১০ টাকার আখের রসে ৯৯ % ডিসকাউন্ট

0

কিঙ্কর মালিক। এখন ওঁকে এক ডাকে চেনেন তল্লাটের মানুষ। সেহারাবাজার রেল স্টেশন এলাকায় গেলেই দেখা পাওয়া যাবে কিংকরের। পেল্লাই একটা আখের রসের গাড়ি নিয়ে দাঁড়িয়ে আছেন আপনার সেবায়। সেবাই বটে। চৈত্র সেলের বাজারে জামা থেকে জুতো কিংবা ফ্রিজ, টিভি , গাড়িতেও আকর্ষণীয় ছাড় পেয়েছেন ক্রেতারা। কম্পিটিশন মার্কেটে ক্রেতাদের আকর্ষণ বাড়াতে অনেকে আবার সারা বছরই কিছুনা কিছু ডিসকাউন্ট দিতেই থাকেন। তবে ছাড়ের বাজারে এবার নতুন সংযোজন ঘটালেন এই আখ রস বিক্রেতা। বিক্রি বাড়াতে ছাড় দিচ্ছেন এমন মনে হওয়াটাই স্বাভাবিক। কিন্তু বর্ধমানের রায়নার সেহারাবাজারের কিংকর মালিক ভাবেন একটু অন্যভাবে। 

আখের রস বিক্রি করে কোনক্রমে সংসার চালালেও সেখান থেকেই কোনও কোনও সময় প্রায় বিনা পয়সায় আখের রস খাইয়ে চলেছেন মানুষকে। যেমন ধরুন, সাধারণের জন্য ধার্য গ্লাস প্রতি ১০ টাকা। দৃষ্টিহীনরা পাবেন ৯৯% ছাড়ে। আর দরিদ্র এবং অন্য প্রতিবন্ধীদের জন্য ৫০%, ছাত্রছাত্রীদের জন্য ৫% আর রোজ যারা খাবেন তাদের ১০% ছাড়। সামান্য ক্ষমতায় সমাজ সেবা করার উদ্দেশ্যেই তার এই ভাবনা।

অত্যন্ত দারিদ্রের সাথে লড়াই করে বড় হয়েছেন। আর্থিক অভাবে পড়াটাও শেষ করতে পারেননি। ছোট বেলায় স্কুলের সামনে লেবুর সরবতের দোকান দেখতেন। কিন্তু কিনে খাওয়ার পয়সা ছিল না। তখনই তাঁর মনে জেদ চাপে। ঠিক করেন বড় হয়ে মানুষের জন্য কিছু করবেন। সংসারের হাল ধরতে বেছে নেন আখের রস বিক্রির ব্যবসা। তবে মানুষের জন্য কিছু করার নেশা তার পিছু ছাড়েনি। ছোট বেলায় পয়সার অভাবে লেবুর সরবত না খেতে পাওয়ার কষ্ট এখনও অনুভব করেন। কিন্তু সামান্য আখের রস বিক্রির ব্যবসা থেকে কি করে মানব সেবা করবেন? হটাতই মাথায় আসে এক নতুন বুদ্ধি। পয়সার অভাবে যাতে তার আখের রস থেকে কেউ বঞ্চিত না হয় তার জন্য বিশেষ ছাড়ের ব্যবস্থা চালু করেছেন। 

বন্ধুর কাছ থেকে সামান্য টাকা ধার নিয়ে একটি ভ্যান কিনে তাতে করেই চলছে আখের রসের রমরমা। রঙিন ফ্লেক্সে সাজানো গাড়ি। তাতে লেখা নানান বানী। তার সঙ্গে বড় বড় অক্ষরে এই ছাড়ের বোর্ডও ঝুলছে। শুধু তাই নয় আখের উপকারিতাও উল্লেখ রয়েছে এই ব্যবসা যানে।

রাজনীতি না করেও মানব সেবা করা যায় তা প্রমাণ করেছেন প্রত্যন্ত গ্রামের এই যুবক। বিশেষ ছাড়ের ব্যবস্থা থাকায় প্রতিদিনই ভিড় জমাচ্ছেন ছাত্রছাত্রী থেকে প্রতিবন্ধী ও দুঃস্থ মানুষরা। তাঁর এই মার্কেটিং স্ট্র্যাটেজিতে ক্ষতি হচ্ছে না তো! সোজা উত্তর, না। বলছিলেন, বেশি লাভ করে লাভ নেই। বরং অসহায় মানুষদের অর্থ দিয়ে সাহায্য করতে না পারলেও তার আখের রস সামান্য অর্থের বিনিময়ে দিয়ে এই সকল মানুষের উপকার করতে পেরে তিনি খুশি। 

পাশাপাশি শোনালেন তাঁর ভবিষ্যৎ পরিকল্পনাও। রোজই একটু একটু করে টাকা জমাচ্ছেন কিঙ্কর। দুঃস্থ ছাত্রছাত্রীদের জন্য কিছু একটা করতে চান। যাতে তাঁদের পড়াশুনো আচমকা বন্ধ না হয়ে যায়। তাঁদের আর এই রোদে পুড়ে রাস্তায় রাস্তায় ঘুরে না মরতে হয়। ঘরে স্ত্রী সন্তান আছে। তাঁদের ভবিষ্যতের ভাবনাও আছে। কিন্তু তাবলে সমাজের ভাবনা ভাবতে ভুলছেন না এই আশ্চর্য ব্যবসায়ী।

Related Stories