‘অটিজম’ শিশুদের সামাজিকতার ‘স্পর্শ’

0

অটিজম সম্পূর্ণ নির্মূল হয় না, তবে সঠিক সময়ে সঠিক শিক্ষা তাকে নিয়ন্ত্রণে রাখতে পারে। নয়তো অ্যালবার্ট আইনস্টাইন, অ্যামাদিয়াস মোজার্ত, আইজ্যাক নিউটন, মাইকেল এঞ্জেলো-রা জিনিয়াস হতেন না। ঠিকই শুনছেন, এঁরা প্রত্যেকে একসময় অটিজম আক্রান্ত ছিলেন।


রাষ্ট্রসংঘের তরফে জানানো হয়েছে, সারা বিশ্বজুড়ে ৭কোটি মানুষ অটিজম আক্রান্ত। তার মধ্যে ১কোটি মানুষ ভারতেই রয়েছেন। এর মধ্যে মাত্র ৬লক্ষ মানুষ সরকারি সহায়তা পাচ্ছেন। বাকিদের মধ্যে অনেকের ন্যূনতম চিকিৎসাটুকুও জুটছে না।


এই সব শিশুদের পাশে দাঁড়াতেই ২০০৫ সালে সুরভি ভার্মা তৈরি করেন ‘স্পর্শ ফর চিল্ড্রেন’। অটিজম এবং ডিস্লেক্সিয়ায় আক্রান্ত শিশুদের এখানে বিশেষ ধরনের প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়। সুরভি স্নাতকোত্তর করেছেন বরোদার মহারাজা সয়াজিরাও বিশ্ববিদ্যালয় থেকে। কিন্তু সেখানে অটিজম সম্পর্কে যথেষ্ট তথ্যাবলি ছিল না। এখান থেকেই সুরভির মধ্যে আরও প্রশ্ন জাগতে শুরু করে এবং অটিজম আক্রান্ত বাচ্চাদের সঙ্গে আরও বেশি করে সময় কাটানোর উদ্দ্যেশেই তিনি তৈরি করেন ‘স্পর্শ’। একটা বাচ্চাকে সমাজের মুলস্রোতে ফিরিয়ে আনাটাই ‘স্পর্শ’-এর লক্ষ্য। বিশেষ প্রশিক্ষণের মধ্যে পড়ছে ‘অক্যুপেশনাল থিয়োরি’, ‘প্লে অ্যান্ড স্টাডি গ্রুপস’, ‘আর্লি ইন্টারভেশন সেন্টার’, ‘স্পিচ অ্যান্ড ল্যাঙ্গুয়েজ থেরাপি’, ‘সাইকোলজিক্যাল অ্যান্ড ফ্যামিলি কাউন্সিলিং’ ইত্যাদি। সুরভি জানিয়েছেন, অটিজম আক্রান্ত সব বাচ্চার প্রকৃতি কিন্তু এক রকমের হয় না। এক একটি বাচ্চার অবস্থা এক এক রকমের হয়। কেউ কেউ কথা বলতে পারে না, আবার কেউ কেউ কথা বলতে পারে, কিন্তু ভাষায় দেখা যায় কোথাও অসুবিধা আছে।


আবার কোনও বাচ্চা খেলনা নিয়ে খেলে না, কারও আবার খেলার জিনিসে রকমভেদ আছে। গবেষকরা এই ধরনের শিশুদের অবস্থা বিশ্লেষণ করেছেন। ভবিষ্যতে যাতে আরও দ্রুত এ ব্যাপারে সঠিক চিকিৎসা করা যায়, সে ব্যাপারে আরও পরীক্ষানিরীক্ষা করা হচ্ছে।


কিন্তু ভারতে এখনও অটিজম-এর ব্যাপারে পরিপূর্ণ ধারণা মানুষের মধ্যে গড়ে ওঠেনি। এখনও বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই এইসব বাচ্চাদের সমাজের কলঙ্ক হিসবে গণ্য করা হয়। সুরভির মতে, সমাজই তাদের মেনে নিতে পারে না। যার জন্য বাবা-মায়েরাও বাচ্চাদের লোকসমক্ষে আনতে লজ্জা পান। আমাদের দেশে এইসব মানুষের জন্য বিশেষ আইন রয়েছে, কিন্তু সাধারণ মানুষ অনেকেই সে বিষয়ে অজ্ঞাত রয়েছেন। সুরভি জানিয়েছেন, সমাজকে আগে জানাতে হবে এরা মানসিক ভাবে অসুস্থ নয়, বরং মানসিক ভাবে পিছিয়ে রয়েছে। অটিজম-আক্রান্তরা যদি মানসিকভাবে অসুস্থ হত, তাহলে অ্যালবার্ট আইনস্টাইন তৈরি হতেন না।


অনেক সময় বাবামায়েরাই মানতে চান না, তাঁদের সন্তানের অটিজম রয়েছে। যার ফলে একটা বাচ্চার চিকিৎসা শুরু হতে অনেক দেরি হয়ে যায়। দেড় বছর থেকে যদি নিয়মিত চিকিৎসা শুরু করা যায়, তাহলে এই ধরনের শিশুরা স্বাভাবিক জীবনের সঙ্গে মানিয়ে নিতে পারে। ‘স্পর্শ’-এর প্রশিক্ষণেই সাধারণ জীবনে ফিরতে পেরেছে ‘আর’ এবং ‘এ’। এদের নাম পরিবর্তন করা হয়েছে। 


মাত্র ৩ বছর বয়সে ‘আর’ ‘স্পর্শ’-এ আসে। বর্তমানে সে দক্ষিণ দিল্লির একটি নামি স্কুলে পড়ে। ক্লাসে পরীক্ষায় ৪০জনের মধ্যে সে দশম স্থান অধিকার করেছে। শুধু তাই নয়, ‘ম্যাথ অলিম্পিয়াড’ এবং ফুটবল প্রতিযোগিতাতেও সে যোগদান করেছে। স্কুলের প্রিন্সিপাল অবাক হয়ে তার বাবা-মাকে জিজ্ঞাসা করেছেন, আদৌ ‘আর’ অটিজম আক্রান্ত কিনা?

‘এ’ ছ’বছর পর্যন্ত কোনও স্কুলে জেতে পারেনি। বর্তমানে তার বয়স ১৭। একাদশ শ্রেণিতে পড়ে। দশম শ্রেণির পরীক্ষায় ইংরেজি এবং ‘বিজনেস স্টাডিস’-এ সবচেয়ে বেশি নম্বর পেয়েছে সে।

‘স্পর্শ’-এর সাফল্য এখানেই।