পূর্বাঞ্চলের প্রথম ই-বর্জ্য রিসাইক্লিং সংস্থা Hulladek

1
আপনি কি জানেন, ভারতে প্রতি বছর কত পরিমাণ ই-বর্জ্য তৈরি হয়? শুনলে চক্ষু ছানা বড়া হয়ে যাবে। ১৪ লক্ষ টন। আপনার বাড়ি থেকেই কম করে পনের থেকে কুড়ি কিলো ই বর্জ্য প্রতিবছর আপনি ফেলে দেন। তারপর সেগুলো কী হয় খোঁজ রাখেন কি!

দূষণ তৈরি করে। দক্ষতার সঙ্গে সেই সব ই-বর্জ্যগুলি ম্যানেজ না করা হলে পরিবেশের বাস্তুতন্ত্র ভেঙে যায়। বিপন্ন হয়ে পড়ে প্রকৃতি। সচেতন না হলে আপনি জানতেও পারেন না অথচ আপনার হাত দিয়েই ঘটে যায় প্রকৃতির সব থেকে বড় ক্ষতি। এই বিষয়ে বছর পাঁচেক আগে কলকাতার এক যুবকের টনক নড়ে। স্বপ্ন দেখেন এই সমস্যার একটা ব্যবসায়িক সমাধান করবেন। যেমন ভাবা তেমন কাজ। দীর্ঘ চার-পাঁচ বছরের ক্রমাগত লড়াইয়ে আজ সাফল্যের মুখ দেখেছেন নন্দন মাল। তাঁর সংস্থা Hulladek এখন মাসে ৬০০ কিলো থেকে দশ হাজার কিলো ই বর্জ্য রিসাইকেল করে। এভাবেই কলকাতাকে ফিরিয়ে দেয় কলকাতার সবুজ প্রকৃতি। আসব ও সাফল্যের কথায় তার আগে লড়াইয়ের গল্পটাও শুনে নিই।

কলকাতার স্প্যানিশ কাফে তে বসে এক আন্তরিক আলাপচারিতায় নন্দন বলছিলেন তাঁর লড়াইয়ের কাহিনি। বলছিলেন ও তিন প্রজন্মের ব্যবসায়ী। বাপ ঠাকুরদা সকলেই নানান ব্যবসায় যুক্ত। ব্যবসায়ীর ছেলে ব্যবসায়ী হবে এমন বাধ্যতা না থাকলেও নন্দন ছোটবেলা থেকেই উদ্যোগপতি হতে চেয়েছিলেন। ব্যবসাটা ভালো করে শিখতে কমার্স নিয়ে সেন্টজেভিয়ার্সে ভর্তি হন। স্নাতকস্তরে পড়ার প্রথম বছরেই কয়েকজন বন্ধু মিলে বিজনেস প্ল্যান নিয়ে একটি জাতীয়স্তরের প্রতিযোগিতায় নাম দিয়ে ফেলেন। সেসময় সাতপাঁচ ভেবে ই ওয়েস্ট ম্যানেজমেন্ট নিয়ে একটি সংস্থা তৈরি করার স্বপ্ন দেখা শুরু। কথা দারুণ বলেন। ফলে বন্ধুদের হয়ে তিনিই বিজনেস প্ল্যান বোঝাতেন বিচারকদের। বলতে বলতেই আরও গভীর হতে থাকে ধারণা। আবিষ্কার করেন এই এমন একটি ক্ষেত্র যেখানে সমাজের মঙ্গল হতে পারে। আর পাশাপাশি ব্যবসাও।

সত্যিই তো আমরা প্রতিদিন কত আবর্জনা তৈরি করি। অর্গানিক যা কিছু প্রকৃতি সেগুলো নিজের কোলে টেনে নেয়। কিন্তু ই-বর্জ্য সে তো প্রকৃতিতে ফিরে যাওয়ার নয়। বরং প্রকৃতির দূষণ ছাড়া আর কিছুই করে না। অথচ এই বর্জ্যগুলি থেকে বাছাই করে রিসাইকেল করার মত অনেক যন্ত্রাংশ থেকে যায়। যেগুলি পুনর্ব্যাবহার সম্ভব। ফলে এই বাংলার প্রাচীন প্রবাদ, "যেখানে দেখিবে ছাই/ উড়াইয়া দেখ তাই/ পাইলেও পাইতে পারো/ অমূল্য রতন।" যেন ওর মাথার ভিতর বাসা বেঁধে ফেলল।

সেই সময় গোটা দেশে মাত্র তিনটি সরকারি অনুমোদিত সংস্থা এই রি-সাইক্লিংয়ের কাজ করত। ফলে নন্দন দের বিজনেস আইডিয়া সকলেরই ভালো লাগে। অনেক অনুপ্রেরণা পান নন্দন। কিন্তু বাণিজ্যিকভাবে সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দেওয়ার মত লোকের অভাব ছিল। কিন্তু ওই ডাক শুনে কেউ না এলে একলা চলতে হয়। তাই একলাই ধুনি জ্বালিয়ে রাখেন। মাত্র কুড়ি একুশ বছরের ছেলে কেবলই ভাবতে থাকে কীভাবে পৌঁছবে তাঁর স্বপ্নে। রাস্তার ওপর উপচে পড়া ডাস্টবিন দেখলেই মনে হত তাঁর স্বপ্নের সম্ভাবনার কথা। দ্বিতীয় বর্ষে পড়া চলাকালীন এনআইআইটির একটি ফ্র্যাঞ্চাইজি খুলে বসেন। ২০১০ থেকে শুরু হয় সেই উদ্যোগ দারুণ চলছিল। হাতে কলমে ব্যবসা চালানোর অ-আ-ক-খ শিখে ফেলছিলেন নন্দন। ২০১৩ পর্যন্ত টানা তিন বছর এরকম চলার পর ফ্র্যাঞ্চাইজি বিক্রি করে দিলেন নন্দন সেই টাকায় এবার স্বপ্ন সফল করার পথে পা বাড়ালেন তিনি। শুরু হল পূর্বভারতের প্রথম রি-সাইক্লিং কোম্পানি Hulladek তৈরি করার কাজ। ভারতীয় বিভিন্ন সংস্থার দ্বারস্থ হয়েছেন। এরই মধ্যে গোটা দেশ চষে ফেলেছেন। কিন্তু তেমন সাড়া পাননি।

এবার চেষ্টা শুরু করলেন বিদেশে। ইউরোপের বেশ কয়েকটি সংস্থা নন্দনদের সঙ্গে কাজ করতে উৎসাহ দেখাল। তাদের মধ্যে স্পেনের Indumetal Recycling নামের একটি সংস্থা দেখা করতে চাইল নন্দনের সঙ্গে। স্পেনের বিলবাওয়ে ওই সংস্থায় বছর খানেক থেকে হাতে কলমে ই-বর্জ্য রি-সাইক্লিংয়ের কাজ শিখলেন নন্দন। ফিরে এসে কলকাতায় খুলে ফেললেন তাঁর এতদিনের স্বপ্নের ব্যবসা। তার এই যাত্রাপথে এমজে গ্রুপ অব কোম্পানিজও দারুণ সহযোগিতা করেছে। কিন্তু হুল্লাডেক গত এক বছরে পূর্বাঞ্চলে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি করতে পেরেছে।

নন্দনকে জিজ্ঞেস করেছিলাম, কিভাবে লড়লেন এই টানা লড়াই। সুদীর্ঘ সময় ধরে একবগ্গা হয়ে লড়ে যাওয়ার রশদ পেলেন কোথা থেকে? নন্দন বলছিলেন আরও একটি গল্প। নিজের জীবনের। প্রেম। প্রেম ভেঙে যাওয়া। জীবনে গুরুত্ব কাকে দেবেন কত টুকু দেবেন সেসব নিয়ে তৈরি হওয়া ধাঁধা এবং সব হেঁয়ালি ভেঙে দিতে পারার মত সাফল্যের খোঁজ এসবই ওকে জাগিয়ে রেখেছিল টানা পাঁচ বছর। কিন্তু সব থেকে অদ্ভুত হয়েছিল ও যখন জীবনে মৃত্যুকে সামনা সামনি দেখেছিল। হ্যাঁ আপনি ঠিকই পড়ছেন। ও মৃত্যুকে সামনে এসে দাঁড়াতে দেখেছেন। এবং তাঁকে অতিক্রম করে চলে গেছেন। এবং তার পর থেকে আর পড়ে যাওয়ার ভয় পান না।।

ওর চিরকাল উঁচুতে উঠতে ভয় ছিল। তিন তলার ওপর থেকে নিচে তাকালে মাথা ঘুরত। গা গোলাত। ভীষণ আতঙ্কিত থাকত ও। সিভিয়ার ভার্টিগো নিয়ে অনেক ভুগেছেন। কিন্তু সুইজারল্যান্ডে বেড়াতে গিয়ে। লেক টিচিনোয় বাঞ্জিজাম্পিং চলছিল। এক বিদেশি নিরাপত্তা রক্ষী ওর সঙ্গে তামাশা করে বলে এসব তোমাদের মত ভারতীয়দের কম্ম নয়। এর জন্যে সাহস লাগে। এই সব শুনে। জেদ চেপে যায় নন্দনের। এত দেশাত্মবোধ কোথায় লুকোনো ছিল টের পায়নি কখনও। স্থির করে ফেলেন বিপজ্জনক বাঞ্জিজাম্পিংটা করেই দেখাবেন। আরও দুই ভারতীয় বন্ধু দুরু দুরু বুকে লেক টিচিনোর জিরো জিরো সেভেন স্পটে হাজির হন। তিনজন কয়েক হাজার ফুট উঁচু থেকে শরীরটাকে বর্জ্যের মত ছুঁড়ে ফেলে দেন নিচে। হাজার হাজার ফুট ওপর থেকে পড়ার সময় রীতিমত নির্বাণের জ্ঞান হয়ে যায় নন্দনের। সামনে অতলান্ত নীল পৃথিবী। ঠাণ্ডায় সমস্ত শরীর জমে যাচ্ছে। নীচে তাঁর জন্যে অপেক্ষা করে আছে এবড়ো খেবড়ো পাথর। নেপোলিয়নের হাতে পরাজিত আল্পসের শরীর তখন ফুঁসছে দু-দুটো বিশ্বযুদ্ধের সমস্ত হিম শীতল মৃত্যুর সাক্ষী হয়ে। কেবল তখন আলিঙ্গন করতে চাইছে নন্দনদের। অথচ যত আকাশে শূন্যে ভাসছেন ততই কেটে যাচ্ছে তাঁর মৃত্যু ভয়। এই অভিজ্ঞতাই ওকে লড়াই করার, লড়াইয়ে স্থির থাকার সাহস জুগিয়েছে। ফলে কলকাতায় শুরু হওয়া এই সংস্থা সহজেই হার মানার নয়। সাফল্যের শীর্ষ ছুঁয়ে দেখার প্রতিস্পর্ধা রাখে।

Related Stories