কৃষকের ছেলে সুজনের বিশ্বজয়ের কাহিনি

3

কল্যাণীর কৃষক পরিবারের ছেলে সুজনের উত্থান রূপকথার গল্পের মতো। একেবারে শূন্য থেকে শুরু করে আকাশ ছুঁয়ে ফেলা না হলেও ওর অগ্রগতির কাহিনি শুনলে গায়ে কাঁটা দেবে। ছোটবেলা থেকেই রান্নাবান্নায় শখ। হেঁশেলেই বেশি সময় কাটত। পড়াশুনো থেকে খেলা সবই মায়ের সঙ্গে হেঁশেলেই। রান্নায় সম্বর দেওয়ার পর যে ঝাঁঝ ওঠে সেটা ওর দারুন লাগত। আর প্যাশনের সেই ঝাঁঝই নদিয়ার সুজন সরকারকে বিশ্বের সেরা শেফ বানিয়েছে। 

‘রুহ’—উর্দুতে যার মানে আত্মা। সাত সমুদ্দুর তেরো নদীর পারে ‘আত্মা’র আস্বাদনের টানে ভিড় জমান খাদ্য রসিকেরা। আধুনিক ভারতীয় কুইজিন সান ফ্রান্সিসকোর এই রেস্তোরাঁর ইউএসপি। যার হাত যশে বিদেশ বিভুঁইয়ে ‘রুহ’র এত জনপ্রিয়তা তিনি হলেন এই বাঙালি শেফ। রান্নাবান্নায় মন না দিলে সুজন নির্ঘাৎ শিল্পী হতেন। কারণ রন্ধন শিল্পেই ছবি আঁকেন তরুণ বাঙালি এই উদ্যোগপতি।

কল্যাণীতে কৃষক পরিবারে জন্ম। বেড়ে ওঠা। উচ্চাকাঙ্খা ছিল ছোটবেলা থেকেই। রান্নায় এক্সপেরিমেন্ট করার মধ্যে সৃজনশীলতা খুঁজে পেতেন। ফলে ওর জন্যে হোটেল ম্যানেজমেন্টটাই বিধির লিখন ছিল। আর এগনোর গ্রাফটা ঠিক এরকম...২০০৩ এ হোটেল ম্যানেজমেন্টে ডিগ্রি, দিল্লি, মুম্বাইয়ের সেরা রেস্তোরাঁয় কাজ। তারপর সেখান থেকে বিলেতে পাড়ি। শেফ ক্রিসগ্যালভিন, শেফ এন্ড্রু গ্যারেটের মতো বিখ্যাত শেফদের তত্বাবধানে কাজ শিখেছেন, হাত পাকিয়েছেন। ২৭ বছর বয়সে লন্ডনে একটি নামজাদা রেস্তোরাঁয় হেড শেফ হন। অটোম্যাট এবং আলমাডার মতো মধ্য লন্ডনের দুটি বিখ্যাত রেস্তোরাঁ একার দাপটে চালিয়েছেন। শেষপর্যন্ত এই বছর ফেব্রুয়ারিতে সান ফ্রান্সিসকোয় রেস্তোরাঁ ‘রুহ’র পথচলা শুরু, যার অন্যতম কর্ণধার সুজন। সহ উদ্যোক্তা বিক্রম এবং অনু ভামরি।

মাত্র ৬ মাসে খাদ্য রসিকদের কাছে জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে ‘রুহ’। নজরকাড়া ইন্টিরিয়রের ফাঁকে দিনভর ব্যস্ততা চোখে পড়বেই।যেটা এক্কেবারে অন্যদের থেকে আলাদা সেটা হল আয়ুর্বেদিক ককটেল বার। ড্রিংসের নাম শুনুন, চায় পাঞ্চ। কী আছে এর মধ্যে? আঙুরের রস,আসাম টি আর স্পাইস ব্লেন্ড। পাওয়া যাবে পিঙ্কসিটি। এতে থাকবে প্ল্যানটেশন রাম, পেয়ারা, ইন্ডিয়ান চিলি, রুহ মসালা। ‘রুহ’ তৈরি করতে এগারো মাস সময় লেগেছে।  রেস্তোরাঁর ডিজাইনিং থেকে মেনু, কেমন হবে খাবার সব কিছু প্ল্যান করেছেন সুজন। নিজের ব্যবসায় নামার গল্প শোনাচ্ছিলেন। ২০১১ থেকে ভারতীয় ডিশগুলিকে কীভাবে আধুনিক রূপ দেওয়া যায় তাই নিয়ে কাজ করতে শুরু করেন। তখনই দিল্লির বিখ্যাত শেফ এডি সিংয়ের সঙ্গে যোগাযোগ হয়। তিনি ভারত ফিরে যাওয়ার প্রস্তাব দেন। রাজি হয়ে যান সুজন। কারণ লন্ডনে বসে ভারতীয় ডিশ নিয়ে এক্সপেরিমেন্ট সেভাবে সফল হচ্ছিল না, চলার পথে নানা ওঠা পড়ার গল্প বলছিলেন সুজন।

দেশে ফিরে দিল্লির অলিভ বার অ্যান্ড কিচেনের মেনু পুরো পাল্টে দেন। একদিন সুযোগ আসে দুবাইতে ‘ট্রেসইন্ড’ নামের রেস্তোরাঁ খোলার। দুর্ভাগ্যের বিষয়, উদ্যোক্তাদের মূলধনে টান পড়ায় বন্ধ করে দিতে হয় সেটি। ফিরে এসে এডি সিংয়ের সঙ্গে ‘এক বার’ খোলেন। ভালো সাড়া পান। ভারতীয় পদে ওর এক্সপেরিমেন্ট জারি থাকে। ধীরে ধীরে আত্মবিশ্বাস তৈরি হয়, বুঝতে পারেন বিদেশিদের জন্য খাবার তৈরি করতে সিদ্ধহস্ত হয়ে উঠেছেন। ‘রুহ’ ভাবনা তখন থেকেই শুরু। বাকি পার্টনাররা চেয়েছিলেন পালো অল্টোতে রেস্তোরাঁ খুলতে। কিন্তু সুজন সবসময় চাইছিলেন প্রথম রেস্তোরাঁ হবে ডাউনটাউনে, হেসে বললেন সুজন।

‘রুহ’তে পাওয়া যাবে অধুনিক ভারতীয় পদ। যার মধ্যে সহযোগী হিসেবে পাওয়া যাবে উত্তর ক্যালিফোর্নিয়ার নানা উপকরণ, সচরাচর ভারতীয় স্বাদ এবং আধুনিক রান্নার পদ্ধতি। প্রাচ্য এবং পাশ্চাত্যকে মিলিয়ে দেওয়াই আসল লক্ষ্য, বলছিলেন সুজন। ‘রুহ’র মেনুতে দক্ষিনী খাবারের পদও মিলবে।

সবে তো শুরু হল ব্যবসার পথ চলা। এবার বিশ্বের নানা দেশে একের পর এক রেস্তোরাঁ খুলতে চান এটাই ওর স্কেলআপ মডেল। প্রথম লক্ষ্য মার্কিন মুলুক। সেপ্টেম্বরে ম্যানহ্যাটনে প্রথম ভারতীয় গ্যাস্ট্রোবার খুলছেন। অক্টোবরে নিউইয়র্কে আরেকটি। আপাতত ট্রাম্পের দেশে নিত্য নতুন ভেঞ্চারে ব্যস্ত নদিয়ার তরুণ এই উদ্যোগপতি। বারগুলি শুধু বিকেলেই খোলা হবে। ভারতীয় ককটেলের বিশাল সম্ভার থাকবে। আর থাকবে ভারতীয় আপ্যায়নের আন্তরিকতাও।

Related Stories