কচুরিপানাই এখন কোলসুরের ‘লক্ষ্মী’

লোকগীতিতে আছে থাকিলে ডোবা খানা, হবে কচুরিপানা... কিন্তু এই কচুরিপানা যে জলে ভাসমান স্বয়ং কমলে কামিনি তা আর কজন জানেন! টের পেয়েছে মসলন্দপুরের কোলসুর। 

0

কচুরিপানাকে যদি অনাহুত বলা হয় খুব কি ভুল হবে! নিতান্তই অনাদরে ঝাড়ের বংশে বেড়ে ওঠে জলে। পানাপুকুরের জল মুখে দেওয়া তো দূর, দুর্গন্ধে পাশে দাঁড়ানোই দায়। মাছ ধরারও উপায় নেই। এহেন ‘লক্ষ্মীছাড়া’ পানাই নাকি এখন কোলসুর গ্রামের লক্ষ্মী! আরও একটু খোলসা করলে বলতে হয়, গ্রামের মহিলাদের আর্থিক সংস্থান। কীভাবে? চলুন শোনা যাক সেই গল্প।

উত্তর ২৪ পরগনার মসলন্দপুরের কাছে কোলসুর গ্রামে কচুরিপানার জন্যেই একটা সময় রীতিমতো দুর্নাম ছিল। লোকে বলত বড্ড বেশিরকমের কচুরিপানা হয় এখানকার পুকুর, জলাশয়গুলিতে। গ্রামেরই একটি এনজিও স্বনির্ভর, ভাবতে শুরু করে কীভাবে এই আবর্জনাকে সম্পদে পরিনত করা যায়। কচুরিপানা থেকে জৈব সার তৈরি করা শুরু হয়। অন্যদিকে কলকাতার এক তরুণ বিক্রম মিত্রের মাথায় সেই সময় প্রায় গেঁথে বসেছিল অভিনব এক প্রজেক্ট। কচুরিপানা থেকে ঘর সাজানোর নানা জিনিসপত্র তৈরির ভাবনাচিন্তা করছিলেন তিনি। সময়টা ২০১১ নাগাদ। এনজিও স্বনির্ভরের সঙ্গে যোগাযোগ হয় তাঁর। তাদের অনুরোধেই NABARD-এর রুরাল ইনোভেশন ফান্ডের সহায়তায় প্রজেক্ট শুরু হয়। গ্রামের মহিলারা যাঁরা একসময় বিড়ি বাঁধার কাজ করতেন, তাঁরাই এখন ব্যস্ত কচুরিপানা দিয়ে নিত্যনতুন নকশা ফুটিয়ে তুলতে। আগাছা দিয়ে পরিবেশবান্ধব এইসব শৌখিন সামগ্রী তৈরি করছে আর্থ ক্রাফট নামের সংস্থা। NABARD-এর সাহায্যে চলা আর্থ ক্রাফটের কর্ণধার বিক্রম মিত্র জানালেন কীভাবে চলছে গোটা প্রক্রিয়া। 

কীভাবে তৈরি হচ্ছে এসব জিনিস

কচুরিপানাকে জল থেকে তোলার পর প্রথমে তার কাণ্ডের অংশটিকে কেটে নেওয়া হয়। তারপর সেটিকে শুকোতে দেওয়ার পর নির্দিষ্ট সময়ে ওই কাটা কাণ্ডকে আবার একটু জলে ভিজিয়ে নেওয়া হয়। এরপর প্রতিটি কাটা কাণ্ডকে ধরে ধরে চিড়ে তার ভেতরের সাদা মতো অংশটি বের করে দেওয়া হয়। তারপর কাণ্ডের কাটা অংশগুলিকে ব্রাউনপেপারের উপর সাজিয়ে বাড়তি অংশ কেটে ফেলে দিয়ে পেপারের আকার দেওয়া হয়। এরপর মেশিনের সাহায্যে মসৃণ করে পেপারের আকার নিয়ে নেওয়ার পর সেগুলি বিভিন্ন ডাইসে ফেলে কখনও পেনদানি তো কখনও রাইটিংপ্যাড বানানো হয়। ড্রয়িং থেকে স্টাডিরুমে, হরেক কিসিমের জিনিসে বাড়ছে ঘরের শোভা। চোখ টানছে সকলেরই। শৌখিনদের কাছে পাচ্ছে সমাদর।

উত্তর ২৪ পরগনার মসলন্দপুরের কাছে কোলসুর গ্রামের ১৫ জন মেয়ে এই মুহূর্তে এই কাজের সঙ্গে যুক্ত। বিক্রম মিত্র জানান, ‘ওই জায়গার পুকুরে কচুরিপানা খুব বেশি হয়। তার মধ্যে গ্রামবাসীদের অনেকেই মৎস্যজীবী। কচুরিপানায় ভরা জলাশয়ে মাছ ধরা প্রায় অসম্ভব। ক্ষতি হচ্ছিল নানাভাবে। তাই প্রাথমিকভাবে কোলসুর গ্রামকে এই প্রোজেক্টের জন্য চিহ্নিত করা হয়’।

১৫ বছর ধরে হস্তশিল্পের সঙ্গে যুক্ত বিক্রম। কাজ করেন গ্রামের হস্তশিল্পীদের নিয়ে। নিজে হাতে প্রশিক্ষণ দেন তিনি। সেইসব হস্তশিল্প সামগ্রী নিয়ে বহু প্রদর্শনীরও আয়োজন করেছেন । ইতিমধ্যেই কচুরিপানা নিয়ে এই প্রকল্পে মোট ৫ লাখ টাকা অনুদান মিলেছে NABARD থেকে। সম্প্রতি মিলন মেলায় হস্তশিল্পীদের মেলায় কচুরিপানা নিয়ে তৈরি সামগ্রীর পসরা সাজিয়ে বসা হয়। গ্রামের মেয়েদের তৈরি সেসব জিনিসের ভালোই সাড়া মেলে মানুষের কাছ থেকে। সম্প্রতি বিশ্ববাংলার সঙ্গেও জুড়েছে বিক্রমের আর্থ ক্রাফট।

Related Story

*** কচুরিপানায় ফুটল পুষ্পির সাফল্য
অসমের পুষ্পি ব্রহ্ম সকলকে তাক লাগিয়ে দিয়েছেন। কচুরিপানার স্ট্র শুকিয়ে ব্যাগ মাদুর পাটি বানিয়ে কোঁকড়াঝাড়কে রীতিমত স্বাবলম্বী করে তুলেছেন।