দেবদূত খুঁজছেন? জেনে নিন স্বর্গীয় আদব কায়দা

0

ফেরেশতাদের মাথার ওপর নীল সাদা আলোর বলয় ঘুরপাক খায়। পিঠ থেকে আঁটা থাকে ডানা। পৃথিবীর গভীর বেদনায় আসমান থেকে নেমে আসেন। আর্তের পাশে থাকার স্বর্গীয় প্রতিশ্রুতি নিয়ে ওরা হাওয়ায় হাওয়ায় ঘুরে বেড়ান। কিন্তু স্টার্টআপ ইকোসিস্টেমে এই ফেরেশতাদের আনাগোনার একটি নির্দিষ্ট কার্যকারণ সম্পর্ক আছে। কেন ওরা আসেন, কেন উড়ে যান! রক্ত জল করা যে সব স্টার্টআপ মাথা তোলার চেষ্টা করছে তাদের কাছ থেকেই বা ঠিক কী চান এসব দেবদূত! কেন কাউকে কাউকে চোখেও দেখেন না। আবার কারও কারও লক্ষ্মীর ঝাঁপিতে উজাড় করে দেন স্বর্গীয় দান। এই বৈষম্যের, কী লীলা! ফেরেশতাদের চলাফেরার ম্যাপে কি কলকাতা আছে? 

এসব নানান প্রশ্নের স্বতঃ প্রণোদিত উত্তর দিতেই কলম ধরলেন ক্যালকাটা অ্যাঞ্জেলস নেটওয়ার্কের চিফ অপারেটিং অফিসার, সৌম্যজিত গুহ

দেবদূত বলে বটে কিন্তু আমি বলি ডেভিলস অ্যাডভোকেট। উইকিপিডিয়া বা গুগল সাহেবকে জিজ্ঞেস করুন পেয়ে যাবেন একটা উত্তর। বিশ্বাস করুন Nothing স্বর্গীয় about it... গোটাটাই একটা স্বার্থের সম্পর্ক। হ্যাঁ টাকাটা আপনার এমন সময় ওরা দেবেন যখন আপনার সেটা প্রয়োজন। এটুকুই।

অনেকের পকেটেই বাড়তি টাকা থাকে। তা বলে ঝুঁকি নিয়ে সেই টাকা দেওয়ার কলজে অনেকেরই থাকে না। অ্যাঞ্জেলদের প্রধান সম্পদ ওই কলজে। ওঁরা নিজেদের টাকা অন্যের ব্যবসায় লাগাবার ঝুঁকি নেন। বিনিময়ে নিয়ে নেন হস্তান্তরযোগ্য সম্পত্তির ভাগ বা মালিকানার অংশ।

সচরাচর কারা অ্যাঞ্জেল ইনভেস্টমেন্ট করেন, সেটা একবার দেখে নিই চলুন।

১. অধিকাংশ সময়ে দেখা যায় ব্যবসায়ী পরিবারের দ্বিতীয় কিংবা তৃতীয় প্রজন্ম দেবদূত হওয়ার জন্যে তৈরি হন। কখনও সখনও এই ক্লাবে দেখা যায় প্রথম প্রজন্মকেও। সম্পত্তি কিংবা ব্যবসা বাড়ানোর উদ্দেশ্যেই তাঁরা এই ক্লাবে আসেন। সবসময় টাকার লোভেই যে এঁরা অ্যাঞ্জেল হন তা নয়। ঝুঁকি নেওয়ার অদম্য ইচ্ছেও ওঁদের পিঠে ডানা গুঁজে দেয়। ছদ্ম উদ্যোগপতি হিসেবে কাজ করতে থাকেন ওঁরা।

২. সফল উদ্যোগপতিরাও আসেন এই ক্লাবে। একজন লড়াকু শুরুয়াতি ব্যবসায়ীর যাত্রা পথের সমস্যাগুলো এঁরাই সব থেকে বেশি উপলব্ধি করতে পারেন। সেই সহমর্মিতা থেকে নতুন স্টার্টআপে ওঁরা বিনিয়োগ করতে চান। তাঁদের অর্জিত সাফল্যের ভাগ দিয়ে নতুন স্টার্টআপের পাশে থাকেন। তাঁরা অভিজ্ঞতা ভাগ করেন নতুন উদ্যোগপতিকে সফল করার একটি দুর্দান্ত দেবদূত সুলভ ইচ্ছে থেকেই।

৩. আজকাল অ্যাঞ্জেল ইনভেস্টর হতে এগিয়ে আসছেন কর্পোরেট একজিকিউটিভরাও। মোটা বেতনের চাকরি করার সুবাদে তাঁদের কাছেও বাড়তি টাকা থাকে। ব্যাঙ্ক মিউচুয়াল ফান্ড কিংবা শেয়ার বাজারে টাকা রাখার তুলনায় অনেক বেশি থ্রিলিং কোনও শুরুয়াতি ব্যবসায় টাকা রাখা। ব্যবসায় প্রচ্ছন্ন অংশীদার হওয়া। কেউ কেউ বলবেন এটা বোধহয় নতুন ট্রেন্ড, কিন্তু ভেবে দেখুন তো, এরকম কিন্তু আগেও খুব হত। এখনও হয়। পরেও হবে। বাড়ির ছেলে যদি ব্যবসা করতে চায় তখন পরিবারের ভালো চাকুরে মামা কাকা মেসো পিসের কাছেই টাকা চেয়ে থাকে। তারা বিনিয়োগও করে পরিবারের সন্তানের মুখের দিকে চেয়ে। এখন এই গোটা গল্পের সামান্য টুইস্ট হল এঁরা পরিবারের বাইরের লোককেও টাকার থলি এগিয়ে দিচ্ছেন। তবে অবশ্যই এর পিছনে থাকছে পেশাদারি প্রত্যাশা।

প্রত্যাশার কথা বলাতে মনে পড়ল, একজন অ্যাঞ্জেল ইনভেস্টর কেন কোনও ব্যবসায় বিনিয়োগ করতে যাবেন, বলতে পারেন?

বেশি ভাববেন না... কারণ জানবেন, দুনিয়ায় একটি দারুণ প্রবাদ আছে, "টাকাই টাকা আনে।" আজ্ঞে হ্যাঁ! টাকা বাড়াতেই টাকা ঢালেন ওঁরা। এটা ভালো করে বুঝে নিন। সাফ কথা, আপনার যদি আইডিয়ায় দম থাকে, দুর্দান্ত টিম থাকে আর দৌড়োবার মুরোদ থাকে তবে ব্যবসাটা বাড়াতে অ্যাঞ্জেল ইনভেস্টর আপনাকে টাকা দেবে। ব্যবসা বাড়লে বিনিয়োগের মূল্য বাড়বে। এই আপাত অদৃশ্য বৃদ্ধিই ভবিষ্যতে নগদে বদলে যাবে। এই আশায় নগদের থলি বাড়িয়ে দেন আপাত নিষ্পাপ দেবদূত।

আপনি নিশ্চয়ই ভাবতে শুরু করে দিয়েছেন কখন পাওয়া যায় এই টাকা? এই প্রসঙ্গে একটা গল্প মনে পড়ে গেল। এক সাধুবাবা তাঁর শিষ্যদের নিয়ে ধ্যান ধ্যান খেলছেন। পাশে একটি পিকনিক পার্টি ঝাকা নাকা গান বাজিয়ে উদ্দাম নাচ করছে। রান্না হচ্ছে। আলু পেঁয়াজ ডাই করে কাটা হয়েছে। প্রচুর মশলা পাতি নিয়ে ঠাকুর গলদঘর্ম। উনুনে একের পর এক রান্না বসছে, নামছে। এবার পাঠার মাংস কষানো হচ্ছে। সাধুবাবা ঘণ্টার পর ঘণ্টা ধ্যান ধ্যান খেলা খেলেই যাচ্ছেন। সাত আটজন শিষ্য এটা সেটা জিজ্ঞেস করছেন। সাধুবাবা সবার সঙ্গে কথা বলছেন কিন্তু মন পড়ে রয়েছে দারুণ সব রান্নার গন্ধে। এক শিষ্য তাঁকে জিজ্ঞেস করলেন "বাবা সিদ্ধ হয়েছি কিভাবে বুঝব?" সাধুবাবার শুনলেন 'সিদ্ধ হয়েছে কীভাবে বুঝব?' ভাবলেন মাংস সিদ্ধ হয়েছে কিনা সেই প্রসঙ্গে প্রশ্ন বুঝি! বললেন "হাড় সে মাস যব অলাগ হো যায়েগা তব সমঝোগে কি সিদ্ধ হো গ্যায়া।" শিষ্যরা ভাবল শরীরের পতন তো মন্ত্রের সাধন। আর রান্নার ঠাকুরের জন্যে মাংস সিদ্ধ হয়েছে কিনা বোঝার টিপস। স্টার্টআপদের উচিত শিষ্যদের ভার্সনটা মেনে চলা। নিজেদের প্রয়াসের চূড়ান্ত পর্যায়ের পর একজন অ্যাঞ্জেলের সামনে গিয়ে তাঁদের দাঁড়ানো উচিত।

চাই প্রোটোটাইপ
অন্তত হাতে একটা প্রোটোটাইপ থাকা দরকার। যেটা দেখে অ্যাঞ্জেল ইনভেস্টর আপনার কাজে বিনিয়োগ করার ঝুঁকি নিতে পারবেন। আপনার আইডিয়া, সে কোনও পরিষেবাই হোক বা সামগ্রী, এটা যে কাজ করছে তার একটা প্রমাণ চাই। এবং অ্যাঞ্জেলকে বোঝাতে হবে যে সুযোগ পেলে এটা দারুণ করবে।
দরকার কাস্টমর
শুরু থেকেই কাস্টমারদের আঠার মত আটকে রাখতে পারছেন কিনা, আপনার কাস্টমারের পরিমাণ দ্রুত গতিতে বাড়ছে কিনা, আর এর ফলে সংস্থার রোজগার হচ্ছে কিনা এই সবই প্রমাণ করা দারুণ দরকারি।
দুর্দান্ত দল চাই
কোনও বিনিয়োগকারী, কোনও অ্যাঞ্জেল আপনার দারুণ আইডিয়ায় টাকা ঢালবেন না যদি না আপনার পিছনে একটি দুরন্ত দল থাকে। একার ব্যবসায় নৈব নৈব চ। সহ প্রতিষ্ঠাতা থাকাটা জরুরি। কাজের দক্ষতার সুবন্ন দরকার।
নকশা চাই
হুতোম প্যাঁচার নয়, ব্যবসা বাড়ানোর স্পষ্ট নকশা, চাই। নইলে কোনও ফেরেশতা আপনার পায়ে পা মেলাবে না। আপনার অ্যাঞ্জেলকে মনে করবেন না বুদ্ধু। সে আপনার ব্যবসায় বিনিয়োগ করার আগে নিশ্চয়ই আটঘাট সব জেনে নেবেন। আপনার কাছে যদি ব্যবসা বাড়ানোর ছক রেডি না থাকে তবে আর অনুনয় বিনয়ে কাজ নেই। তাই ভালো কথা বলছি, ব্যবসা বাড়ানোর ছক সাজান। কীভাবে এগোবেন, কি হবে টাইমলাইন, গেম প্ল্যান। সব রাখুন সেই নকশায়। ঢোকার রাস্তার পাশাপাশি ফেরেশতাকে দেখিয়ে দিন তাঁর বেরনর পথও। তবেই না টাকা পাবেন। নইলে দোরে দোরে ঘোরাই সার হবে।