ভাই-বোনের সম্পর্ককে চিনতে শেখান কুবরা এবং দানিশ

0

তাঁরা নিজেদের কাজের জোরে আজ তারকা। দুজনেই নিজের চেষ্টায় সাফল্য অর্জন করেছেন। শব্দতরঙ্গের মতোই তাঁদের দুজনের জীবনেই বহু উত্থান, পতন - কিন্তু তাঁরা যেভাবে সেই সব অতিক্রম করতে পেরেছেন সেটা আর পাঁচটা মানুষের চেয়ে একেবারে আলাদা। এটা দুই ভাই-বোনের কাহিনী। অত্যন্ত সফল এবং অ্যাওয়ার্ড-উইনিং সঞ্চালক কুবরা এবং জনপ্রিয় রেডিও জকি দানিশ, যাঁদের বলা নানা কথা, বিভিন্ন সময়ে আমাদের মন ছুঁয়ে গেছে।

দানিশ সইত একজন আরজে, প্র্যাঙ্কস্টার, এমসি, টেলিভিশন হোস্ট এবং সর্বোপরি একজন শিল্পী। তিনি মজা করতে ওস্তাদ। এবং তা অনেকেই শুনেছেন ১০৪এফ এম (বেঙ্গালুরু)-তে তাঁর অনুষ্ঠান 'সুপারি'-তে। আইসিসি ক্রিকেট ওয়ার্ল্ড কাপ (অস্ট্রেলিয়া) এবং স্টার স্পোর্টস প্রো কবাডি লিগ -এ একজন টেলিভিশন সঞ্চালকের ভূমিকাতেও তাঁকে দেখেছে গোটা বিশ্ব।

তাঁর দিদি কুবরা, দেশের অন্যতম সফল সঞ্চালকদের মধ্যে একজন। বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে লাইভ শো হোস্ট করেন তিনি। পরপর দু'বছর, ২০১২ এবং ২০১৩য় দিল্লিতে আয়োজিত লাইভ কোশেন্ট অ্যাওয়ার্ডসে যিনি শ্রেষ্ঠ সঞ্চালক(মহিলা)-র পুরস্কার পেয়েছেন। ডারবানে আয়োজিত 'মিস ইন্ডিয়া ওয়ার্ল্ডওয়াইড প্যাজেন্ট'-এ 'মিস পার্সোনালিটি' নির্বাচিত হন কুবরা। সলমন খানের জনপ্রিয় ছবি 'রেডি'তে নিজের অভিনয় কেরিয়ারও শুরু করেছেন তিনি। লাইফস্টাইল টেলিভিশন চ্যানেল TLC-র একজন হোস্ট হওয়ার পাশাপাশি ভাই দানিশের সঙ্গে প্রো-কবাডি লিগে সঞ্চালকের ভূমিকায় দেখা গেছে তাঁকেও।‌

বেড়ে ওঠা...

একটি ভেঙে যাওয়া পরিবার কখনওই কোনও শিশুর বড় হওয়ার জন্য আদর্শ পরিবেশ নয়। কিন্তু জীবনে যেকোনও বাধার সম্মুখীন হওয়ার দুটি পদ্ধতি রয়েছে। আপনি চিৎকার করতে পারেন, অনুযোগ করতে পারেন অথবা চুপচাপ সেই পরিস্থিতির সঙ্গে মানিয়ে নিয়ে জীবনের লক্ষ্য স্থির রেখে এগিয়ে যেতে পারেন। দানিশ এবং কুবরা দ্বিতীয় পথটিকেই বেছে নিয়েছেন।

একমাত্র অভিভাবক মা-কে যখন সংসার চালাতে পুরো সময়টাই নিজের ব্যবসার পিছনে দিতে হতো, তখন ভাই দানিশের সব খেয়াল রাখতেন দিদি কুবরা। "আমি বাবাকে ছাড়া মানুষ হয়েছি ঠিকই, কিন্তু দিদির মধ্যেও আমি একজন অভিভাবক কে খুঁজে পেয়েছি। আমি ঠিকসময় খাবার খাচ্ছি কি না তার খেয়াল রাখা থেকে শুরু করে স্কুলের হোমওয়ার্ক করানো, দিদি সবসময় আমার সঙ্গে ছিল। আমাদের সম্পর্কটা তাই খুব স্পেশাল। আমার বেড়ে ওঠার দিনগুলোয় আমার উপর দিদির প্রভাব ছিল সবচেয়ে বেশি," বলছেন দানিশ।

অন্যদিকে কুবরা আমাদের জানালেন, কীভাবে ভাইয়ের সঙ্গে তাঁর সম্পর্ক সময়ের সঙ্গে সঙ্গে আরও মজবুত হয়েছে। তাঁর মতে, "কখনও একজন অভিভাবকের মতো ওর দেখাশুনো করা থেকে শুরু করে কখনও বন্ধুর মতো ওর সঙ্গে ঘুরে বেড়ানো। যেকোনও সময় যেকোনও বিষয়ে ওর সঙ্গে কথা বলা, আমরা অনেকটা পথ একসঙ্গে পেরিয়ে এসেছি। তাই দুজনের মধ্যে যে বয়সের ফারাক রয়েছে, তা আর বুঝতেই পারি না।"

আরও অনেকটা পথ বাকি...

দানিশের মতে, তাঁর চলার পথ কখনওই সহজ ছিল না। হঠাৎ করেই রেডিওতে কাজের সুযোগ এলেও তিনি তা করবেন কি না বুঝে উঠতে পারছিলেন না। "বাহরেন-এ একটি রেডিও চ্যানেলে আমি কাজ করতে শুরু করি। প্রথম প্রথম তো একজন সঞ্চালক হিসেবে কী করব বুঝে উঠতেই পারতাম না। জোর করে সকলকে হাসাতে চাইতাম। আমার ভিতরের আমি-টাকে বের করে আনতে আমার বহু বছর লেগেছে।" দানিশ যেসময় তাঁর জনপ্রিয় অনুষ্ঠান 'সুপারি' তৈরী করেন, সেই সময় তিনি 'বাই-পোলার ডিপ্রেশন'-এর সঙ্গে লড়ছিলেন। তাঁর এই অনুষ্ঠান এতটাই সফল হয় যে, একসময় যাঁরা দানিশকে কাজ দেননি, ফিরিয়ে দিয়েছিলেন, তাঁরা নিজেরা এবার বিভিন্ন শো-এর জন্য তাঁকে ডাক পাঠাতে থাকেন।

"আমি জানতাম যে আমি একজন পারফর্মার হতে চাই। আমি জানি না আমি কমেডিকে সঙ্গে করেই বড় হয়েছি, না কি ধীরে ধীরে কাজ করতে করতে শিখে গেছি। তবে আজ এটা ভেবে ভালো লাগে যে আমি মানুষকে হাসাতে পারি।" আজ দানিশকে তাঁর কাজের ক্ষেত্রে আমরা বিভিন্ন ভূমিকায় দেখি, এর মধ্যে কোনটা তাঁর সবচেয়ে পছন্দের? জানতে চাওয়ায় তিনি বললেন, "আপনি যখন অনেকগুলো পছন্দের কাজ একসঙ্গে করেন তখন তার মধ্যে থেকে সবচেয়ে ভালোটা বাছা মুশকিল। এটা অনেকটা আপনার দুই সন্তানের মধ্য থেকে যেকোনও একজনকে বেছে নিতে বলার মতো।"

কুবরার জন্য কিন্তু তাঁর কেরিয়ারের পথ খুব কঠিন হয়নি। তবে পুরো অভিজ্ঞতাটাই তাঁর কাছে খুব স্পেশাল। "আমি যখন আমার প্রথম শো হোস্ট করি তখন আমার বয়স মাত্র ১২ কী ১৩। রাজ্যের সাতজন চিকিৎসককে সংবর্ধনা দিতে পদ্মশ্রী ইনস্টিটিউট অফ ফিজিওথেরাপি-তে বিশেষ অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়েছিল। আমি শাড়ি পরেছিলাম। ওইটুকু বাচ্চা তখন, তার উপর ৫মিটারের শাড়ি, তার সঙ্গে ফুলের মালা, উপহার পাওয়া চকোলেট আর এক ঝুড়ি ফল - সব হাতে নিয়ে ঠিক করে দাঁড়াতেও পারছিলাম না," বলতে গিয়ে হেসে ফেললেন কুবরা। যদিও আজ সেই ফলের বাস্কেট বহু পুরস্কার এবং মোটা অংকের চেক এনে দিয়েছে কুবরাকে, তবে এখনও স্টেজে উঠলে কুবরা সেদিনের সেই বাচ্চা মেয়েটির মতোই চঞ্চল, উৎসাহী।

ছোটবেলা কুবরা এতটাই অন্তর্মুখী ছিলেন যে তিনি স্টেজে উঠতে পারেন সেটাই কেউ বিশ্বাস করতে পারেনি! আজ তাঁর এই আত্মবিশ্বাসের পুরো কৃতিত্বই কুবরা দিতে চান তাঁর মা-কে। "এই জনপ্রিয়তা আমি উপভোগ করি। দুবাই থেকে যখন একটা ভালো চাকরি ছেড়ে এলাম, তখন আমার একটাই উদ্দেশ্য ছিল, বিখ্যাত হওয়া। আমি চাইতাম মানুষ আমাকে চিনুন। আর এই জনপ্রিয়তার সঙ্গে সঙ্গে যে দায়িত্ববোধ বর্তায়, তা আমি সাদরে গ্রহণ করতে রাজি।"

প্রেরণা এবং চ্যালেঞ্জ...

দানিশকে প্রেরণা যোগান বেঙ্গালুরুর মানুষ। "আপনি যত শুনবেন, দেখবেন, উপলব্ধি করবেন, তত বেশি কনটেন্ট পাবেন,"মত তাঁর। সিথ ম্যাকফারলেন-এর ভক্ত দানিশ চান তাঁর মতোই একটি অ্যানিমেটেড সিরিজ তৈরী করতে, যেখানে প্রত্যেকটি চরিত্রকে তিনি নিজের কণ্ঠস্বরে ফুটিয়ে তুলবেন।

চ্যালেঞ্জ-এর কথা বলতেই দানিশের বক্তব্য, "এখনও পর্যন্ত আমার সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ ছিল আমার অধৈর্য।" কুবরা বলছেন, "আমরা সবসময় ভয় পেতাম ওর এই অস্থিরতা থেকে হয়তো ও একদিন নিজের ক্ষতি করে ফেলবে।" দানিশ মানছেন, ধৈর্যহীনতার ফলে তিনি জীবনে অনেক কিছু হারিয়েছেন। কিন্তু প্রত্যেকটা সময়ে তাঁর পাশে থাকার জন্য মা এবং বোনের প্রতি তিনি কৃতজ্ঞ।  

আমাদের দেশে একজন মহিলা হিসেবে শুধুমাত্র মিডিয়া কেন, যেকোনও ইন্ডাস্ট্রিতেই সফল হওয়া কঠিন। কোনও কোনও ইভেন্টে কীভাবে অন্যদের খুশি করার জন্য ইভেন্ট ম্যানেজাররা বিভিন্ন ধরণের আপত্তিকর পোশাক আশাক পরতে বলেন সেকথাও জানাচ্ছিলেন কুবরা। একজন ইন্ট্রোভার্ট মেয়ে থেকে স্টেজে দাপিয়ে বেড়ানো একজন অ্যাঙ্কর - কুবরার জন্য এই পরিবর্তনটাই সবচেয়ে আশ্চর্যের। তাঁর মতে তাঁর মা-ই তাঁর সবচেয়ে বড় অনুপ্রেরণা। তিনি যেভাবে সব বয়সের মানুষের সঙ্গে একভাবে মিশতে পারেন সেটাই কুবরার কাছে সবচেয়ে ভালো লাগার বিষয়।

কী করা উচিত...

এই জগতে যারা সফল হতে চান তাঁদেরকে দানিশের একটাই পরামর্শ, সাফল্যের কিন্তু কোনও বাঁধা ধরা পথ নেই। "আপনি কোন জায়গা থেকে এসেছেন, এবং এই জায়গায় পৌঁছতে যে কষ্ট করেছেন তা কোনওদিন ভুলে যাবেন না। ভেবেচিন্তে নিজের বন্ধু বাছুন," পরামর্শ দানিশের।

"আপনি যদি সকলের সামনে নিজের বক্তব্য রাখতে চান, তাহলে আপনাকে সত হতে হবে। অধিকাংশ মানুষই স্ক্রিপ্টেড লাইনের উপর ভরসা করেন। আমি এবং দানিশ দুজনেই কিন্তু স্টেজে ওঠার আগে কেবলমাত্র কিছু নোটস নিয়ে যাই। মন থেকে যে কথাগুলো বলা উচিত বলে মনে হয়, স্টেজে উঠে সেগুলোই বলি," যোগ করলেন কুবরা। তাঁর মতে, "শুধুমাত্র টাকার জন্য কাজ করবেন না। নিজের ভালো লাগা এবং ভালোবাসা দিয়ে কাজ করুন।"

দানিশ এবং কুবরার বিষয়ে তো আমরা জানলাম, কিন্তু তাঁদের মা, ইয়াসমিন সইতের সম্পর্কে কোনও কথা না বললে এই কাহিনী অসম্পূর্ণ থেকে যাবে। কুবরা এবং দানিশের মতে তিনি তাঁদের ম্যানেজার নন, 'মমেজার'। ইয়াসমিনের প্যাশন এবং সবকিছুর সঙ্গে মানিয়ে চলার ক্ষমতা তাঁদের দুজনকেই অবাক করে।

এই পরিবারের প্রত্যেকের উৎসাহ যেন খানিকটা ছোঁয়াচে। এমন একটা দুনিয়া যেখানে ধীরে ধীরে হারিয়ে যেতে বসা সম্পর্কগুলোর মানে খুঁজে পাওয়া মুশকিল, যেখানে প্রত্যেকটা সম্পর্কই নড়বড়ে, সেখানে দাঁড়িয়েও এই দুই ভাই-বোনের জীবনকাহিনী আমাদের মনে দাগ কেটে যায়। বুঝিয়ে দেয়, পরিবার, ভালোবাসা - এই শব্দগুলোর মানে এখনও হারিয়ে যায়নি।

লেখা : প্রতীক্ষা নায়েক
অনুবাদ : বিদিশা ব্যানার্জী