গুগলি খেতে নলবনে ভিড়

1

সুকুমার রায়ের হযবরলয় কী কী খাওয়া যায় আর কী খাওয়া যায় না তা নিয়ে বিশদে একটা কেস স্টাডি আছে। সেই তালিকায় টিকটিকি চেখে দেখাও আছে। কিন্তু কত কিছুকেই আমরা অখাদ্য ভেবে চেখে দেখি না, সেই না চেখে দেখা খাদ্যগুলো এখন রমরমিয়ে চলছে। আজ শোনাবো রাজ্য মৎস্য নিগমের উদ্যোগে ভদ্রলোকের খাবার থালায় উঠে আসা গেরি গুগলির গল্প।

এতদিন গরিব গুর্বো মানুষের খাদ্য তালিকায় ছিল গুগলি গেরি। কখনও স্যুটবুট পরা নাক শিঁটকোনো ভদ্রতা একে খাদ্যের মর্যাদাই দেয়নি। এবার চেটে পুটে সেই সবই খাচ্ছে এই প্রজন্মের মধ্যবিত্ত।

যদিও বীরভূম, বাঁকুড়া, পুরুলিয়ায় গুগলি পোস্তর মত সুস্বাদু পদ আর হয় না তা সকলেই এক বাক্যে স্বীকার করেন। এ বার কলকাতাতেও গুগলিকে জনপ্রিয় করতে গেরি গুগলির দোপিঁয়াজি, গুগলি কষার ব্যবস্থা করেছে রাজ্য মৎস্য উন্নয়ন নিগম। নলবনের ফুডপার্কে মাছের নানা পদের সঙ্গে সাজানো গুগলির টিক্কা কিনতে লাইন দিচ্ছে অফিস ফেরতা ছাপোষা মধ্যবিত্ত। কলকাতার রেস্তোরাঁয় যে গুগলির পদ ভাবাই যেত না এতদিন। এবার তাই খেতে ভিড় এই রেস্তোরাঁয়। অনেকেই বসে খাচ্ছেন, আবার বাড়ির লোকেদের জন্যে নিয়েও যাচ্ছেন। দারুন সাড়া। নতুন পদ চেখে দেখতে রোজ কাউন্টারে উপচে পড়ছে ভিড়।

নিগমের ম্যানেজিং ডিরেক্টর সৌম্যজিৎ দাস জানালেন, ‘মাত্র দেড় মাসে প্রায় সাড়ে ৪ লক্ষ টাকা আয় হয়েছে গুগলির নানা পদ বিক্রি করে। চাহিদার কথা ভেবে গুগলির স্যুপও বানানো হয়েছে।’ এমনিতে গুগলি কিনতে কোনও দাম দিতে হয় না। নিগম কর্তার কথায়, রাজ্যে অনেক জলাশয় রয়েছে তাদের। সেখানে মাছ তোলার সময় উঠে আসে গুগলি। গুগলির খোল থেকে তার মাংস বের করতেই খরচ হয়। সুন্দরবন, পশ্চিমাঞ্চলের একাধিক জেলা এবং উত্তর ২৪ পরগনার কিছু এলাকায় স্বনির্ভর গোষ্ঠীর সঙ্গে যুক্ত মহিলাদের সেই কাজে যুক্ত করা হয়েছে। খোসা ছাড়ানোর জন্য এক কিলোগ্রাম গুগলি পিছু ৬০ টাকা করে মজুরি দেওয়া হয়। গ্রামের গরিব মহিলাদের কর্মসংস্থানের সুযোগও মেলে গুগলির খোলা ছাড়ানোর কাজে। ফলে এক কাজে দু কাজ করে ফেলছে মৎস্য নিগম।

রাজ্যের মৎস্যমন্ত্রী চন্দ্রনাথ সিংহ নিজেও বীরভূমের বাসিন্দা। পুকুর, জলাশয় থেকে পাওয়া গুগলি থেকেও যে আয় হতে পারে তা বুঝেই নিগমের কর্তাদের এ ব্যাপারে উৎসাহী করেন। সৌম্যজিৎবাবু জানান, ‘নলবনে প্রতিদিন গুগলির চপ, কষা, দোপিঁয়াজি এবং টিক্কা ছাড়াও কাঁচা গুগলি প্যাকেটে বিক্রি করা হয়। স্যুপের দাম প্লেট পিছু ৬০ টাকা। দোপিঁয়াজি ৪০ টাকা প্লেট। আর এক প্লেট গুগলির চপ পাওয়া যায় ১০ টাকায়। ধীরে ধীরে বাড়ছে চাহিদাও।’

কতটা খাদ্য গুণ রয়েছে গুগলিতে? ডাক্তাররা বলেন, গুগলি খেলে দৃষ্টিশক্তি ভাল থাকে। শুধু নলবনে নয়, শহরের বিভিন্ন মেলাতেও গুগলির পদ বিক্রির ব্যবস্থা করছে মৎস্য নিগম। শহরের চিনা রেস্তোরাঁগুলির মেনুতে মাঝেসাঝে গুগলির পদ দেখা যাচ্ছে। ঠিকভাবে বাণিজ্যিকরণ করা গেলে গুগলির মতো উপাদেয় এবং উপকারী খাবার পাল্লা দিতে পারে চিকেন-প্রনের সঙ্গে। সহজ উৎপাদন এবং সহজলভ্য একই সঙ্গে সেভাবে চাহিদাও এখনও হয়ে ওঠেনি বলে দামেও কম। খাদ্যগুণ এবং স্বাদে কোথাও পিছিয়ে নেই গুগলি। দরকার একটু প্রচার। চিংড়ি বা মাছের চাষের মতোই গুগলিকে ঘিরে খুলে যেতে পারে বাণিজ্যের নতুন দিক।