব শিগগিরই তাদের অ্যাপও লঞ্চ হতে চলেছে। সারজিকার সঙ্গে যে হাসপাতাল বা নার্সিংহোমগুলি রয়েছে তার সংখ্যা ৩৫০ ছাড়িয়ে গিয়েছে। একসপ্তাহ অন্তর অন্তর ১৫ টি করে নতুন সেন্টার যুক্ত করার লক্ষ্য রয়েছে তিন তরুণ উদ্যোক্তার।