ক্রিকেট ক্রিজ থেকে জঙ্গলে, বন্যপ্রাণী সংরক্ষণে ব্যস্ত অনিল কুম্বলে

0

অনিল কুম্বলে, ভারতীয় ক্রিকেট টিমের প্রাক্তন অধিনায়ক। কিন্তু ক্রিকেটের ১১ গজের বাইরে এক অন্য পরিচয় রয়েছে ভারতের এককালের সেরা এই স্পিনারের। বন্যপ্রাণী সংরক্ষণে উল্লেখযোগ্য ভূমিকা রয়েছে এই ক্রিকেটারের।

জঙ্গলে ঘুরতে যাওয়া ও ছবি তোলার বাইরে কিছু করতে চাইছিলেন কুম্বলে। নিজের ডাক নাম ব্যবহার করেই খুলে ফেলেন দ্য কুম্বলে ফাউন্ডেশন-জাম্বো ফান্ড। উদ্দেশ্য টাকা সংগ্রহ ও যেসব ব্যক্তি, এনজিও কর্মী ও বনকর্মী বন্যপ্রাণী সংরক্ষণে কাজ করছেন তাঁদের স্বীকৃতি দেওয়া। তবে এনজিও চালানো ও ফান্ড সংগ্রহ যে সহজ কাজ নয় তা মানছেন কুম্বলে, জানালেন সংগঠন চালানোর জন্য অনেক সময় নিজের টাকাতেও হাত দিতে হয়েছে।

২০০৯ সালে কর্ণাটক সরকারের বন্যপ্রাণী বোর্ডের সহ-সভাপতি নিযুক্ত হন কুম্বলে। বন্যপ্রাণী সুরক্ষা আইন ১৯৭২ অনুযায়ী গঠিত এই বোর্ডের কাজ, সরকারকে বন্যপ্রাণী সংরক্ষণ নীতি প্রণয়নে পরামর্শ দান। তার সময়ে আরও বেশি জায়গাকে বন সুরক্ষার আওতায় আনা হয়েছিল যা ছিল একটি কঠিন কাজ, কারণ বেশিভাগ রাজ্যই এখন বন কেটে রাস্তা চওড়া করতে ব্যস্ত। বন্যপ্রাণী সংরক্ষণের কাজটা কতটা কঠিন তা জেনেই মাঠে নেমেছেন কুম্বলে, ইওরস্টোরিকে দেওয়া সাক্ষাতকারে জানালেন সেই কঠিন পথের কথা, কী ভাবে শুরু, ভবিষ্যৎ লক্ষ্য নিয়ে আলোচনা করলেন খোলাখুলি।

কীভাবে শুরু হল জাম্বো ফাউন্ডেশন?

সমাজকে কিছু ফিরিয়ে দিতে চাইছিলাম, আর বন্যপ্রাণী সংরক্ষণের জন্য কাজ করার ইচ্ছেটা বরাবরের। তবে পুরোটাকে সুসংগঠিত ভাবে করাটা জরুরি ছিল। তাই আমার স্ত্রী চেতনা কুম্বলের সঙ্গে ২০০৯-১০ সালে কুম্বলে ফাউন্ডেশন ও সহযোগী জাম্বো ফান্ড শুরু করি।

ফাউন্ডেশনটি তৈরি করার মূল লক্ষ্যই ছিল বন্যপ্রাণী সংরক্ষণে কাজ করা। এছাড়াও অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ ইস্যু যেমন ক্যান্সার প্রতিরোধ ও চিকিৎসা ইত্যাদি বিষয়ও কাজ করার ইচ্ছে ছিল।

আমাদের একটি বড় উদ্যোগ, কিরণ মজুমদার সাউএর সহযোগিতায় একটি পুরস্কার ও অভ্যর্থনা সভার আয়োজন। সেখানে বন্যপ্রাণী সংরক্ষণের কাজে যুক্ত কর্ণাটকের বনকর্মী ও আধিকারিকদের পুরস্কৃত করা হয়।


এছাড়া আরও একটি বড় উদ্যোগ হল দক্ষিণ আফ্রিকায় দু’সপ্তাহের একটি প্রোগ্রাম. চারজন প্রতিভাবান বন আধিকারিককে দক্ষিণ আফ্রিকার জাতীয় উদ্যানগুলিতে সেখানকার প্রতিকূলতাগুলি বুঝতে পাঠানো হয়। মূলতঃ আহত পশুপাখির চিকিৎসা, ঘুম পাড়ানোর পদ্ধতি, মানুষ ও পশুর মধ্যে সংঘাত এড়ানো ইত্যাদি বিষয় কাজ শিখতে পাঠানো হয় তাঁদের।

এছাড়াও এই সংক্রান্ত নানা গবেষণা ও প্রকল্পেও সাহায্য করা হয়। সম্প্রতি একটি গবেষণা চলছে যেখানে অন্য জায়গার প্রাণী আন্দামান দ্বীপে নিয়ে গেলে কী প্রভাব পড়ে তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে।

কর্ণাটকের বাইরে কাজ শুরু করতে চাই আমরা এবং খুব শিগগিরিই সারা ভারতে ছড়িয়ে পড়তে চাই। বন্যপ্রাণী সংরক্ষণের পাশাপাশি সংস্কৃতি, শিল্প ও আধ্যাত্মিক বিষয়ও কাজ করার ইচ্ছে রয়েছে।

টাকা সংগ্রহের প্রতিকূলতা

ফাউন্ডেশনের জন্য টাকা সংগ্রহ করা সহজ ছিল না। কোনও কোনও সময় কয়েকটি উদ্যোগে আমি নিজে টাকা দিয়েছি। তবে পরিচিত মুখ হওয়ার সুবিধা তো রয়েইছে। গ্রহণযোগ্যতা এবং সচেতনতা বৃদ্ধিতে সুবিধা হয়। ক্রিকেট অনেক বাধাই দূর করে আর প্রয়োজনীয় সাহায্য পাওয়ার ক্ষেত্রে সেই সুবিধা আমি পেয়েছি।

এমনকি কর্ণাটক বন্যপ্রাণী বোর্ডে সহ-সভাপতি থাকাকালীনও ক্রিকেটার পরিচিতি আমাকে সাহায্য করেছে নানা কাজ করতে। যারা এনজিও তৈরি করতে চান অবশ্যই তাঁদের তা করা উচিত। ভারত এত বড় একটি দেশ, সেখানে এত সমস্যা যে খুব ছোট পদক্ষেপও এখানে কার্যকরী। তাই এইধরনের উদ্যোগকে সবসময়ই উত্সাহ দেওয়া উচিত।

বন্যপ্রাণী সংক্রান্ত নীতি নির্ধারণের কাজের অভিজ্ঞতা

কর্ণাটক সরকারের কাছে আমি কৃতজ্ঞ আমাকে এই সুযোগ দেওয়ার জন্য। আমি খুবই উপভোগ করেছি। আর বেশ কয়েকটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ উদ্যোগও নিতে পেরেছি। সংরক্ষিত এলাকার পরিমাণ ৩.৮ শতাংশ থেকে বাড়িয়ে ৫.২ শতাংশ করি আমরা, কর্ণাটকই ভারতে একমাত্র রাজ্য যেখানে সংরক্ষিত এলাকার পরিমাণ বৃদ্ধি করা হয়। এর পাশাপাশি পাখিরালয়, সংরক্ষিত জঙ্গল ও জাতীয় উদ্যানগুলির গুরুত্ব বৃদ্ধিতেও কাজ করা হয়।


কর্মীদের উন্নয়ন ছিল আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ কাজ। আমরা শূণ্য-পদগুলি পূরণ করে নতুন কর্মী নিয়োগ করি, অতীতে এটাই একটা বড় চ্যালেঞ্জ ছিল।

পুরো অভিজ্ঞতাটাই খুব ভাল ছিল। কাজের খারাপ দিকগুলি আমি মনে রাখতে চাই না। আমার টিমের সঙ্গে কাজ করা ছিল খুবই আনন্দদায়ক অভিজ্ঞতা। সহকর্মী ও সরকারি আধিকারিকদের থেকে প্রচুর সাহায্য পেয়েছি।

জঙ্গল ট্যুরিজম- আশীর্বাদ না অভিশাপ?

বনবিভাগের প্রাথমিক কাজ সংরক্ষণ, সবথেকে বেশি সময় তাঁদের দেওয়া উচিত বন্যপ্রাণীদের সুরক্ষায়। কিন্তু এখন দেখা যায় একটা বড় সময় যাচ্ছে ভ্রমণ সংক্রান্ত বিষয় দেখাশোনায়। আমার মনে হয় ভ্রমণ বিষয়ক কাজের জন্য আলাদা দক্ষতা সম্পন্ন কর্মী নিয়োগ প্রয়োজন। এতে বেড়ানোও আরও আনন্দদায়ক হবে। অনেক সময়ই সংরক্ষণের কাজে সমস্যা তৈরি করেন বেড়াতে আসা মানুষ। সচেতনতা বৃদ্ধি করতে হবে যাতে এই ক্ষতি এড়ানো যায়। তাই আমার মনে হয় ট্যুরিজমের জন্য একটি সম্পূর্ণ পৃথক টিম থাকা দরকার এতে সংরক্ষণ ও ভ্রমণ দুইক্ষেত্রেই লাভ হবে।

আপনার প্রিয় জাতীয় উদ্যান

একটাকে বেছে নেওয়া খুব কঠিন। বন্দিপুর ও কাবিনি ঘরের কাছে, অন্যান্যদের তুলনায় অনেক বেশি গিয়েছি এই দুটোতে। খুবই প্রিয় এই দুটি জায়গাই, এছাড়াও কাণ্হাও খুবই পছন্দের জায়গা। আসলে একটা নাম বলতে পারব না, যেকোনো জঙ্গলই আমার পছন্দের।

পরিবার, বন্যপ্রাণী ও ক্রিকেট...

আমি সবসময়ই জঙ্গলে কাটানোর জন্য সময় বের করার চেষ্টা করি, আর পরিবারের সঙ্গেও জঙ্গলেই ছুটি কাটাই। আমার ছেলে মেয়েরাও জানে পরের ছুটিতে বাবা আবার কোনও একটা জঙ্গলেই নিয়ে যাবে। ওরাও জঙ্গল ও বন্যপ্রাণী ভালবাসে তাই ছুটিগুলি ওখানেই কাটাই আমরা।