কিছু কড়া কথা মোদিকেও শুনতে হবে

লিখছেন আশুতোষ, সাংবাদিক এবং এএপি নেতা

0

আরে! মনেই ছিল না, মোদি সাহেবের সরকারের ২বছর পূর্তি হয়ে গেল। আমি দিল্লির বাইরে ছিলাম। গতকাল সন্ধ্যায় দিল্লি ফিরেছি। কাগজ নাড়তে চাড়তে গিয়ে মনে পড়ে গেল। আরে! দেখতে দেখতে দুটো বছর কাটিয়ে দিলেন মোদি! সময় কত তাড়াতাড়ি চলে যায়! ২০১৪ সালের লোকসভা ভোট তো মনে হয় এই সেদিনের কথা। এখনও চোখে ভাসছে 'আব কি বার মোদি সরকারের' সেই বিশাল হোর্ডিং। এটাই ছিল মোদির প্রচারের ট্যাগ লাইন। ও হ্যাঁ আরেকটাও ছিল, 'আচ্ছে দিন' লোকসভা ভোটের আগে গোটা দেশে এগুলোই তো ছিল ঝোড়ো হাওয়া।

সকালের কাগজেও দেখলাম আরও একবার, 'আবকি বার' মোটা মোটা হরফে। সব কাগজেই একই জিনিস চোখে পড়ল। এটা বিশাল প্রচার। মোদিকে তুলে ধরতে যে কত টাকা জলের মত খরচ হয়েছে তার ইয়ত্তা নেই। তলায় ট্যাগ লাইন 'মেরা দেশ বদল রাহা হ্যায়, আগে বাড় রাহা হ্যায়।' এর ফলে স্পষ্ট ভাষায় যেন বলা হচ্ছে দেশ এগিয়ে যাচ্ছে। লাফিয়ে লাফিয়ে উন্নতি করছে। এবং এসব হচ্ছে মহামান্য মোদিজির দৌলতে। নিজের কৃতিত্ব ফলাও করে প্রচার করার হক সব সরকারেরই আছে। কিন্তু সচেতন নাগরিক হিসেবে আমাদেরও হক আছে, এটা প্রশ্ন করার যে সত্যিই কি আমাদের দেশ বদলাচ্ছে?

চলুন আমরা মৌলিক কিছু প্রশ্ন করি। আমরা দেশের সচেতন নাগরিক হিসেবে গত ২০১৪ সালের লোকসভা নির্বাচনে কেন মোদি সাহেবকে ভোট দিয়ে ক্ষমতায় এনেছিলাম? এক তো দেশকে দুর্নীতিমুক্ত করতে, দুই সিদ্ধান্তের গড়িমসি থেকে নিস্তার পেতে, তিন নীতি পঙ্গুত্ব এড়াতে আর চার অর্থনীতিকে চাঙ্গা করতেই মোদি সাহেবকে দেশের সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষ গদিতে এনেছিলেন। এখন প্রশ্ন হল তাঁর সরকার কি এগুলো সত্যিই করতে পেরেছে? মোদি যে একজন বৈপ্লবিক রাষ্ট্রনায়ক সেকথা প্রমাণ করার তাগিদ থেকেই গণমাধ্যমে ঢাক ঢোল পিটিয়ে প্রচারের আয়োজন আর উৎসবের এই বিশাল সমারোহ। শুধুমাত্র তাকে সার্টিফিকেট দেওয়ার জন্যেই এইসব। যেন মনমোহন সিংয়ের পর নরেন্দ্র মোদি ক্ষমতায় এসে দেশের খোল নলচে বদলে দিচ্ছেন। কিন্তু ভেবে দেখুন তো এটা কি সত্যি!

মনমোহন সিংয়ের সরকার ইতিহাসের পাতায় সব থেকে দুর্নীতিগ্রস্ত সরকার জায়গা করে নিয়েছিল। মানুষ পরিবর্তন চাইছিল। একঝাঁক তাজা বাতাস নিয়ে মোদি এসেছিলেন। মানুষ সত্যি সত্যি ভেবেছিল এবার হয়তো দুর্নীতির কু-বলয় থেকে বেরিয়ে আসবে দেশ। বের করে আনবেন নরেন্দ্র মোদি। কিন্তু কী দেখলাম! হাফ ডজন দুর্বৃত্তকে মন্ত্রীত্ব দিলেন মোদি। ক্যাবিনেটে জায়গা দিয়ে ওদের দোষ খণ্ডণ করার অক্ষম চেষ্টা করলেন, সেই প্রথম মোদির দুর্নীতি সহ্য না করার দাবি মানুষের দরবারে হোঁচট খেল।

লোকজন এবার বলতে শুরু করে দিয়েছে মোদি যদি এতই দুর্নীতির বিরোধী তাহলে কেন এখনও গত দু বছরে লোকপাল নিয়োগ করলেন না? মনমোহন সিংয়ের আমলেই তো লোকপাল বিল সংসদে পাস হয়ে গিয়েছে। কিন্তু এখনও সেই বিল দিনের আলো দেখল না! মোদির সরকার তেঁড়েফুড়ে লেগেছে আগাস্টা ওয়েস্টল্যান্ড নিয়ে গান্ধি নেহেরু পরিবারকে আক্রমণ করতে। কিন্তু বিজেপি এই উত্তর দিতে পারছে না কেন মোদি সরকার গত দুবছরে এই বিষয়ে কোনও তদন্ত করেনি। যেখানে কিনা ইটালির সরকার তাদের উচ্চআদালতে ইতিমধ্যেই দুজন অভিযুক্তকে দোষী সাব্যস্ত করেছে। ক্ষমতায় এলে নাকি রবার্ট ভডরার জমি সংক্রান্ত দুর্নীতির ব্যবস্থা নেওয়া হবে, কী হল বিজেপির দেওয়া ভোটের বাজার গরম করা সেই প্রতিশ্রুতির! বেশ কিছু সমীক্ষায় দেখা গেছে গত দুবছরে দুর্নীতি কমে তো নি তুলনায় বরং বেড়েছে।

মোদির সরকার প্রচার করছে, ভারত নাকি চিনের অর্থনৈতিক বৃদ্ধিকে ছুঁয়ে ফেলে দুনিয়ার সবথেকে গতিশীল অর্থনীতির দাবিদার। শুনতে বেশ ভালো। কিন্তু বাস্তবটা অন্যরকম। একই রকম আত্মবিশ্বাস ব্যবসায়ী এবং বণিক মহলে নেই। আর যখন ফ্যাক্টস বা পরিসংখ্যানের প্রশ্ন উঠছে তখন ছবিটা একদমই আলাদা। খবরের কাগজের রিপোর্টের ভিত্তিতে এবং খোদ সরকারি পরিসংখ্যানের ভিত্তিতে গত অর্থবছরে কোর সেক্টরে বৃদ্ধির হার গত দশ বছরে সব থেকে নীচে। মাত্র ২.৭ শতাংশ। মনমোহন সিংয়ের সরকারের জমানার শেষ বছরের তুলনায় সাড়ে চার শতাংশ ধীরে চলছে এই বৃদ্ধির হার। রফতানি মার খেয়েছে। রিজার্ভ ব্যাঙ্কের গভরনর রঘুরাম রাজনের শত চেষ্টার পরও টাকা এখনও ডলার এবং অন্যান্য বিদেশি মুদ্রার তুলনায় বেশ দুর্বল।

বিদেশি বিনিয়োগকারীদের কাছে ভারত এখনও আদর্শ গন্তব্য নয়। কাজের সুযোগ বাড়ানোর প্রশ্নে সব থেকে খারাপ ফল করেছে মোদির সরকার। দেশের যুব সম্প্রদায়ের অকুণ্ঠ প্রেম নিয়ে ২০১৪ সালে মোদিজি এসেছিলেন। অনেক আশা ভরসা তাঁকে ঘিরে ঘুরপাক খেত। তিনিও তাদেরকে স্বর্গ নামিয়ে আনার স্বপ্ন দেখিয়েছিলেন। কিন্তু দুর্ভাগ্যবশত কী পেলাম আমরা? রিপোর্ট বলছে গত ছ'বছরের নীরিখে কর্মসংস্থান এবং কর্মবৃদ্ধির ইনডেক্স সব থেকে তলায় নেমে গিয়েছে। আটটি শ্রম নিবিড় শিল্পে নতুন কাজ তৈরির হার পড়েছে। এবং ২০১৫ সালের প্রথম ন'মাসে পড়েছে সব থেকে বেশি। গত ছ বছরে এত নীচে কখনও নামেনি। মাত্র এক লক্ষ পঞ্চান্ন হাজার কাজের সুযোগ তৈরি হয়েছে। বিশেষজ্ঞরা সরকারের দেওয়া তথ্যের সত্যতা নিয়ে প্রশ্ন তুলতে শুরু করে দিয়েছেন। বৃদ্ধি, অগ্রগতির নতুন নতুন যে সব প্যারামিটার, সংজ্ঞার আমদানি করছে মোদি সরকার সেসব নিয়েও খোলামেলা সমালোচনা চলছে। কানপাতলে সেগুলো আপনিও শুনতে পাবেন। সব থেকে বড় কথা হল এখনও পর্যন্ত বড়মাপের কোনও সংস্কার চোখে পড়েনি। বহুচর্চিত গুডস এন্ড সার্ভিস ট্যাক্স বা জিএসটিও ঝুলে রয়েছে। সরকারের উদ্ধত আচরণের জন্যেই এই অচলাবস্থা।

মোদি বলেন বটে সহযোগিতা নির্ভর যুক্তরাষ্ট্রীয় কাঠামোর কথা, কিন্তু অরুণাচল প‌্রদেশ, উত্তরাখণ্ড এবং দিল্লিতে ওঁর আচরণ মনে করিয়ে দিয়েছে শ্রীমতি ইন্দিরা গান্ধির বিরোধীদের প্রতি হৃদয়হীনতাকে। বিচারব্যবস্থা থমকে যাচ্ছে। ফাঁকা আসনে লোক নেওয়া হচ্ছে না, দীর্ঘদিন। বিচারকদের ওপর মামলার চাপ বাড়ছে। বিচারব্যবস্থা এতটাই বিপন্ন হয়ে পড়েছে যে দেশের প্রধান বিচারপতি টি এস ঠাকুর সকলের সামনে খোদ মোদির উপস্থিতিতে একটি সভায় কেঁদেই ফেললেন।

মোদির তাবেদাররা তাঁর বিদেশি নীতি নিয়ে কম আদিখ্যেতা করেন না। এবিষয়ে কোনও সন্দেহ নেই যে তিনিই সব থেকে বেশি বিদেশে ঘুরে বেড়ানো ভারতীয় প্রধানমন্ত্রী। কিন্তু তাতে কী এল গেল! এমন কিচ্ছু গুরুত্বপূর্ণ প্রাপ্তি হয়নি ভারতের। বড় বড় দাবি, বড় বড় কথার পাহাড় হয়েছে। কিন্তু সত্যিটা হল একটিও বিদেশি সংস্থা ভারতে বিনিয়োগ করতে উৎসাহ পাচ্ছে না। ভারতের সঙ্গে পাকিস্তানের সম্পর্ক আরও খারাপ হয়েছে। যদিও নওয়াজ শরিফের সঙ্গে মোদি সাহেবের ব্যক্তিগত রসায়ন ভালো হওয়া স্বত্তেও কাশ্মীর ফের অশান্ত হয়ে পড়েছে। সীমান্তে আবারও উত্তেজনা বাড়ছে। এখন আইএসআইএসের পতাকা আগের তুলনায় আকছার দেখা যায়।

আরও শুনবেন, পাকিস্তান আর চিনের সম্পর্ক আরও ভালো হয়েছে শ্রীমান মোদির দৌলতে। পাকিস্তান সম্প্রতি চিনকে ভারত সীমান্ত লাগোয়া এলাকায় রাস্তা তৈরির বরাত দিয়েছে। এতদিন নেপালের সঙ্গে ভারতের সম্পর্কের উষ্ণতা ছিল, কিন্তু এই মোদি সাহেবের দৌলতে সেখানেও গোলমাল পেকে গেছে। অকারণে অযথা নেপালের আভ্যন্তরীন বিষয়ে নাক গলাতে গিয়ে নেপালের বিভিন্ন মহল ভারেতর ওপর বেজায় চটে আছে। নেপাল সরকারের মনোভঙ্গিতেও আগের উষ্ণতা নেই। বরং বিরক্তিই তৈরি হচ্ছে। একই ভাবে শ্রীলঙ্কাও নরেন্দ্র মোদির আচরণে বিব্রত তাই ওরাও চিনের নৈকট্য প্রত্যাশী। চিনের নেতা জি জিংপিংকে খুব খাতির করেছেন মোদি, খুব বোঝানোর চেষ্টা করেছেন, কিন্তু কাজের কাজ কিচ্ছু হয়নি, পাকিস্তানের দেওয়া ব্রিফ অনুযায়ী তিনি জাতিসংঘের কাছে জৈশ নেতা আজহার মাসুদকে জঙ্গি হিসেব চিহ্নিত করার প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করে দিয়েছেন। ফলে আমাদের প্রতিবেশিদের সঙ্গে আমাদের সম্পর্কও ভীষণই খারাপ হয়ে গিয়েছে।

কিন্তু মোদির সব থেকে বড় খামতি সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির প্রশ্নে ওঁর নীরবতা। আজকে আক্ষরিক অর্থেই দেশের সংখ্যালঘু সম্প্রদায় আতঙ্কে দিন কাটাচ্ছেন। আখলাক হত্যার ঘটনায় এবং সংখ্যালঘুদের ওপর হামলার ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে মোদির সুদীর্ঘ নীরবতায় দেশের গোটা সংখ্যালঘু সমাজের মোদির প্রতি ভরসা কেঁপে উঠেছে। জাতীয়তাবাদ নিয়ে বিতর্কে দেশপ্রেমের প্রশ্ন উঠেছে। আক্রান্ত হওয়ার হুমকি পান আমির খান। নিরাপত্তাহীন বোধ করেন বলে জানিয়েছেন শাহরুখ খানও।

আজকে দেশটা ধর্মের বিচারে শতধা বিভক্ত। খণ্ডিত। এবং মহামান্য প্রধানমন্ত্রী এই পরিস্থিতির বদলানোর কোনও প্রয়াস করে উঠতে পারলেন না। দেশের মানুষ তাঁকে অনেক আশা নিয়ে বাছাই করেছিল। কিন্তু দুটো বছর কাটতে না কাটতেই সেই সব আশার ফানুশ নিবে গেল। মুক্তমনা, উদারপন্থী ভারতের একাংশ মনে করে তাঁরা প্রতারিত হয়েছেন, তাঁদের সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা হয়েছে। এবং সম্মানীয় প্রধানমন্ত্রী এত বড় অভিযোগ এড়িয়ে যেতে পারবেন না। তাঁর হাতে এখনও তিনটে বছর আছে। এই তিনটে বছরে তাঁকে প্রমাণ করতে হবে যে তিনি এমন কোনও মতাদর্শের হাতে বন্দি নন, যেটা ভারতীয় ইতিহাসের তিক্ততা নিয়ে, প্রতিশোধ স্পৃহা পুষে রেখেছে। মত আদর্শ এগুলো ইতিহাস আঁকড়ে পড়ে থাকতেই পারে কিন্তু গণতান্ত্রিক ভাবে নির্বাচিত প‌্রধানমন্ত্রী তা পারেন না। ২০১৯ এও মানুষের রায় তাঁকে নিতে হবে। এটা তাঁর ভুলে যাওয়া উচিত হবে না।

(সম্পাদকের বক্তব্য- লেখার বিষয় এবং মত সম্পূ্র্ণ ভাবে লেখকের নিজস্ব)