চার মাসেই দুর্দান্ত ফর্মে বাঙালি তিন তরুণের Packr

0

ওরা জাত ব্যবসায়ী। তিনজনই। কলেজে পড়ার সময় থেকেই নিজেদের কিছু করতে হবে এমনটাই স্থির করেছিলেন ওরা। ফলে সরকারি চাকরির জন্য হত্যে দিয়ে পড়ে থাকেননি। দশটা পাঁচটার নিশ্চিন্ত জীবনের স্বপ্ন দেখেননি। চ্যালেঞ্জ নিতে চেয়েছিলেন। নিয়েওছেন। এখন ওরাই রোল মডেল।

অর্পণ দাস, অরিন্দম দঁ ও সুদীপ্ত ধারা। প্রথমে Paltao এবং তারপর Packr। কলকাতার স্টার্টআপ মানচিত্রে দুটোই দারুণ স্টার্টআপ। এবং দুটোই দুর্দান্ত ফর্মে।

যেকোনোও ব্যবসার বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গেই গড়ে ওঠে তার সহযোগী শিল্প। অনলাইন শপিং ও হোম ডেলিভারির যুগে তেমনই প্রয়োজনীয় মাল সরবরাহকারী পরিষেবা ভীষণ প্রয়োজন। অর্ডার পেলে সময় মতো সুরক্ষিত ভাবে তা ক্রেতার কাছে পৌঁছে দেওয়াটা যে কোনও অনলাইন ব্যবসায়ীর কাছে খুবই গুরুত্বপূর্ণ। আর এই চাহিদাকে ভিত্তি করেই গড়ে উঠছে ওদের এই নতুন স্টার্ট-আপ।

এবছর জুলাইতেই কাজ শুরু করেছে এই কোম্পানি। ওয়েবাসাইট বা মোবাইল অ্যাপের মাধ্যমে পণ্যের ছবি তুলে ও কিছু তথ্য দিয়ে অর্ডার করতে হয়। কোম্পানির সরবরাহ কর্মীরা এসে পণ্যটিকে সঠিকভাবে প্যাক করে নির্দিষ্ট স্থানে পৌঁছে দেওয়ার ব্যবস্থা করেন। দেশের ভিতরে বা বিদেশের যে কোনও জায়গায় বহাল তবিয়তে পৌঁছে দেয় ওরা। এর জন্য ফেডএক্স, ইউপিএস, অ্যারাম্যাক্স, ডিটিডিসি ও গতির সঙ্গে চুক্তিবদ্ধ হয়ে কাজ করে Packr।

অনলাইন ব্যবসায়ী ছাড়া অন্য যে কেউ ব্যক্তিগতভাবেও এই পরিষেবার সুবিধা নিতে পারেন। শহরের ভিতর তিন ঘন্টার মধ্যে জিনিস পৌঁছে দেয় এই সংস্থা। উপহার, প্রয়োজনীয় কাগজপত্র, পার্সেল, এমারজেন্সি কোনও জিনিস, আসবাব ও অন্যান্য ভারী জিনিসও তারা এক জায়গা থেকে অন্য জায়গায় পৌঁছে দেয়। বর্তমানে এই কাজে বাইক ও ছোট ট্রাক ব্যবহার করা হয়। 

নিজেদেররই অন্য একটি স্টার্টআপ পাল্টাওয়ের কাজের সূত্রেই এই ব্যবসার কথা মাথায় আসে প্রতিষ্ঠাতা, অর্পণ- অরিন্দম- সুদীপ্তদের । পাল্টাও হস্তশিল্পজাত পণ্যের অনলাইন মার্কেটপ্লেস। “আমাদের প্ল্যাটফর্মে যাঁরা জিনিস বিক্রি করে প্যাকেজিং ও অর্ডার সরবরাহ করার ক্ষেত্রে প্রায়শই সমস্যায় পড়তে দেখতাম তাঁদের। দামী ক্যুরিয়র কোম্পানির সাহায্য নিতে গিয়ে তাঁদের লাভের একটা বড় অংশ সেখানেই চলে যেত। সমস্যাটা নিয়ে আরও খোঁজ খবর নিতে গিয়ে আমরা দেখি শুধু ই-কমার্স সাইটগুলিই নয়, সস্তায় ও ভরসাযোগ্যভাবে বাড়ি থেকে জিনিস নিয়ে গিয়ে তা নির্দিষ্ট জায়গায় পৌঁছে দেবে এমন পরিষেবা পেতে ইচ্ছুক গ্রাহকরাও। প্রয়োজনীয় কাগজপত্র বা পার্সেল সঠিক সময় পৌঁছে দেওয়া সত্যিই একটা মাথা ব্যাথা। তাই আমরা মূলত তিনটি বিষয়ের ওপর জোর দিয়েছি, বাড়ি থেকে জিনিস নেওয়া, প্যাকেজিং এবং শহরের মধ্যে হলে সেইদিনই তা পৌঁছে দেওয়া”, বললেন অর্পণ।

অর্পণ ও অরিন্দমের ব্যবসা জীবন শুরু কলেজে পড়ার সময়েই। বিভিন্ন কলেজের ফেস্টে কাস্টমাইসড পণ্য বিক্রি করতেন, ব্র্যান্ডের নাম মুজ্যাক। এছাড়া স্টার্টআপ স্যাটার ডে, কলকাতাতে ভলান্টিয়্যারের কাজ করার সময় কলকাতার স্টার্টআপের জগত সম্পর্কে জানা বোঝা তৈরি হয় অর্পণের।

কলেজের পর তাঁদের সঙ্গে যোগ দেন সুদীপ্ত, যিনি বর্তমানে কোম্পানির প্রযুক্তির নেতৃত্বে রয়েছেন। তিনজন মিলে শুরু করেন পাল্টাও, হস্তশিল্পজাত পণ্যের অনলাইন মার্কেট প্লেস। TURN8 সিড অ্যাক্সেলারেটরর থেকে সিড বিনিয়োগ সংগ্রহ করে পাল্টাও। দুবাইয়ে ৪ মাস স্টার্টআপটি গড়ে তোলার কাজ করেন তাঁরা। “কিন্তু সেটা যখন সেভাবে কাজ করল না তখন লজিস্টিকসের এই সমস্যার দিকে নজর দিই, ও এই ব্যবসার দিকে জোর দিই”, বললেন অর্পণ।

শুরুতে অনলাইন মুদি ও রেস্তোঁরাদের পরিষেবাকেই নিজেদের কাজের ক্ষেত্র হিসেবে বেছে নিয়েছিল Packr। “কিন্তু কিছুদিনের মধ্যেই আমরা বুঝি এই মডেলটা টিঁকে থাকার জন্য সঠিক নয়, কারণ প্রতিটা অর্ডারেই আমাদের আর্থিক ক্ষতি হচ্ছিল। মুদির জিনিস সরবরাহতে শ্রম অনেক বেশি ও লাভ খুব কম। এছাড়া গুরগাঁওয়ের Pickingo যারা এই একই মডেলে কাজ করছিল তাদের ব্যর্থতা থেকেও আমরা শিক্ষা নিই”, বললেন অর্পণ।

তাই ব্যবসার মডেলের পরিবর্তন ঘটিয়ে ই-কমার্স বিক্রেতা ও গ্রাহকদের কাগজ পত্র ও পার্সেল পৌঁছে দেওয়াতেই জোর দিচ্ছে Packr।

অর্পণ বললেন, “ব্যবসার এই পরিবর্তনের সময়টা বেশ কঠিন ছিল, কিন্তু আপাতত আমরা তা কাটিয়ে উঠেছি। এখন প্রতিটি অর্ডার থেকেই যথেষ্ট লাভ থাকে। এখন দিনে প্রায় ১২০ টি অর্ডার সরবরাহ করে Packr। ফেব্রুয়ারি, ২০১৬ এর মধ্যে সংখ্যাটাকে ৫০০ তে নিয়ে যাওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে।

হাইপার লজিস্টিকস মডেলের টিঁকে থাকা নিয়ে এখনও সন্দিহান অর্পণরা, প্রচুর পুঁজি না থাকলে এই ক্ষেত্রে কাজ করে কেউই সাফল্য পাচ্ছে না। তবে সুলভে কার্যকরী মডেল তৈরি করার ব্যাপারে আশাবাদী তাঁরা। এবং সেটা করতে পারলে আবারও সেইিদিকেই তাঁরা জোর দেবেন।

জানুয়ারিতে নিজেদের ওয়েবসাইটটি নতুন করে সাজাচ্ছে Packr। এছাড়াও কোম্পানিদের জন্য ট্র্যাকিংভিত্তিক অ্যানালিটাক্যাল প্ল্যাটফর্ম তৈরির কাজ করছে তাদের প্রযুক্তি টিম, তৈরি হবে প্যাকার ফর বিজনেস, ১৫ জানুয়ারি লঞ্চ হবে বেটা ভার্সন।

অর্পণ মনে করেন নিজেদের মডেল সম্পর্কে স্বচ্ছ ধারণা থাকা খুবই প্রয়োজন, এবং দরকার মতো সেটাকে পরিবর্তন করতে হবে। অ্যান্ত্রপ্রনয়্যারশিপ তাঁর জীবনের একটা অংশ এবং তাঁর কাছে প্রতিটি ভুলই নতুন কিছু শেখার সুযোগ।