স্বল্প সোনা, গয়না গর্জাস : অরবিন্দর অলঙ্কার

মাত্র উনচল্লিশো টাকায় সোনার চেন। কিছুদিন আগেও কলকাতার এক প্রথম সারির অলঙ্কার সংস্থার এই সস্তার সোনার হার হইচই ফেলেছিল। এক গ্রামের একটু বেশি ওজনে কী করে হার বানানো যায় এই নিয়ে ক্রেতাদের আলোচনার শেষ নেই। এই চর্চার ভিড়ের বাইরে থেকে শহর থেকে কিছুটা দূরে এক স্বর্ণশিল্পী যা করেছেন তা ঈর্ষায় ফেলতে পারে অনেককেই। মাত্র ৬০০ মিলিগ্রাম বা আধ গ্রামের সোনা। তা দিয়েই ১৮ ইঞ্চির সোনার চেন তৈরি করে ফেলেছেন অরবিন্দ রায়। ইন্ডিয়ান বুক অব রেকর্ডে জায়গা পেয়েছেন। এবার তাঁর লক্ষ্য ৪৫০ মিলিগ্রাম সোনা দিয়ে একই রকম হার বানানো।

0

শ্যাকড়ার ঠুকঠুক, কামারের এক ঘা। এই ঠুকঠুক করতে করতেই একদিন অচেনা পথের খোঁজ পেয়েছিলেন অরবিন্দ রায়। একটি সোনার হারের অর্ডার পেয়েছিলেন উত্তর চব্বিশ পরগনার বামনগাছির এই বাসিন্দা। হার তৈরির আগে স্বর্ণশিল্পীদের ভাষায় তার বানাতে হয়। সেই তার করতে গিয়ে ভুল হয়ে গিয়েছিল শিল্পীর। তারটা একটু সরু হয়ে যাওয়ায় হারটাও সরু হয়ে যায়। এই নিয়ে অরবিন্দ মনমরা হয়ে পড়েছিলেন। কিন্তু অন্যদের কথায় বুঝতে পারেন, একটা ভুল তাকে কত বড় উচ্চতায় পৌঁছে দিয়েছে। মাত্র পৌনে দু আনায় বেবি চেন তৈরি করেছিলেন অরবিন্দ। তাঁর তৈরি হার এত সরু ছিল যে প্রথমে অনেক স্বর্ণশিল্পী বিশ্বাস করতে পারেননি খালি হাতে এমন কিছু যে হতে পারে। বছর দশেক আগের এই ঘটনার পর পিছনে তাকাননি অরবিন্দ। ঠিক করে ফেলেন আরও আরও অল্প সোনায় কাজ করতে হবে। অজানাকে পাওয়ার লক্ষ্য মনের ভিতর এক‌টা জেদ চেপে যায়।

বাবা নিরাপদ রায় সোনার কারিগর ছিলেন। ছোট থেকে বাবাকে দেখেছিলেন কাজের প্রতি কত নিষ্ঠা। অন্য ভাইরাও এই পেশায়। তাই সোনার কাজ খুব চেনাই ছিল অরবিন্দের। চেনা পথ ধরে আরও কীভাবে দ্রুত উত্তরণের সরণিতে পৌঁছানো যায় তা ছোট্ট হার বানিয়ে বুঝতে পেরেছিলেন অরবিন্দ। আরও কিছু করার তাগিদে চলতে থাকে পরীক্ষা-নিরীক্ষা। সেই উদ্ভাবনী ক্ষমতায় এক সময় মাত্র ৬০০ মিলিগ্রাম সোনা বা অর্ধেক গ্রামের মধ্যেই একটি সোনার চেন বানিয়ে ফেলেন অরবিন্দ। যার দৈর্ঘ্য ১৮ ইঞ্চি। অতি সামান্য সোনায় এত লম্বা হার। কোনও যন্ত্র নয়, খালি চোখেই এই অসাধ্যসাধন। সোনার হারের এই ক্ষুদ্রতম সংস্করণ পৌঁছে গিয়েছে গোটা দেশে। ইন্ডিয়ান বুক অব রেকর্ডে দেশের ক্ষুদ্র স্বর্ণশিল্পীর মর্যাদা পেয়েছেন বামনগাছির সন্তান। এমন কীর্তিতে থেমে থাকা নয়, আরও কেরামতি দেখানোর জন্য তৈরি হচ্ছেন অরবিন্দ। এবার মাত্র ৪৫০ মিলিগ্রাম সোনায় ১৮ ইঞ্চি হার বানাতে চান। রূপকথার মতো শোনালেও এই সৃষ্টি সম্ভব হলে অরবিন্দর হাতযশ জায়গা পাবে গোল্ডেন বুক অব ওয়ার্ল্ড রেকর্ডে।

দেশের সব থেকে বড় সোনার বাজার মুম্বইয়ের জাভেরিতে। জাভেরির অধিকাংশ স্বর্ণশিল্পী এই বঙ্গের। যখন ভাল কাজ ও মজুরির টানে এরাজ্য মুম্বই যাওয়ার প্রবণতা, সেই অবস্থায় স্রোতের উল্টোদিকে হাঁটা শুরু করেছেন অরবিন্দ। তাঁর কথায়, ‘‘এখন নতুন কোনও কারিগর তৈরি হচ্ছে না। এভাবে যদি অন্যরা এগিয়ে আসে তাহলে আমরা অনেক কিছুই করতে পারি।’’ অরবিন্দ মনে করেন এখনও কারও কারও ধারণা যন্ত্রের সঙ্গে হাতে বানানো সোনার অলঙ্কার তেমন পাল্লা দিতে পারবে না। সেই ভয় বা জড়তা কাটাতে অন্যদের বোঝাতে বড় ভূমিকা নিয়েছেন তিনি। বাংলার শিল্পীদের কদর সর্বত্র। তাদের দিয়েই অনেক কিছু হবে এই বিশ্বাসটা তৈরির কাজটা নিজের মতো করছেন অরবিন্দ।

দুনিয়ার সবথেকে বেশি সোনা কেনা ভারত। বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম বাজারও এদেশে। এত সমৃদ্ধি এবং সম্ভাবনার যেটা জায়গা তাকে কেন আমরা ব্যবহার করব না। বলছেন এই বঙ্গসন্তান। বাঙালিরা চেষ্টা করলে যে অনেক কিছু করতে পারে তা মফস্বলের একটি শহর থেকে দেখিয়েছেন তিনি। এই স্বপ্ন অন্যদের মধ্যে উস্কে দিতে নিজের হাতই হয়ে উঠেছে অরবিন্দের মাধ্যম।