সোনার ধানে গয়না গড়ান জয়নগরের প্রদীপকাকা

0

ছোট খেকেই চোখের সামনে দেখেছেন সবুজ খেত। অগ্রহায়ণের শুরুতে জমির চরিত্রবদল হয়ে পাকা ধানের সোনালি রংও নজর এড়ায়নি। তবুও নাগালে থাকা শস্যের সঙ্গে বন্ধুত্ব করতে লেগে গেল পঁয়ত্রিশটা বছর। একবার তারাপীঠে গিয়ে বিগ্রহের ধানের মুকুটের সাজ মনে ধরে যায়। সৃষ্টির স্রোতে গা ভাসিয়ে দেওয়ার সেই শুরু। চলতে থাকে পরীক্ষা-নিরীক্ষা। এখন ধান নিয়ে নানারকম অলঙ্কার বানিয়ে অন্যরকম পথের খোঁজ পেয়েছেন জয়নগরের প্রদীপ পুরকাইত। অসম, কর্নাটক, কেরলে তাঁর সৃষ্টি তুলে ধরে বুঝেছেন ভুল রাস্তা ধরেননি। তাই ধানের ওপর কারুকাজে শিল্পী এতটাই মজেছেন যে ‘নিশ্চিন্তের’ কাপড়ের ব্যবসাতেও আর তেমন সময় দিতে পারেন না।

ছিলেন প্রতিষ্ঠিত ব্যবসায়ী। হয়ে গেলেন শিল্পী। তাও আবার এমন জনপদ থেকে যেখানে ধানই প্রধান ফসল। এলাকার আরও একটা পরিচয় আছে তা হল মোয়ার পীঠস্থান। জয়নগরের মজিলপুরের কয়ালপাড়ার সন্তান প্রদীপ পুরকাইতের ব্যবসায়ী হওয়ার ইচ্ছেটা বহু পুরনো। ছেলেবেলা থেকেই। পেটের টানে যৌবনে মার্কেটিং-এর কাজ করলেও নিজে স্বাধীনভাবে কাজের স্বপ্নটা স্বযত্নে মনের মধ্যে আগলে রেখেছিলেন তিনি। নতুন কিছু করার ভাবনা থেকে শাড়ির বর্ডারের কাজ শুরু হয় তাঁর। বড়বাজারে গিয়ে ভাল অর্ডারও পেয়ে যান প্রদীপবাবু। শাড়ির কাজের পাশাপাশি ব্লাউজের ওপরও নানারকম কাজ চলতে থাকে। প্রায় ৩০০ জন তাঁর কাছে কাজ করতেন। ছন্দে থাকা জীবন আচমকা অন্য পথ ধরল ২০১২ সালে। ব্যবসার ফাঁকে সেই সময় প্রদীপ পুরকাইত বীরভূমের তারাপীঠে গিয়েছিলেন। তখন সবে শীত পড়তে শুরু করেছে। ধান ওঠার মরসুম। এমনই এক মুহূর্তে মন্দিরে পুজো দিতে গিয়ে তাঁর চোখ টেনে নিয়েছিল মূর্তির সাজ। মা তারার মুকুটের সম্পূর্ণটাই ছিল ধানের। এর আগে বিগ্রহকে ফুল বা অলঙ্কারের সাজে দেখলেও নতুন রূপ দেখে সন্ধানী মনের কৌতুহল বেড়ে যায়। এই কাজ নিজে করলে কেমন হয় সেই ভাবনা শুরু হয় তাঁর মনে।

এরপর জয়নগরের মজিলপুরের বাড়িতে কাপড়ের ব্যবসার পাশাপাশি পছন্দসই ধান এনে ধানের ওপর চলতে থাকে নানারকম কারুকাজ। দেবীমূর্তির সাজের মতো করে ধান ও ধানের বীজ দিয়ে মহিলাদের অলঙ্কার বানাতে থাকেন প্রদীপ পুরকাইত। প্রথমে একটু ধন্ধ থাকলেও তৈরির পর দেখলেন মাটির স্বাদ কাকে বলে। শিল্পীর কথায়, ‘‘ধানের গয়নায় মেয়েদের দিয়ে দেখি তাদের মধ্যে লক্ষ্মীশ্রী ভাব এসেছে। এমন রূপ উত্সাহ জোগায়।’’ এরপর বেলুড় মঠে এক অনুষ্ঠানে ধান ও ধানের বীজ দিয়ে তৈরি এইসব অলঙ্কার নিয়ে গিয়ে দারুণ সাড়া পান তিনি। মহিলাদের এই আগ্রহের ভরসায় শিল্পী অসমে যান। প্রদীপবাবু বলছেন, ‘‘ওখানে দাম নিয়ে দরাদরি নয়, মেয়েরা অন্যরকমের সাজের খোঁজ পেয়ে রীতিমতো খুশি।’’ পূবের রসদ নিয়ে দক্ষিণের দিকে নজর দেন তিনি। কর্নাটক, কেরল, অন্ধ্র প্রদেশের বিভিন্ন প্রদর্শনীতে গিয়ে বুঝতে পারেন নতুন ভাবনার হদিশ থাকলে ক্রেতার অভাব হয় না। ভিনরাজ্যে সাম্রাজ্য বাড়ানোর পাশাপাশি রাজ্যের বিভিন্ন হস্তশিল্প মেলা ও প্রদর্শনীতেও তাঁর হাতযশের স্বাদ পেয়েছেন অনেকে। উত্তরণের পথ মসৃণ হলেও অলঙ্কার তৈরির পিছনে রয়েছে অনেক নিষ্ঠার কথা।

পছন্দের ধানের খোঁজে কলকাতার একাধিক বাজারে ঘোরেন প্রদীপবাবু। মূলত অন্ধ্র প্রদেশ থাকা একরকম ধানই তাঁর সাফল্যের নেপথ্যে। এই ধান বেশ লম্বা ও গাঢ় সোনালি রং-এর। ধানের বেশ কিছু প্রক্রিয়াকরণের পর গয়না তৈরি হয়। ধান ও ধান বীজের এই অলঙ্কার আরও কীভাবে আধুনিক ও উন্নত করা যায় তার জন্য একাধিক ডিজাইনারের সঙ্গে শিল্পী কথা বলেছেন। বিদেশে পাঠানোর ব্যাপারে রেজিস্ট্রেশনও করিয়েছেন। শিল্পীর কথায়, ‘‘পরিবারকে সবসময় পাশে পেয়েছি। তারাও আমাকে সঙ্গ দেয়। আমার কাজ আরও অনেকের কাছে পৌঁছে দিতে চাই।’’ সেই স্বপ্ন পূরণে পঞ্চাশ পেরনো মানুষটি মনে করেন পথ এখনও অনেক বাকি।