সৃষ্টির মধ্য দিয়েই নিজেকে খুঁজে পান অদিতি

0

বাতাসে আগমনীর সুর। বাঙালির সবচেয়ে বড় পার্বণ দোরগোড়ায়। আর দুর্গাপুজোর ঢাকে কাঠি পড়ার আগে শিল্পী, পুজোমণ্ডপ, উদ্যোক্তাদের ব্যস্ততা তুঙ্গে। সমান ব্যস্ত অদিতি চক্রবর্তীও। তাঁর কাঁধে এবছর কলকাতার দুটি বড় পুজোকে সাজিয়ে তোলার দায়িত্ব। দিন রাত এক করে তাই তুলির টানে শেষ ছোঁয়া দিতে ব্যস্ত অদিতি। বছর আটত্রিশের এই বঙ্গতনয়া একাধারে চিত্রশিল্পী,ক্লে-আর্টিস্ট এবং জুয়েলারি ডিজাইনার। তবে এইসব পরিচয়ের পিছনে রয়েছেন অন্য এক অদিতি। তিনি একজন স্পেশাল চাইল্ডের মা। বিশ্বসংসারের নাট্যমঞ্চে প্রতিটি ভূমিকায় সমানভাবে সাবলীল অদিতি চক্রবর্তী।

এক বন্ধু মারফৎ খবর পেয়ে ফোন করলাম অদিতিকে। পুজোর কাজের হাজারো ব্যস্ততার মাঝেও সময় দিতে রাজি হলেন। এবছর দুর্গাপুজোয় সন্তোষপুর লেকপল্লি এবং ওয়েলিংটন নাগরিক কল্যাণ সমিতির শিল্পী অদিতি চক্রবর্তী। কথা হল লেকপল্লিতেই দেখা হবে। নির্ধারিত সময়ে সেখানে পৌঁছে বুঝলাম, আর যাই হোক পুজোমণ্ডপে কথা বলা অসম্ভব। চূড়ান্ত ব্যস্ততার মাঝে অদিতিকে একপ্রকার হাইজ্যাক করেই নিয়ে গেলাম লেকের ধারে। প্রথম সুযোগেই জানতে চাইলাম এত চাপ সামলাচ্ছেন কী করে? হাসিমুখে উত্তর এল, 'শুধু কী এটা? আরও একটা পুজো আছে। নিজের জুয়েলারির ইউনিটের কাজ আছে। স্বামী বাইরে তাই বাড়িতে ছেলেকেও অনেকটা সময় দিতে হয়। তবে হয়ে যাচ্ছে। ম্যানেজ করে নিচ্ছি।' পশ্চিমবঙ্গে, বিশেষত কলকাতায় দুর্গাপুজো এখন একটা ইন্ডাস্ট্রি। এমন অনেক মানুষ রয়েছেন যাঁরা সারা বছর শুধু এই সময়টার জন্য অপেক্ষা করেন। পুরো বছরের ভাবনাচিন্তা, পরিকল্পনা উজাড় করে দেন এই কয়েক মাসের কাজে। তবে অন্যান্য অনেক ক্ষেত্রের মতো এখানেও পুরুষদের বিশেষত পুরুষ শিল্পীদের রমরমা। এরই মধ্যে নিজের আলাদা জায়গা তৈরী করতে পেরেছেন অদিতি চক্রবর্তী। গত কয়েক বছর ধরে লাগাতার তিনি অন্তত দুটি করে পুজোর শিল্পী হিসেবে কাজ করছেন। কী করে এই জায়গায় পৌঁছলেন অদিতি? জানতে হলে ফিরে যেতে হবে তীঁর অতীতে।

গ্যাংটকে জন্ম অদিতির। তিন বছর বয়সে তাঁদের পরিবার চলে আসে কাটোয়ায়। বাড়িতে নাচ, গান, আবৃত্তির পরিবেশ ছিল। অদিতি নিজেও নাচ করতেন। ছবিও আঁকতেন। বাবার বদলির চাকরি কয়েকববছর পর তাঁকে নিয়ে আসে চন্দননগরে। সেখানে বছর দুয়েক স্থানীয় এক শিক্ষকের কাছে আঁকা শেখেন। তারপর পড়াশুনোর চাপে আর সেভাবে এগনো হয়নি। তবে খেয়ালবশে মাঝেমধ্যে নিজের মতো করেই ছবি আঁকতেন। ছাত্রী হিসেবে বেশ সুনাম ছিল তাঁর। স্কুল শেষ করে বটানিতে স্নাতক হন। তারপর বিদ্যাসাগর বিশ্ববিদ্যালয় থেকে এমএসসি। আর্ট কলেজে পড়তে যাওয়ার ইচ্ছে থাকলেও পরিবারের বাধায় তা সম্ভব হয়নি। ২০০৫ সালে বিয়ে হয়অদিতির। তারপর ভেবেছিলেন কোনও স্কুলে শিক্ষকতা করবেন। তবে বছর ঘুরতে না ঘুরতেই তাঁর জীবনের মোড় ঘুরে যায়। অদিতি সেই সময় কনসিভ করেছিলেন। গর্ভে ছছিল দুই সন্তান। পৃথিবীর আলো দেখার আগেই মৃত্যু হয় একজনের। আর এক সন্তান জন্ম থেকেই অসুস্থ। ২৯ দিন তাকে ভেন্টিলেশনে রাখতে হয়। চিকিৎসকেরা জানান, সেরিব্রাল পলসিতে আক্রান্ত তাঁর সন্তান। এতদিন ধরে দেখে আসা সব স্বপ্ন মুহূর্তেই চুরমার হয়ে যায়। মানসিকভাবে ভেঙে পড়েছিলেন অদিতি। চন্দননগর থেকে প্রতিমাসে ছেলেকে কলকাতা নিয়ে এসে চিকিৎসা করানোর ধকল নিতে পারেনি তাঁর শরীর। অসুস্থ হয়ে পড়ছিলেন। বাবা, মা পাশে দাঁড়ালেও তাঁর এবং তাঁর স্বামীর থেকে মুখ ফিরিয়ে নেন অদিতির শ্বশুরবাড়ির সকলে। অবশেষে ছেলের চিকিৎসার জন্যই ২০০৭ সালে স্বামীর সঙ্গে পাকাপাকিভাবে কলকাতা চলে আসেন অদিতি। কাজের সূত্রে অনেক সময়ই স্বামী বাইরে থাকতেন।একা হাতে ছেলেকে সামলাতে হতো। নিজের অবসাদ কাটাতে ছোট্টবেলার সেই রং, তুলিকেই ফের কাছে টেনে নেন অদিতি। ক্লে দিয়ে বানাতে থাকেন নানারকম ডিজাইন।

এরপরই শুরু হয় অদিতি চক্রবর্তীর জীবনের এক নতুন অধ্যায়। ক্রিয়েটিভ টিচার হিসেবে পিডিলাইটে কাজ করতে শুরু করেন তিনি। বিভিন্ন ওয়ার্কশপ করতে শুরু করেন। ওই সংস্থারই আয়োজিত একটি প্রতিযোগীতায় ক্রাফ্টওয়ার্কে গোটা দেশের মধ্যে সেরা নির্বাচিত হন অদিতি। সেই প্রথম তিনি উপলব্ধি করেন, চার দেওয়ালের গণ্ডির মধ্যে তিনি এতদিন যে সৃষ্টিকে আবদ্ধ করে রেখেছিলেন তার ব্যাপ্তি আসলে কতটা। ওই সংস্থায় কাজের পাশাপাশি এবার অদিতি নিজের মতো করেও কাজ করতে শুরু করেন। ছোটবেলায় যে স্কুলে তিনি নাচ শিখতেন সেখানকার শিক্ষিকা এবং ছাত্রীদের জন্য ওড়িশি নাচে ব্যবহৃত মাটির গয়না তৈরি করতে শুরু করেন। ছোটখাটোঅর্ডারও আসত। এভাবেই আরও একটি বড় সুযোগ পেয়ে যান। কলকাতায় সফররত বায়ার্ন মিউনিখ দলের জন্য মাটির দুর্গামূর্তি তৈরির অর্ডার পান অদিতি। সেই কাজও সাফল্যের সঙ্গে করে দেখান। ধীরে ধীরে শিল্পী হিসেবে তাঁর পরিচিতি বাড়ছিল। দীর্ঘদিন চন্দননগরে থাকার সুবাদে ২০১০ সালে ভদ্রেশ্বরের একটি জগদ্ধাত্রী পুজোর কাজের সুযোগ পেয়ে যান অদিতি। তারপর আর ফিরে তাকাতে হয়নি। পরপর প্রতিবছর জগদ্ধাত্রী পুজো এবং দুর্গাপুজোর জন্য ডাক আসতে থাকে। দু'ধরণের পুজো করেই মণ্ডপসজ্জা এবং প্রতিমার জন্য বেশ কিছু পুরস্কারও পান তিনি। 

শেষ তুলির টান দিতে ব্যস্ত অদিতি
শেষ তুলির টান দিতে ব্যস্ত অদিতি

পাশাপাশি জুয়েলারি ডিজাইনিংয়ের কাজও বাড়তে থাকে। ২০১৪য় নিজের বাড়ির কাছেই একটি ম্যানুফ্যাকচারিং ইউনিট তৈরি করেন অদিতি। গত বছর ডিসেম্বর মাসে প্রথমবার বাজারে বিক্রির জন্য তৈরী হয় Aditi's Jewellery। ঢাকুরিয়া দক্ষিণাপণের কারিগর লাইন থেকে বিক্রি হয় এই ক্লে দিয়ে তৈরী এই ফ্যাশন জুয়েলারি। সেসময় অদিতির সহকারী ছিলেন মাত্র একজন। আজ সেই সংখ্যাটা বা়ড়তে বাড়তে দশজনে পৌঁছেছে। চলতি বছরের জুলাই Indian Export Councilথেকে ডাক পান অদিতি চক্রবর্তী। দিল্লিতে Indian Jewellery and Fashion Accessories Show তে নিজের জুয়েলারির প্রদর্শনী করার সুযোগ পেয়ে যান।

ফ্যাশন শোয়ে অদিতির জুয়েলারি
ফ্যাশন শোয়ে অদিতির জুয়েলারি

এই প্রথম আন্তর্জাতিক শিল্পীদের সঙ্গে এবং আন্তর্জাতিক বাজারে পরিচয় ঘটে অদিতির ব্র্যান্ডের। সেই সূত্র ধরেই দিল্লির একটি মাল্টিডিজাইনার স্টোর এবং মাদ্রিদের একটি দোকান থেকে বিক্রি হতে শুরু করে অদিতির তৈরী জুয়েলারি। বেশ কিছু পত্রপত্রিকায় ফোটোশুট এবং ফ্যাশন শো করার পর ডিজাইনার শর্বরী দত্তর নজরে পড়েন অদিতি। তাঁর আন্তর্জাতিক শো-তেও কিছুদিনের মধ্যেই প্রদর্শিত হতে চলেছে Aditi's Jewellery। শিল্পী হিসেবে সুনাম অর্জনের পর এবার একজন সফল উদ্যোগপতি হিসেবে নিজের ব্র্যান্ড ভ্যালু গড়ে তোলার দিকে নজর দিচ্ছেন অদিতি। এতদিন শুধুমাত্র ক্লে দিয়েই তৈরী হতো তাঁর গয়না। পুজোর পর মেটাল নিয়েও কাজ শুরু করবেন অদিতি। তাঁর কর্মচারীরা শুধুমাত্র গয়না তৈরী করেন। কিন্তু এখনও প্রতিটি ডিজাইন নিজে হাতে আঁকেন অদিতি।

নিজের জুয়েলারি নিয়ে যতদূরই এগোন না কেন, পুজোর কাজ চালিয়ে যাবেন বলেই জানালেন অদিতি চক্রবর্তী। তাঁর মতে, দুর্গাপুজো বছরে একবার আসে। এই সৃষ্টির আনন্দই আলাদা। প্রচারের আলোয় থাকতে পারা, বা বড় অংকের পারিশ্রমিক নয়, অদিতি দুর্গাপুজোর প্রতিমা এবং মণ্ডপসজ্জা করেন শুধুমাত্র শিল্পী হিসেবে নিজের চাহিদা মেটাতে। 'এত কাজ, পাশাপাশি ছেলের খেয়াল রাখা, মাঝেমাঝে নিজেই বুঝতে পারিনা এত দিক একসঙ্গে সামলাই কী করে। 'নিজেই বললেন অদিতি। তবে ব্যস্ততাই তাঁকে ভালো রাখে। জীবনের অন্য অনেক কিছু ভুলতে চান তিনি তাঁর সৃষ্টি, তাঁর পরিশ্রমের মধ্য দিয়ে। কারণ এটাই তাঁর একমাত্র পাথেয়।

Related Stories