ভারতে কি ভিডিও-অন-ডিমান্ডের প্রয়োজনীয়তা বাড়ছে?

0

২২ জুন ২০১২, যখন ভারতে 'গ্যাংস অফ ওয়াসেপুর' ছবিটি মুক্তি পেল, বিদেশে বসবাসকারী বহু ভারতীয় ছবিটি দেখার জন্য ব্যাকুল হয়ে ছিলেন। তাঁদের মধ্যে কয়েকজন হলেন সিঙ্গাপুরে বসবাসকারী ইনভেস্টমেন্ট ব্যাঙ্কার অভয়ানন্দ সিং-এর বন্ধুবান্ধব। অভয় নিজেও ছবিটি দেখতে উৎসুক ছিলেন। তবে ঘটনাচক্রে যেসময় ছবিটি সিঙ্গাপুরে মুক্তি পায় সেই সময় তিনি বেশ কিছুদিনের জন্য বাইরে গিয়েছিলেন। অভয়ের মতো একজন মানুষ যার জীবনে সিনেমা দেখা একটা প্যাশন, তাঁর জন্য একটা মাস্টারপিস মুক্তির পর দীর্ঘ ছয় মাসের প্রতীক্ষা একপ্রকার শাস্তিই বলা যেতে পারে। সিনেমার প্রতি এই ভালোলাগা থেকেই Muvizz এর ভাবনা আসে তাঁর মাথায়। এরপর টিভি সিরিয়াল এবং ডকুমেন্টারির প্রযোজক পীযুষ সিং-এর সঙ্গে তাঁর আলাপ খানিকটা সোনায় সোহাগার মতো। ব্যস্, দুজন মিলে অন্ত্রপ্রেনিওরশিপের ভবসাগরে ডুব দিলেন।

Muvizz একটি ওভার দ্য টপ বা ভিডিও অন ডিমান্ড প্ল্যাটফর্ম যা পৃথিবীজুড়ে সিনেপ্রেমীদের বিভিন্ন বিষয়ে বাছাই করা সিনেমা সরবরাহ করে থাকে। তাঁদের এই তালিকায় বিভিন্ন ভাষার ফিচার ফিল্মের পাশাপাশি শর্ট ফিল্ম এবং ডকুমেন্টারিও রয়েছে। সংস্থার মূল লক্ষ্যই হল বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তের মানুষ যাঁরা সিনেমা ভালোবাসেন, তাঁদের জন্য একটি সোশ্যাল কমিউনিটি তৈরী করা। যেখানে তাঁরা শুধুমাত্র সিনেমা দেখতেই নয়, তাঁদের পছন্দের এই বিষয়টি নিয়ে আলোচনাও করতে পারবেন।

চমকপ্রদ এই ভাবনা অভিনেতা মনোজ বাজপেয়ীর মনে ধরে। তিনিও এই সংস্থার অংশীদার হবেন বলে ঠিক করেন। এই মুহূর্তে অভয়ের স্টার্ট আপকে সঠিক পথে চালিত করতে এই সংস্থার সঙ্গে কাজ করছেন তিনি।

'মুভিজ' এবং তাদের পরবর্তী পরিকল্পনার কথা জানতে মনোজ এবং অভয়ের মুখোমুখি হয়েছিল ইওর স্টোরি। সেই কথোপকথনের খানিকটা অংশ তুলে ধরছি এই প্রচ্ছদে:

'ঠিক কী করতে চলেছেন সেবিষয়ে স্পষ্ট ধারণা ছিল না'

অভিনয়ের প্রতি তাঁর ভালোবাসা এবং ভালো গল্প, এই দুটিই মনোজের কাছে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। আর এই জায়গা থেকেই তাঁর 'মুভিজ'-এর সঙ্গে কাজ করার সিদ্ধান্ত। যদিও অভয়ের সংস্থা ঠিক কী কাজ করতে চলেছে সেবিষয়ে তাঁর স্পষ্ট ধারণা ছিল না। তবে এখন তিনি বলছেন,

'মুভিজ'-এ সবরকমের কাল্ট এবং ক্লাসিক ছবি, যা আর কোথাও পাওয়া যায় না, সেগুলি তাঁরা তুলে ধরতে চান।

অভয়ের মতে, ভারতে অত্যন্ত ভালো মানের ছবি তৈরী হলেও শুধুমাত্র পুঁজির অভাবে জাতীয় পুরস্কারপ্রাপ্ত ছবিও খুব বেশিসংখ্যক দর্শকের কাছে পৌঁছতে পারে না। আধুনিক প্রযুক্তির সাহায্যে এই ছবিগুলিকে সব জায়গার মানুষের কাছে তুলে ধরতে চায় 'মুভিজ'। গত ১৮ মাস ধরে এই বিষয়গুলিকে মাথায় রেখেই তাঁদের টেকনোলজি এবং বিজনেস মডেল তৈরী করেছে অভয়ের টিম।

নতুন পরিচালক এবং শিল্পীদের কীভাবে সাহায্য করে 'মুভিজ'?

দেশজুড়ে একের পর এক ব্যাঙের ছাতার মতো গজিয়ে উঠতে থাকা মাল্টিপ্লেক্স স্বাধীন ফিল্ম মেকারদের সাহস জুগিয়েছিল। তাঁরা আশা করেছিলেন এবার হয়তো তাঁদের ছবি আরও বেশি মাউষের কাছে পৌঁছবে। কিন্তু আদপে তা একেবারই হয়নি। মাল্টিপ্লেক্সগুলিও মূলধারার ছবি দেখাতেই বেশি উৎসাহ প্রকাশ করেছে। অনলাইন বেশ কিছু প্ল্যাটফর্ম তৈরী হয়েছিল ঠিকই, কিন্তু ব্যবসার খাতিরে তারাও মেইনস্ট্রিম ছবির প্রতি অধিক আগ্রহী। তবে, অভয়ের বিশ্বাস 'মুভিজ' এই পরিস্থিতির পরিবর্তন ঘটাতে পারবে। সম্প্রতি আর ডি বর্মনের উপর তৈরী ব্রহ্মানন্দ সিং-এর জাতীয় পুরস্কারপ্রাপ্ত একটি ডকুমেন্টারি বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে ১০০টি জায়গায় প্রাইভেট স্ক্রিনিং-এরব্যবস্থা করেছিল এই সংস্থা। এইধরণের কাজ আরও বেশি করে তুলে ধরতে চান তাঁরা।

কীভাবে কাজ করে এই ওয়েবসাইট?

এই সাইটের দুটি উল্লেখযোগ্য বৈশিষ্ট্য হল -

১. বিষয়বস্তু অনুযায়ী ছবি বাছাই:

এই ওয়েবসাইটে এক একটি দিন এক এক ধরণের ছবির জন্য নির্দিষ্ট করা হয়েছে। যেমন আঞ্চলিক ভাষার ছবি বৃহস্পতিবার, ছায়াছবি শুক্রবার এবং বিদেশী ভাষার ছবি রবিবার দেখানো হয়।

২. সোশ্যাল কমিউনিটি:

যেখানে ব্যবহারকারীরা সমমনস্ক ব্যক্তিদের সঙ্গে যোগাযোগ এবং তথ্য ও ভাবনাচিন্তার আদানপ্রদান করতে পারবেন। সেই সঙ্গে বিভিন্ন ধরণের ছবি এবং আমাদের সমাজে সেইসব ছবির প্রয়োজনীয়তার বিষয়টিও তুলে ধরা যাবে।

নিজস্ব ইউজার বেস এবং সেনপ্রেমীদের কমিউনিটি গড়ে তোলার লক্ষ্য নিয়েই এগিয়ে চলেছে এই প্ল্যাটফর্ম। বর্তমানে এখানে বিনামূল্যে, নির্দিষ্ট মাসিক চুক্তির ভিত্তিতে এবং ফিল্ম প্রতি টাকা দিয়ে ছবি দেখার ব্যবস্থা রয়েছে। পেড সার্ভিসের ক্ষেত্রে মোট আয় 'মুভিজ' এবং কন্টেন্ট প্রোভাইডারে মধ্যে সমানভাগে ভাগ হয়ে যায়। এছাড়াও ছবির মাঝে দেখানো বিজ্ঞাপন (অনেকটা ইউটিউবের মতো) থেকে খানিকটা অতিরিক্ত আয় হয়।

সিনেমাকে আলোচনা এবং তর্কের মাধ্যম হিসেবে তাদের এই প্ল্যাটফর্মে ব্যবহার করতে চায় 'মুভিজ'। আলাদা করে সমালোচকদের বিভাগ এবং সম্পাদকীয় বিভাগ চালু করার পরিকল্পনাও রয়েছে। প্রতি ক্ষেত্রেই গ্রাহকদের জন্য 'লাইক' এবং 'কমেন্ট' করারসুযোগও থাকবে। অন্যান্য সোশ্যাল মিডিআর মতো এখানেও নিজের অ্যাকাউন্ট খোলা যাবে।

'ফ্রেন্ডস অফ মুভিজ'

মনোজ বাজপেয়ী এই সংস্থায় মেন্টর হিসেবে যোগ দিয়েছেন। সেইসঙ্গে 'ফ্রেন্ডস অফ মুভিজ'-এ রয়েছেন বিশাল ভরদ্বাজ, অনুরাগ কাশ্যপ, শাবানা আজমি, নওয়াজউদ্দিন সিদ্দিকি, কেতন মেহতা, তিগমাংশু ধুলিয়া, রাজকুমার রাও-এর মতো ব্যক্তিত্বরা। অভয়ের মতে, এঁরা সকলেই জানেন, বড় বাজেটের কমার্শিয়াল ছবি আপনা থেকেই অনেক মানুষের কাছে পৌঁছবে। এধরণের উদ্য়োগের পাশে থেকে তাঁরা সিনেমা মাধ্যমটিকে যেমন সমর্থন করছেন, তেমনই নতুন পরিচালকদের অন্যধারার ছবি বানাতে উৎসাহও যোগাচ্ছেন।

অভিনেতা, পথপ্রদর্শক এবং বিনিয়োগকারী

'মুভিজ' প্রথম প্রকল্প নয় যেখানে অনেক অভিনেতা একসঙ্গে আগ্রহপ্রকাশ করেছেন। বলিউডের বহু তারকাই ধীরে ধীরে অন্ত্রপ্রেনিওরশিপের দিকে এগোচ্ছেন। মনোজ জানাচ্ছেন, 

"মুভিজ আমারা জন্য কোনও ভেঞ্চার নয়। এটি একটি প্যাশন। সিনেপ্রেমীদের কাছে ভালো ছবি তৈরী করা এবং তাদের কাছে সেই ছবি পৌঁছে দোওয়াই আমার লক্ষ্য।"

তাঁর বিশ্বাস, সিনেমা আসলে আমাদের আর্থসামাজিক পরিস্থিতির কথাই তুলে ধরে। সাধারণ মানুষের কথা বলাই সিনেমার কাজ। এই কাজটাকেই আরও একধাপ এগিয়ে নিয়ে যেতে চায় 'মুভিজ'।

কাজের পরিধি বিস্তারের পরিকল্পনা:

ইতিমধ্যেই প্রাথমিক বিনিয়োগ পেয়ে গিয়েছে এই সংস্থা। পরের ধাপের বিনিয়োগ টানতে পরিকল্পনা চলছে। মূলত যে খাতে অর্থ বিনিয়োগ হচ্ছে সেগুলি হল:

১. ভালো ছবির সঙ্গে চুক্তি

২. প্রযুক্তি - মোবাইল অ্যাপ তৈরী এবং ওয়েবসাইটকে প্রযুক্তিগতভাবে আরও উন্নত করে তোলা

৩. সিনেপ্রেমীদের কমিউনিটি বৃদ্ধিতে অনলাইন এবং অফলাইনে বিভিন্ন উদ্যোগ

ওয়েবসাইটে নিজেদের এক্সক্লুসিভ কনটেন্ট তৈরীর কাজ করছে 'মুভিজ'। ভিডিও অন ডিমান্ডের এই পরিকল্পনা ইতিমধ্যেই বিভিন্ন প্রযোজনা সংস্থা এবং শুরুয়াতি সংস্থার নজর কেড়েছে। Eros Now, Hungama Play, Hotstar, HOOQ-এর মতো সংস্থা ইতিমধ্যেই তাদের গ্রাহকদের কাছে ভিডিও অন ডিমান্ড পরিষেবা পৌঁছে দিয়েছে। তবে এই সব প্ল্যাটফর্মে মাসিক কিস্তিতে টাকা দিতে হয়।

এদেশের অন্যান্য ভিডিও অন ডিমান্ড পরিষেবার চেয়ে 'মুভিজ' অনেকটাই আলাদা। এর সঙ্গে সান ফ্রান্সিসকোর সংস্থা Mubi.com-এর মিল রয়েছে। কলিউডে হিরোটকিজ নামক এধরণের একটি সংস্থা রয়েছে। নেটফ্লিক্স ও এখনও কাজ শুরু করতে পারেনি। সবমিলিয়ে ভিডিও অন ডিমান্ড পরিষেবাক্ষেত্রের পরিধি ধীরে ধীরে বৃদ্ধি পাচ্ছে। এক্ষেত্রে বিদেশী সংস্থাগুলি ভারতে আগ্রহ দেখাতে শুরু করলে তবেই এই বাজারের আসল পরিধি বোঝা সম্ভব।

লেখা - আলোক সোনি এবং জয় বর্ধন

অনুবাদ - বিদিশা ব্যানার্জী