মেয়েদের ভাষা :‘ভয়েস ফর গার্লস’

0

মহিলাদের অবস্থান সংক্রান্ত বিষয় নিয়ে সম্প্রতি ৩৭০ জন লিঙ্গ বিশারদের ভোটে ২০টি জাতির (Group of 20 nations) মধ্যে সবচাইতে খরাপ জায়গায় স্থান পেয়েছে ভারত। সারা দেশে দেড় হাজারের বেশি অল্প বয়েসী মেয়েদের নানা বিষয়ে শিক্ষার মাধ্যমে ২০১১ সাল থেকে ভারতে মহিলাদের এই অবস্থার বদল ঘটানোর চেষ্টা করে চলেছে ‘ভয়েস ফর গার্লস’ (VOICE 4 Girls)।

‘ভয়েস ফর গার্লস’ এর গল্পের শুরু ২০১০ সালের অগস্টে ৩ মার্কিন যুবতীর উদ্যোগে। ওই সময়টায় ৩ মার্কিনীই সামাজিক উদ্যোগ (Social Enterprise) এ আইডিইএক্স ফেলোশিপ করতে গিয়ে হায়দরাবাদে নিম্নবিত্তদের জন্য একটি বেসরকারি স্কুলে একসঙ্গে কাজ করছিলেন । ২০১১ জানুয়ারিতে ‘নাইক ফাউন্ডেশন’ ‘গ্রে ম্যাটার ক্যাপিটাল’এর সঙ্গে যোগাযোগ করে। ‘গ্রে ম্যাটার ক্যাপিটাল’ মূলত ভারতে নিম্নবিত্ত বাড়ির মেয়েদের জন্য ইংলিশ সামার ক্যাম্পের আয়োজনের জন্য আইডিইএক-কে ফেলোশিপের অনুদান দেয়। অ্যাভরিল স্পেন্সার, অ্যালিসন গ্রোস এবং আইয়ানা শুশানস্কি হাতে যেন চাঁদ পেলেন। এই সুযোগ হারানোর কোনও জায়গাই দিলেন না। এমন কাজের সুযোগ রীতিমতো লুফে নিলেন।

‘নানা পরিসংখ্যান, গবেষণার তথ্য নিয়ে আমরা মাঠে নেমে পড়লাম। কিন্তু মেয়েদের সঙ্গে যখন কথা বলা শুরু করলাম বুঝতে পারলাম, সদ্য বয়সন্ধিতে পা রাখা মেয়েদের হাসিখুশি, সুস্থ এবং সুরক্ষিত রাখার জন্য যে জ্ঞানটুকু থাকার দরকার তার যথেষ্ট অভাব রয়েছে’, ব্যাখ্যা দিলেন ‘ভয়েস ফর গার্লস’ এর ডিরেক্টর স্পেন্সার। হাতে গরম জ্বলজ্বলে উদাহরণ পেলাম একটি কিশোরীর কাছ থেকে। সে জানাল, প্রথম যখন ঋতুমতী হয় তখন জানত না কেন রক্তক্ষরণ হচ্ছে। নিজেই ভেবে নিয়েছে তার ক্যান্সার হয়েছে। প্রতিদিন কাঁদত আর বাবা-মায়ের কাছ থেক লুকিয়ে থাকত। কারণ সে মারা যেতে চলেছে তার এই ভাবনা বাবা-মাকে জানাতে ভয় পাচ্ছিল’, জানালেন স্পেন্সার। ‘চলো মানলাম সবকিছু, কিন্তু একটা মেয়ের এই অবস্থার মধ্যে দিয়ে যাওয়ার কী মানে আছে? বয়সন্ধি যথেষ্ট কঠিন ব্যাপার,কিন্তু শারীরিক পরিবর্তন বুঝতে না পারাটা নিজেকে অন্যদের থেকে আলাদা বা বিজাতীয়, দুর্বল এবং বিপদের দিকে ঠেলে দেয়”, বলেন স্পেন্সার।

ভারতের মহিলারা স্বাস্থ্য এবং শিক্ষায় অবহেলার শিকার অথচ দারীদ্র দূরীকরণে তারাই সবচেয়ে বলিষ্ঠ বূমিকা পালন করে। নাইকের গার্লস এফেক্ট ক্যাম্পেইন,যারা আবার ‘ভয়েস ফর গার্লস’কেও আর্থিক সাহায্য দেয়, তারা এই দারীদ্র্য চক্র ভাঙতে মেয়েদের নিয়ে কাজ করে। এমন ধরণের ক্যাম্পেইন বিশ্বাস করে যদি, মেয়েদের ইংরেজি শিক্ষা, আর্থিক শিক্ষা, স্বাস্থ্য এবং নারীর অধিকার দেওয়া যেতে পারে তাহলে তারা বাড়ির সবাইকে প্রভাবিত করে, যেখানে তার বিয়ে হবে সেখানকার লোকজনকে, তার নিজের ছেলেমেয়েকে এই তিন প্রজন্ম এবং আরও সামনের দিকে তাকালে গোটা সমাজটাই বদলে দিতে পারে ।

২০১১ র মে তে ‘ক্যাম্প ভয়েস’ শুরু হয়। এটা চার সপ্তার একটা সামার ক্যাম্প যেখানে ইংরেজি শিক্ষার মাধ্যমে স্বাস্থ্য, পুষ্টি, পরিস্কার পরিচ্ছন্নতা, নারীর অধিকার এবং শারীরিক ভাষা সংক্রান্ত নানা বিষয় শেখানো হয়। তাদের ছাত্রীদের জন্য ভয়েস ক্যাম্পের আয়োজন করে নিম্নবিত্তদের বেসরকারি স্কুলগুলি । অল্প বয়েসি মহিলা পরামর্শদাতা এবং শিক্ষিকারা ক্যাম্প চালান, এই অভ্যেস তাঁদের মধ্যে নেতৃত্ব দেওয়ার এবং পড়ানোর ক্ষমতা তৈরি করে।

এভাবে ক্যাম্প করে এবং লাইসেন্স ফির অংশীদার হতে পারলে, এটাও এক ধরণের ব্যাবসা হতে পারে। ‘ভয়েস ফর গার্লস’ বিভিন্ন স্কুলের সঙ্গে নিবিড়ভাবে যোগাযোগ রেখে তাদের প্রযোজন মতো কাজ করে। ‘ভয়েস ফর গার্লস’ হায়দরাবাদ, উত্তরাখণ্ডের বিঙিন্ন স্কুলে ক্যাম্প করে এবং মুম্বইয়ে সামার ২০১৩ ক্যাম্প করেছে। ৩ জন প্রতিষ্ঠাতা সদস্য থেকে এখন ১০ জনের টিম হয়েছে।স্পেন্সার জানান, ছোট আকারে হলেও আবেগপ্রবণ,স্ব-উদ্যোগী এবং সৃজনশীল কয়েকজনকে সংস্থায় রাখা হয়েছে। ‘ভয়েস ফর গার্লস’ এবার সারা বছরের জন্য কো-এড (ছেলেমেয়ে উভয়ের)স্কুল প্রোগ্রাম চালু করছে। ‘তবে আমরা এটাও ভাবছি মেয়েদের খোলামেলা আলোচনার জন্য এবং যাতে তাদের অস্বস্তি না লাগে, আত্মবিশ্বাসী থাকে তার জন্য একটা আলাদা পরিবেশ দরকার যেখানে শুধু মেয়েরাই থাকবে’, বলেন স্পেন্সার। ‘লিঙ্গ-বৈষম্য দুদিক থেকে হতে পারে। আমরা যতটা পারি মেয়েদের নিয়ে কাজ করতে চাই। কিন্তু ভাইদের, বাবাদের এবং গোটা পুরুষ সমাজকে শিক্ষিত করতে হবে এবং মেয়েদের পাশে থাকতে হবে’।সারা বছরের এবং বিশেষ করে গ্রীষ্মকালীন কর্মসূচির মাধ্যমে ‘ভয়েস ফর গার্লস’ ২০১৩র গ্রীষ্মের শেষ পর্যন্ত ভারতের ৩০০০ শিশুকে পড়ানো এবং নানা বিষয়ে তাদের শিক্ষা দেওয়ার লক্ষ্য রেখেছিল। তাদের পরিকল্পনা হল সারা ভারতের হাজার হাজার শিশুদের কাছে এভাবে পৌঁছে যাবে ‘ভয়েস ফর গার্লস’ ।