কোচবিহারের শীতলপাটিতে বানিজ্যের ‘‌উষ্ণ’ অভ্যর্থনা

0

বিছানা বা মেঝেতে ব্যবহারের জন্য এক সময় থমকে গিয়েছিল শিল্পের চাকা। জুতো, ব্যাগ, ফাইল, লাইট স্ট্যান্ডের মতো ঘর সাজানোর রকমারি সামগ্রী বানিয়ে ক্রেতাদের বদলে যাওয়া রুচিকে ধরতে পেরেছিলেন শিল্পীরা। তাই হারিয়ে না গিয়ে দারুণভাবে ফিরে এসেছে কোচবিহারের শীতলপাটি। শুধু উত্তরবঙ্গের ওই জেলাতেই বছরে অন্তত ১২০ কোটি টাকার ব্যবসা হয়। শীতলপাটির হাত ধরে জেলার প্রায় তিরিশ হাজার শিল্পী অভাব ভুলেছেন।


বলতেই পারেন শীতল অভ্যর্থনা। প্রচন্ড গরমের সময় শীতলপাটিতে দু দন্ড বসার সুযোগ পেলে এর বাইরে আর কী বা মনে হতে পারে। আর শিল্পীদের মনের অবস্থা এখন ক্রেতাদের মতো। কারণ সারা বছর তাঁরা কাজ পান। কোচবিহার ১ ও ২ নম্বর ব্লক, মাথাভাঙার একাংশ, তুফানগঞ্জ ১ ও ২ নম্বর ব্লক এবং দিনহাটা ২ ব্লকের জীবন-জীবিকা সব কিছুই শীতলপাটি সর্বস্ব। কোচবিহারের ধলুয়াবাড়ি বলা যেতে পারে এর রাজধানী। জেলার প্রায় তিরিশ হাজার শিল্পী প্রত্যক্ষভাবে এই পেশার সঙ্গে যুক্ত।


জানা যায়, পূর্ববঙ্গ থেকে আসা লোকজনই শীতলপাটিতে প্রথম হাত লাগান। তাদের দেখে এলাকার রাজবংশী এবং অন্যান্য সম্প্রদায়ের লোকজনও বুঝতে পারেন পাটি তৈরি করলে আর জমির ওপর নির্ভর করে থাকতে ‌হবে না। কোচবিহারে এই কুটির শিল্পের ফুলে ফেঁপে ওঠার পিছনে রয়েছে ভৌগলিক অবস্থান। অর্থাৎ, কাঁচামাল নিয়ে এখানকার শিল্পীদের চিন্তা করতে হয় না। কারণ কোচবিহারের বিভিন্ন জায়গায় বিঘের পর বিঘে জমিতে চাষ হয় মোত্রা গাছ। স্থানীয় ভাষায় একে বেত গাছও বলা হয়। মোত্রা গাছের ওপরের মসৃণ ছাল থেকেই এই আশ্চর্য কারুকাজ তৈরি করেন শিল্পীরা। আর এই শিল্পের সুবাদে সবথেকে বেশি উপকৃত হচ্ছেন মহিলারাই। পরিবারের কর্তারা অন্য কাজে, আর গিন্নীরা শীতলপাটি বুনে এখন স্বনির্ভর হয়েছেন। প্রতিমা রায় নামে এক শিল্পীর কথায় মেয়েদের এই পেশায় আসার পিছনে অন্যতম অবদান ছিল টগর রানি দাসের। শীতলপাটির জন্য ১৯৯৩ সালে এই শিল্পী জাতীয় পুরস্কার পেয়েছিলেন। পুরস্কার পেয়ে থেমে থাকা নয়, টগরদেবী মেয়েদেরকে এই কাজের প্রশিক্ষ‌ণের ব্যবস্থা করেন। সেই সুবাদে মেয়েরাও এখন এই শিল্পের মুখ হয়ে উঠেছে।


কয়েক দশক আগে কোচবিহারের শীতলপাটি শুধুতে বাড়ির বিছানায় বা মেঝেতে বসার জন্য মূলত তৈরি হত। এই কাজ করতে করতে যেমন শিল্পীদের মধ্যে একঘেয়েমি এসে গিয়েছিল, তেমনই ক্রেতারাও তেমন একটা সাড়া দিচ্ছিলেন না। সরকারি উদ্যোগ ও কিছু উদ্যোগপতি ও সমবায় সমিতির নিজস্ব চেষ্টায় নিত্যনতুন ডিজাইনে বোনা হতে থাকে শীতলপাটি। শুধু পাটিতে না আটকে থেকে ভ্যানিটি ব্যাগ, কভার ফাইল, ল্যাম্প, জুতো, ছাতার মতো সৌখিন সামগ্রী তৈরি হতে থাকে। নকশার কিছু বদল আর সামগ্রীতে নতুনত্ব আসায় শীতলপাটির বাজার আবার চাঙ্গা হয়।


প্রশাসনের পাশাপাশি বেশ কিছু বেসরকারি সংস্থার পরামর্শ ও প্রশিক্ষণের ফলে শিল্পীরা নতুন নতুন নকশা বানিয়ে ক্রেতাদের চাহিদা ধরতে পেরেছেন। কোচবিহার এক নম্বর ব্লক পাটি শিল্প সমবায় সমিতি তাদের সদস্যদের এই কাজটা গত ১৬ বছর ধরে করে চলেছে। সমতির সম্পাদক গোবিন্দ দে বলেন, ‘‘শুধু দেশের বাজার নয়, বিদেশেও শীতলপাটির ভাল কদর রয়েছে। গত বছরের জুলাইয়ে ফ্রান্সে এক হস্তশিল্প প্রদর্শনীতে গিয়েছিলাম। সেখানে আমাদের সামগ্রী নিয়ে স্থানীয়দের মধ্যে দারুণ আগ্রহ ছিল। শীতের দেশ হওয়ায় ওখানে শীতলপাটির ট্রে প্রচুর বিক্রি হয়। সমিতির মাধ্যমে কাজ করেন প্রায় সাড়ে চার হাজার শিল্পী।’’ গত আট বছর ধরে এই সমিতি শিল্পীদের জন্য নানারকম সেমিনার, ওয়ার্কশপের আয়োজন করেছে। বাইরে থেকে ডিজাইনারদের এনে আরও কীভাবে নতুন নতুন নকশা তৈরি করা যায় তার নিরন্তর চিন্তাভাবনা চলছে। এমনকী শিল্পীদের জন্য ব্যাঙ্ক লোনের ব্যবস্থা করে দিচ্ছে তারা।


আধুনিকতার সঙ্গে তাল মিলিয়ে কোচবিহারের পাটি শিল্পীরা কাজ করছেন। ঘর সাজানোর নানা রকম সামগ্রীর পাশাপাশি মোদি কোট, নেহরু কোট তারই অঙ্গ। শিল্পীরা ২০০ টাকা থেকে ৩০০ টাকা মজুরি পান। উত্পাদিত পাটি ১০ থেকে ২০ শতাংশ লাভে বিক্রি হয়। কোচবিহারে এই পাটি বিক্রির জন্য সপ্তাহে দুবার হাট বসে। সেখানে প্রায় ২.৫ কোটি টাকার লেনদেন হয়। বছরে এই শিল্পে ১০০ কোটি টাকার বেশি ব্যবসা হয়।

Related Stories