মহাপ্রভুর জীবনের সব থেকে বড় ধাঁধা

3

চৈতন্য মহাপ্রভুর জীবন নিয়ে গবেষণার অন্ত নেই। অগুনতি বই পাওয়া যায় তাঁর জীবন নিয়ে। ভক্তিরসে গদ গদ লোক গাঁথা, চরিত কাব্য আর পণ্ডিতদের হেঁয়ালি মাখা আলোচনায় আড়াল হয়ে যান সাড়ে পাঁচশো বছর আগের একজন বাঙালি বিপ্লবী। যার জীবনই ছিল তার বানী। যিনি বাংলার একটি নদীমাতৃক গ্রাম থেকে মাথা তুলেছিলেন। অগণন মানুষকে উদ্বুদ্ধ করতে পেরেছিলেন। যার উত্থান দেখে তৎকালীন বহিরাগত শাসকের ঘুম উড়ে গিয়েছিল। এবং যিনি বাংলার সঙ্গে ওড়িশার রাজনৈতিক মেলবন্ধনের চেষ্টা করছিলেন। কারণ তিনি চাইছিলেন একটি শক্তির জন্ম দিতে। 

অথচ ধর্মীয়, সাম্প্রদায়িক কিছু মানুষ তাঁকে নগণ্য করে দিতে চেয়েছে দীর্ঘ কয়েকশ বছর ধরে। এই নিবন্ধে আমরা সেই পথে হাঁটব না। আমরা চৈতন্য মহাপ্রভুর জীবনের একটি গুরুত্বপূর্ণ বাস্তব ধাঁধার উত্তর খুঁজতে চাইব। চাইব জানতে কীভাবে সম্প্রদায় আর ধর্মীয় বিশ্বাস তাঁকে একা এবং নিঃসঙ্গ করে দিয়েছিল। বৈষ্ণব সাহিত্যের আকর গ্রন্থগুলি ঘাঁটলে অন্যরকম এক চরিত্রের ওপর আলোকপাত সম্ভব। অথচ সেবিষয়ে কোনও পণ্ডিতই টিকি নাড়াতে সম্মত নন। ইতিহাসের সেই দিকগুলি অনালোচিত হতে হতে আজ প্রায় মলিন। এই মালিন্যের নেপথ্যে সুচতুর রাজনীতির পচা মাছের গন্ধ পান অনেক যুক্তিবাদী ইতিহাস সচেতন মানুষ। গন্ধ পান আঁশটে রক্তে ভেজা ষড়যন্ত্রেরও। নোংরা বাজার অর্থনীতিতে একটি ব্র্যান্ডের সাম্রাজ্য বিস্তারের সুকৌশল স্ট্র্যাটেজি কীভাবে বিকশিত হয়ে থাকতে পারে তাই নিয়ে আমরা আলোচনা করব। এবং পৌঁছনর চেষ্টা করব সত্যের কাছাকাছি।

বাউলকে কহিও লোকে হইল আউল।
বাউলরে কহিও হাটে না বিকায় চাউল।
বাউলকে কহিও ইহা কহিয়াছে বাউল।।

চৈতন্য চরিতামৃতের অন্তলীলার দুর্বোধ্য এই পঙক্তিগুলিই ভাবনার স্রোতকে ঘুরিয়ে দেয় তার অভীষ্ট অভিমুখে। প্রায় সকল ভাষ্যকারেরই চোখ এড়িয়ে যাওয়া ওই তিনটি লাইন অনেক কিছু না বলেও বলে দেয় অনেক কথা। আপাত সান্ধ্য ভাষায় লেখা অদ্বৈত আচার্যের এই চিঠিটিই নিয়ে গিয়েছিলেন জগদানন্দ। পড়ে যা বোঝার বুঝে নিয়েছিলেন চৈতন্য প্রভু। এরপর কেবল চোখের জলে ভেসেছেন তিনি। দেওয়ালে মুখ ঘসে ঘসে রক্তে ভেসেছেন। বন্দি বাঘের মত দাপিয়ে বেরিয়েছেন আটফুট বাই সাড়ে পাঁচ ফুট ঘরের ভিতর। বাইরে সজাগ পাহারায় ভক্ত গোবিন্দ। ঘরের ভিতর শঙ্কর পণ্ডিত। কোথাও একটা ভুল হয়েছে। কোথায়? খুঁজছেন সেই উত্তর। আকাশে বাতাসে কষছেন সেই কঠিন অঙ্কটাই। জীবনের শেষের দিনের সেই অসহ্য যন্ত্রণার দিনগুলির গোঙানি আর কান্নায় ভেঙে পড়াকে পদকর্তারা ব্যাখ্যা করেছেন দুঁহু কোলে দুঁহু কান্দে বিচ্ছেদ ভাবিয়া।

জীবনীকার মহাজনদের রচনায় ভাবরসে আকণ্ঠ ডুবে থাকা চৈতন্যের ভিতর থেকে আরও একটি চৈতন্য প্রায়ই উঁকি মারেন। তিনি নিরুদ্দেশের পথিক নন। একটি নির্দিষ্ট চেতনার ফসল। জাতপাতের ঊর্ধ্বে উঠে নিম্নবর্গীয়দের সংঘবদ্ধ করার রাজনীতিতে মগ্ন এক নেতা। হিন্দু সুফি। 

তার প্রাথমিক লক্ষ্য খেটে খাওয়া চাষাভুষো। যারা যবনদের আক্রমণে ভয়ে শিটিয়ে ছিলেন আর টিকিধারি হিন্দু ব্রাহ্মণদের বিধানের ভয়ে ছিলেন সদা সন্ত্রস্ত তাদের পাশে দাঁড়িয়েছিলেন সহজিয়া ভঙ্গিমায়। ধর্ম ত্যাগের রাজনৈতিক এবং আর্থ সামাজিক যে পরিবেশ তৈরি হয়েছিল গোটা বাংলায় তিনি চেয়েছিলেন সেই স্রোতকে হিন্দু সহজিয়া রাজনীতি দিয়ে রুখে দিতে। তার জন্যে হিন্দু ধর্মের গোঁড়া ব্রাহ্মণদের সঙ্গেও সমান বিদ্রোহে যেতে হয়েছিল এই বিপ্লবীকে। তিনি সেই যুগে বসে সামাজিক আন্দোলন করছেন। ভাবতে হবে যখন যোগাযোগ ব্যবস্থাও এত উন্নত ছিল না তিনি পঙক্তি ভোজের কমিউনিজমকে প্রয়োগ করেছেন এই বাংলায়। জনস্রোতকে সংঘবদ্ধ করতে তাঁর একটি লোগোর প্রয়োজন ছিল। যেই লোগোকে স্পনসর করতে কেউ দ্বিধা করবেন না। সহজেই পেয়ে যেতে পারবেন সুবুদ্ধি রায়ের মত অনেক পৃষ্ঠপোষক। আর রাজনৈতিক সহযোগিতার জন্য পাশে পাবেন হিন্দু-রাজ্য কলিঙ্গকে। তাঁর এই সামাজিক ভক্তিমূলক আন্দোলনের তত্ত্বকে প্রস্থান ত্রয়ের স্বীকৃতি দেবেন দক্ষিণভারতের পণ্ডিতকুল।

তার ভাবনার এই বৃহৎ তাঁবুর নীচে জড়ো হয়েছিল অগুনতি মানুষ। মানুষ মানে কাজির সঙ্গে লড়াই করার হাতিয়ার। মানুষ মানে হোসেন শাহের সঙ্গে টক্কর নেওয়ার হিম্মত। মানুষ মানে মিলন। আর মিলন মানে পঙক্তি ভোজের অবাধ আধুনিকতা। মানুষকে মানুষের সম্মান ফিরিয়ে দেওয়ার সেই অমোঘ অস্ত্র হিসেবেই ব্যবহৃত হয়েছিল কৃষ্ণ নাম। তার এই অহিংস সেনাদলে তিলকের ইউনিফর্ম ছিল। চৌকস ঠাণ্ডা মাথার সেনাপতি থাকতেন। নিজেও সংকীর্তনের ঐকতানের নেতৃত্ব দিয়েছেন। এবং এভাবেই বাংলার নিহিত শক্তিকে জাগিয়ে তুলতে চাইছিলেন তিনি। এ পথেই অঙ্গ বঙ্গ কলিঙ্গের ঘুম ভাঙাতে চাইছিলেন। বহিরাগত নিষ্ঠুর শাসকের বিরুদ্ধে ঐক্যবদ্ধ প্রতিরোধ গড়ে তুলতে চাইছিলেন প্রেমের পথেই। অহিংস আন্দোলনের ভিতর দিয়ে। সেই ছিল ভারতীয় সাংস্কৃতিক বিপ্লবের একটা নমুনা।

তাঁর এই রাজনৈতিক আন্দোলনের প্রধান প্রাণ ছিলেন অদ্বৈত আচার্য। বৃদ্ধ অদ্বৈতকে তিনি গোটা পরিকল্পনার মস্তিষ্ক হিসেবে সম্মান করতেন। কখনও অদ্বৈতকে বাপ ডেকেছেন। কখনও তাঁর তুলনা টেনেছেন মহাদেবের সঙ্গে। ফলে তার কথার মূল্য বোঝেন। 'বাজারে না বিকায় চাউল' এই ধাঁধার অর্থও তাঁর কাছে অবোধ্য নয়।

ইষোপনিষদের শিক্ষায় শিক্ষিত নিমাই পণ্ডিত জানতেন কোনও আন্দোলনকে দীর্ঘজীবী আর সফল করতে প্রয়োজন দুটো ডানার। এক সম্ভূতি আর দুই অসম্ভূতি। একটি আবেগের ডানা আর অন্যটি বাস্তবের। একটি স্বপ্নের অন্যটি প্রয়োগের। একটি তাত্ত্বিক আর অপরটি তান্ত্রিক। দুটি ডানা না থাকলে আকাশে ওড়া অসম্ভব। তাই দলের ভিতর থেকে বেছে নিয়েছেন নেতৃত্ব। নিজেকে যদি সম্ভূতির আসনে রেখে থাকেন, অসম্ভূতির আসনটি দিয়েছেন নিত্যানন্দকে। তিনি নিজে সংসারের সমস্ত শিকড় উপড়ে সন্ন্যাস নিয়েছেন। অথচ অবধূত সন্ন্যাসী নিত্যানন্দকে বলেছেন সংসারী হতে। গদাধর পণ্ডিত, স্বরূপ দামোদরদের নিয়ে তিনি বরাবর সামলে গিয়েছেন তাত্ত্বিক জনসংযোগ। আর জনভিত্তি সামলানোর জন্যে নিত্যানন্দকে দায়িত্ব দিয়েছেন তিনি। ফলে বাজারে কী বিক্রি করতে হবে এবং কেমন করে তাও সম্যক শিখিয়ে পড়িয়ে পাঠিয়েছিলেন বাংলায়। বৃন্দাবন দাস লিখছেন, মহাপ্রভু নিত্যানন্দকে আদেশ দিয়েছিলেন,

মূর্খ নীচ পতিত দুঃখিত যত জন ।
ভক্তি দিয়া কর গিয়া সবারে মোচন।।

এই মোচন করার কাজ পেয়ে পুরী থেকে ফিরে আসেন 'একলা নিতাই'। চৈতন্য মহাপ্রভুর দেওয়া দায়িত্ব পালন করতে যেখানেই গিয়ে দাঁড়িয়েছেন সেখানেই কাতারে কাতারে মানুষ নুইয়ে পড়েছে তাঁর চরণের ধুলোয়। লুটিয়ে পড়েছে ধনীর সম্পদ। স্বাভাবিক আনুগত্য। আনুমানিক ১৫১৬ খ্রিষ্টাব্দই ছিল গোটা আন্দোলনের টার্নিং পয়েন্ট। এন্টারপ্রাইজিং নিতাই চাঁদ গোটা বাংলার বিভিন্ন প্রান্তে নিয়োগ করতে চেয়েছিলেন তার নিজস্ব সেলস এজেন্ট। প্রথম সারিতে বারোজন গোঁসাই নিয়োগ করেন। ধর্মীয় উন্মাদনা বিক্রির বিশাল এই মার্কেটিং চেনে তাদের দ্বাদশ গোপাল পদে নিয়োগ করা হয়। এই তালিকায় যারা ঠাঁই পাননি অথচ প্রভাবে প্রতিপত্তিতে এই পদের দাবি রাখেন তাদেরও হতাশ করেননি নিতাই চাঁদ। এরকম শ'খানেক উপ-গোপাল গজিয়ে ওঠেন রাতারাতি। বহরে বাড়ে সম্প্রদায়। আর কমতে থাকে মৌলিক আন্দোলনের ধার। সে খবর লোক মুখে যত পেয়েছেন চৈতন্য প্রভু ততই বিচলিত হয়েছেন। কিন্তু শেষমেশ বৃদ্ধ অদ্বৈত বাউলের পাঠানো পত্রই তাঁকে উপসংহারের বার্তা দিয়েছিল কিনা তাই নিয়ে বরং আরও আলোচনা হোক।