সমস্যা বলুন, পরামর্শ দেবে ‘সাথী হাত বাডহানা’

0

জানকী।পুরও নাম জানকী বিশ্বনাথ। ১৯৮৮ সালে TISS থেকে হিউমেন রিসোর্সে স্নাতকোত্তর হন। উচ্চাখাঙ্খা ছিল সবসময়। চেয়েছিলেন পাস করে বেরিয়েই নামি সংস্থায় চাকরি, বেড়ানো, কেরিয়ার এবং টাকা। কেরিয়ারে খুব দ্রুত একের পর এক সাফল্যের সিঁড়ি বেয়ে ওপরে ওঠা, বিদেশ ভ্রমণ, সেই সঙ্গে বিয়ে। অল্প কদিনেই সব চাওয়া পাওয়া হয়ে গিয়েছে। ৩৩ বছর বয়সে কন্যার মা হন। সেই সময়ও চাকরি ছেড়ে বাড়িতে থেকে মাতৃত্বের স্বাদ পুরওপুরি উপভোগ করতে চেয়েছিলেন। মেয়ে যখন তিন বছর, প্লেস্কুলে যাতায়াত শুরু হয়। এবার জানকী চান আবার কিছু একটা শুরু করতে। ওই সময়টায় তাঁদের পুনে চলে যেতে হয়। পুনেতে অন্ধ নামে যে জায়গায় থাকতেন আদ্ভুতভাবে সেখানে সময় কাটানোর মতো কোনও বুকস্টোর ছিল না। পাড়ার মধ্যেই খুলে ফেলেন ‘টুইনসঅ্যানটেল’। ধরতে গেলে বুকস্টল আবার, তার থেকে একটু বেশি কিছু। ১১ বছর সেই দোকান চালিয়েছেন। ১১ বছরের প্রতি মুহূর্ত উপভোগ করেছেন শেষ বিন্দু পর্যন্ত। যখন ই-কমার্সের জমানা শুরু হল, স্যোশাল মিডিয়ার ওয়ালে নানা লেখা জানকীর নজরে আসে। তখনই ঠিক করে নেন ‘টুইনসঅ্যানটেল’ আর নয়। সাতপাঁচ ভেবে দোকান গুটিয়ে দেন। তবে, তাঁর এই ছোট্ট উদ্যোগ যতদিন ছিল, সবাইকে আনন্দ দিয়ে গিয়েছে।

টিমের সঙ্গে জানকী,ডান দিক থেকে দ্বিতীয়
টিমের সঙ্গে জানকী,ডান দিক থেকে দ্বিতীয়

‘টুইনসঅ্যানটেল’ বন্ধ করার এক বছরের মধ্যে শুরু করেন ‘সাথি হাত বাডহানা’ স্যোশাল ফাউন্ডেশন। ছুটে চলা ডিজিটাল লাইফস্টাইলে যাদের প্রচুর শারীরিক এবং মানসিক ঝক্কি নিতে হয় তাদের পরামর্শ দিয়ে সাহায্য করে SHB (সাথি হাত বাডহানা)। এইচআর ব্যাকগ্রাউন্ড থাকায় জানকীর একটা অভ্যেসই হল সামাজিক প্রবণতা লক্ষ্য করা। জানকীর উপলব্ধি, সমাজের সঙ্গে তাল মিলিয়ে আধুনিক হতে গিয়ে আমরাদের মধ্যে নাগরিক ধ্যান ধারণার আর অল্পই অবশিষ্ট আছে। সামাজিক হিংসা, শিশুদের যৌন নিপীড়ণ, আত্মহত্যা এবং আরও অনেক সামাজিক বিষয় আমাদের অজান্তেই প্রতিদিনকার জীবনে নানা প্রভাব ফেলছে। ‘রাস্তাঘাটে স্বাধীনভাবে গরুর পালের ঘুরে বেড়ানোর কথা নয়। অথচ রাস্তা পেরোতে যাওয়া একটি গরু সরানোর জন্য একজন গাড়ির চালককে দেখলাম তারস্বরে হর্ন দিচ্ছেন! এটা কী হচ্ছে’! বিষ্ময়ে বলেন জানকী। এই অবস্থা পালটানোর একটাই উপায়। সবাই একসঙ্গে এক লক্ষ্যে কাজ করা। ‘সাথি হাত বাডহানা’-নামের মধ্যেই রয়েছে ইঙ্গিত। যার মানে দাঁড়ায়, একটা ধারণা নিয়ে অন্যান্য সংস্থার সঙ্গে একই উদ্দেশ্যে কাজ করা।

Listening Post এই মুহূর্তে SHB এর অন্যরকম একটি কনসেপ্ট। এটা হল একটা ফাঁকা জায়গা। খুব চাপের মধ্যে যাদের জীবন যাপন তাদের কথা ভেবে জানকীর এই উদ্যোগ। হতে পারে দাম্পত্য কলহে স্বামী-স্ত্রীতে ছাড়াছাড়ি, কর্মক্ষেত্রে ছাঁটাই, প্রিয়জনের মৃত্যু অথবা ছাত্রছাত্রীদের অফুরন্ত পড়ার চাপ, দুশ্চিন্তা-সবার জন্য Listening Post হল উন্মুক্ত জানালা। যার ইচ্ছে নিজের সমস্যা জানাতে পারেন এখানে। SHB এর প্রশিক্ষিত শ্রোতা রয়েছেন, যারা ধৈর্য্য ধরে সবার সমস্যা শুনবেন। সমস্যা শোনার এই প্রক্রিয়াই মনে শান্তি আনে অনেকটা। মূলত তিনটি ক্ষেত্রের ওপর ভিত্তি করে SHB তাদের কাজের সূচি স্থির করে। সেগুলি হল-মানসিক কষ্টে সান্তনা দেওয়া, লিঙ্গ ইস্যু এবং জীবন শৈলী। মনের কথা শোনার বা একটু সান্তনা পাওয়ার প্রক্রিয়ায় Listening Post ছাড়াও “Caring for the Caregiver” নামে আরও একটি প্রোগ্রাম চালু আছে।পরিবারের ভার যাদের কাঁধে তাদের মানসিক ভার লাঘবেন জন্য গ্রুপ সেশন বা দল বেঁধে আলোচনার ব্যবস্থা থাকে। প্রতি বুধবার বয়স্কদের জন্য স্মার্ট ফোন অ্যাসিস্ট্যান্স প্রোগ্রামের ব্যবস্থা রয়েছে।

লিঙ্গ বিষয়ক প্রোগ্রামে SHB স্কুল, উঠতি বয়সের ছেলেমেয়ে এবং কর্পোরেট সেক্টরের লোকজনকে নিয়ে কাজ করে। স্কুলগুলিতে শিশুদের ওপর শিক্ষকদের যৌন নিপীড়ণ বন্ধ, অশিক্ষক কর্মীদের POCSO সম্পর্কে ধারনা দেওয়ার জন্য SHB নানা কর্মশালার আয়োজন করে। উঠতি বয়সের ছেলেমেয়ে বলতে মূলত নবম শ্রেণির বা তার ওপরের শ্রেণির ছাত্রছাত্রীদের লিঙ্গ, যৌনতা, মত প্রকাশ এবং নিজস্ব পরিচিতি সম্পর্কে সচেতন করা হয়। সবশেষে, কর্পোরেট সংস্থাগুলিতে যৌন হেনস্থা রুখতে সচেতনতা তৈরি করে SHB।

জীবনশৈলীর ক্ষেত্রে জানকী নিজে এবং তাঁর সহকর্মী বিভা, দুই প্রশিক্ষিত কোচ সবাইকে নানা পরামর্শ দেন। তাঁরা বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠান যেমন আইটিআই-এর মতো জায়গায় নিজস্ব পাঠ্যক্রমের সঙ্গে জীবনশৈলীর শিক্ষা দেন। তিনটি ধাপে স্বেচ্ছাসেবীরা সমস্ত প্রেগ্রামগুলি চালান।

প্রতি শনিবার সকালে SHB এর আরও একটা কর্মশালা ভালো সাড়া পেয়েছে। পুনেতে SHB এর যেখানে অফিস সেখানেই এই প্রোগ্রাম হয়। অনেকটা শখের কর্মশালার মতো। প্রশিক্ষিত শিক্ষক শিক্ষিকারা থাকেন। তাদের মাধ্যমে অংশগ্রহণকরীরা নিজের মধ্যে মনের ভাবের আদান প্রদান এবং নতুন অনেক কিছু শেখেন।

‘সাথী হাত বাড়হানা’ নিয়ে জানকী অনেক স্বপ্ন দেখেন। তাঁর আশা, SHB এর প্রত্যেকটা প্রোগ্রাম সমাজের বিভিন্ন স্তরের আরও অনেক মানুষের সুবিধা করে দেবে, পরিবর্তনের জোয়ার এনে দেবে। এখনও নিজেদের ফান্ডেই চলে SHB । তবে বিভিন্ন স্কুল এবং কর্পোরেট সংস্থার থেকে বিভিন্ন প্রোগ্রামের বিনিময়ে টাকা নেওয়া হয়। সেই টাকা অন্য প্রজেক্টে ব্যবহার হয়। জানকী বলেন, বদলে যাওয়া পৃথিবীতে আমাদের মানসিক গঠন যদি না বদলায়, তাহলে মানসিক এবং সামাজিক চাপ ক্রমশ বাড়বে। আমি জানি, এই পরিবর্তন একজনের পক্ষে করা সম্ভব নয়। কিন্তু একসঙ্গে সবাই মিলে তো করতে পারি। কারণ, পাস্পরিক সহযোগিতাই এগিয়ে যাওয়ার উপায়।