আরব সাগরে সাইকেল চালাতেন দ্বারকা প্রসাদ

1

বানরসেনার সেতুবন্ধনের গল্পটা সবাই জানে। বাবাজিদের জলের ওপর হাঁটার ভেলকিও অনেকেই দেখেছেন। ম্যাজিক নয়, দৈব সিদ্ধাইও নয়, আশির দশকে উত্তরপ্রদেশের মির্জাপুরের এক পানওয়ালা আরব সাগরের ওপর দিয়ে অবলীলায় হেঁটে যেতেন। সাইকেল চালাতেন। দেখে তাজ্জব বনে যেত গোটা দুনিয়া। দেশি বিদেশি মিডিয়া তাঁর প্রশংসায় পঞ্চমুখ। নাম দ্বারকা প্রসাদ চৌরাসিয়া। একজন প্রকৃত আবিষ্কর্তা আর দারুণ পারফরমার। গ্রামীণ ভারতে আজও সেতু ভেঙ্গে পড়লে বা বন্যার সময় তাঁর আবিষ্কৃত পদ্ধতি কাজে লাগিয়েই ত্রাণ পৌঁছয়।

দারিদ্র তাঁকে চতুর্থ শ্রেণীর বেশি পড়তে দেয়নি। পরিবারের পেট চালাতে কৈশোরেই সাইকেল রাখার দোকান খোলেন। উত্তরপ্রদেশের মির্জাপুরে একটি পানের দোকানও ছিল। কিন্তু প্রায়ই তাঁর মনে হত তিনি একজন কূপমণ্ডুক। গোটা দুনিয়া পড়ে আছে আর তিনি পড়ে আছেন মির্জাপুরের গলিতে। কিছুই দেখা হয়নি। ১৯৭২ সালে তাঁর চল্লিশ বছর বয়স। ঠিক করলেন গোটা দেশটা একবার সাইকেলে চেপে ঘুরবেন। পাঞ্জাবের জগধারীতে এসে যখন পৌঁছলেন তখন ভরা বর্ষা। কোমর জলে রাস্তা ডোবা। দ্বারকা আটকে গেছেন। সমস্যাই সমস্ত আবিস্কারের জন্ম দেয়। এক্ষেত্রেও তাই হল। মাথায় জ্বলে উঠল আইডিয়া বাল্ব। বানিয়ে ফেললেন একটা উভচর সাইকেল। ঘিয়ের চারটি খালি ক্যান কিনে তিন মাসের পরিশ্রমে বানিয়ে ফেললেন এমন সাইকেল যা জলে ভাসে। আর তাই দিয়েই কিস্তিমাত।

শুরু হল খেল। মাদারির খেল নয়। দ্বারকার জলেভাসা খেল। যেখানেই খেলা দেখাতেন জমে যেত হাজারো জনতার ভিড়। আরব সাগরে পাঁচ কিলোমিটার সাইকেল চালিয়েছেন। তাঁর খেল দেখতে ১৯৮০ সালে আমেদাবাদের কানকারিয়া লেকে ১০,০০০ লোকের ভিড় জমেছিল। মুম্বাই গিয়ে তিনি জুহু থেকে নারিমন পয়েন্ট অবধি সমুদ্রে সাইকেল চালিয়েছেন। গেটওয়ে অফ ইন্ডিয়া থেকে এলিফান্টা কেভ পর্যন্ত সমুদ্রের ঢেউয়ের বাম্পার সামলে সাইকেলে ১১ কিলোমিটার পারি দিয়েছেন দ্বারকা। যারা শুনেছে থ হয়ে গেছে। যারা দেখেছে তাদের তো চক্ষু ছানাবড়া।

শুধু কি সাইকেল! এমন জুতো বানালেন যা পরে মানুষ বন্যার সময় জলের ওপর হাঁটতে পারে। ক্লাসফোরের বিদ্যে নিয়ে অসাধ্য সাধন করে দেখালেন মির্জাপুরের এই পানওয়ালা। সেই সময় থার্মোকল তো আকছার পাওয়া যেত না। এক কোল্ড স্টোরেজ ম্যানেজার তাঁকে সাহায্য করেন। জুতোর আকার নিয়ে অনেক পরীক্ষা নিরীক্ষার পর শেষে তিনি ৩ ফুট লম্বা, ১০ ফুট চওড়া ও ৮ ইঞ্চি পুরু জুতো বানান। বিশেষ ডিজাইন। জুতোয় থার্মোকল ঠাসা। প্লবতার নীতি মেনে হালকা জুতোগুলো পরে ভেসে থাকা যায়। এই অদ্ভুত জুতো আবিস্কারের পর গগনচুম্বী আত্মবিশ্বাস নিয়ে দ্বারকা প্রসাদ ঠিক করেন দিল্লী যাবেন। এশিয়াডে খেল দেখাবেন। কিন্তু প্রোটোকল ভেঙে ভেতরে ঢোকার অনুমতি নেই। তাবলে কুচ পরোয়াও নেই। 

দিল্লী বোট ক্লাবে খেলা দেখাতে শুরু করে দিলেন তিনি। এশিয়াডের প্রতিযোগিতা দেখতে আসা দর্শকরা দ্বারকার খেল দেখে তো তাজ্জব। সেই অনুষ্ঠানের বিপুল সাড়া। দুর্দান্ত মিডিয়া কভারেজ। BBC সাক্ষাৎকার নেয় উত্তরপ্রদেশের প্রত্যন্ত গ্রামের এই পানওয়ালার। আর তাতেই দেশের গণ্ডি পেরিয়ে সাগরের ওপারেও দ্বারকা লেজেন্ড হয়ে ওঠেন। বিদেশে তার দেখানো স্টান্ট নকল করার হিড়িক পড়ে যায়। আজও তাঁর তৈরি জুতো বন্যা বিধ্বস্ত এলাকায় উদ্ধারকাজে ব্যবহৃত হয়।