কলকাতার বস্তির অর্ধেক শিশু অপুষ্টির শিকার: CRY

0

শহরের পথে পথে রুগ্ন শিশু। পথেই বাস। কারও বা মাথার ওপর এক টুকরো ছাউনি জুটেছে। শতচ্ছিন্ন হলেও, সেটাই ঝড়, জল, রোদ, ঠান্ডায় একটুকরো ভরসা। খাবার কখনও জোটে, অধিকাংশ সময়ই তা জোটে না। জুটলেও ওইটুকু খাবার, তাতে পুষ্টির মান মাইক্রোস্কোপেও দেখা যায় না। ওই দিয়ে কী শরীর বাড়ে? শহরের বস্তিগুলোয় শিশুস্বাস্থ্য এবং পুষ্টির অবস্থা যতটা আশা করা হয়, তার থেকে তা অনেক দূরে। ক্রাইয়ের স্বেচ্ছাসেবকরা কলকাতা জুড়ে এবং দেশের আরও চারটি মেট্রো শহরে সমীক্ষা চালিয়ে যে তথ্য তুলে এনেছেন তার ছবিটা দেখলে রীতিমত শিউরে উঠতে হয়।

কলকাতার বস্তিগুলিতে অর্ধেকের বেশি শিশুর ওজন কম। ১ থেকে ৬ বছরের বাচ্চাদের মধ্যে সমীক্ষা চালিয়ে এই তথ্য দিয়েছেন চাইল্ড রাইটস অ্যান্ড ইউ (CRY)-এর স্বেচ্ছাসেবীরা। বাচ্চাগুলির স্বাস্থ্যের দিকে নজর দেওয়া তো দূর, তিন ভাগের এক ভাগেরও বেশি শিশুর রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা নেই।

Are Children Getting A Healthy Start” শীর্ষক একটি সমীক্ষা হয়। মূলত কলকাতা, দিল্লি, মুম্বই, চেন্নাই এবং বেঙ্গালুরু-এই পাঁচ মেট্রো সিটিতে ৬ বছরের নীচে শিশুদের স্বাস্থ্য, পুষ্টি এবং শিক্ষার অবস্থা তুলে ধরাই ছিল সমীক্ষার উদ্দেশ্য। সমীক্ষার ফলই বলে দেয়, পাঁচ মেট্রো শহরের বস্তিগুলিতে শিশুদের পুষ্টি ইতিবাচক নয়। 

  • সবচেয়ে বেশি চেন্নাইতে, ৬২.২ শতাংশ বস্তিবাসী শিশু অপুষ্টিতে ভোগে এবং তাদের ওজনও কম। 
  • তারপরই রয়েছে কলকাতা এবং দিল্লি, যথাক্রমে ৪৯ এবং ৫০ শতাংশ শিশু অপুষ্টির শিকার।
  • বেঙ্গালুরু এবং মুম্বইয়ের বস্তির শিশুদের অবস্থা তুলনামূলকভাবে ভালো। বেঙ্গালুরুতে ৩৩ শতাংশ এবং মুম্বইয়ে ৪১ শতাংশ শিশু কম ওজনের। 

সমীক্ষা থেকে আরও উঠে এসেছে, কলকাতার বস্তিগুলিতে ৪৯ শতাংশ শিশুই জন্মের সময় খুব কম ওজনের হয়। তাদের মধ্যে আবার ৩৩ শতাংশ একেবারেই অপুষ্ট। এই পরিসংখ্যানেই শহরের শিশু অপুষ্টির ছবিটা পরিষ্কার হয়ে যায়।

শিশুদের প্রথম ছটা বছরে টিকাকরণ অত্যন্ত জরুরি। কলকাতার বস্তিগুলিতে টিকাকরণের অবস্থাও খুব একটা সন্তোষজনক নয়। গত কয়েক বছরে অবশ্য পরিস্থিতির সামান্য উন্নতি হয়েছে। সমীক্ষায় প্রকাশ, এখনও ৪০শতাংশের বেশি শিশুকে সম্পূর্ণ টিকাকরণের আওতায় আনা যায়নি। যেসব শিশুদের ওপর সমীক্ষা চালানো হয়েছে তাদের মধ্যে ৫৮ শতাংশকে অন্তত অনুমোদিত টিকার একটা করে ডোজ দেওয়া সম্ভব হয়েছে। এর মধ্যে আবার লিঙ্গ বৈষম্যও কিছুটা আছে। সংগৃহীত তথ্য বলছে, ১ থেকে ৩ বছর বয়সের ৬১.২ শতাংশ ছেলেদের পুরওপুরি টিকাকরণ হয়েছে। মেয়েদের ক্ষেত্রে সেই হার ৫৬.৫ শতাংশ। কলকাতার থেকে দিল্লির অবস্থা আরও খারাপ। ৩ বছরের নীচে শিশুদের মধ্যে এক তৃতীয়াংশেরও কম (৩১ শতাংশ) শিশুর টিকাকরণ হয়েছে।

অঙ্গনওয়াড়ি কেন্দ্রগুলি ৬ বছরের কম শিশুদের জন্য স্বাস্থ্য, পুষ্টি এবং শিক্ষার দিকে নজর রাখে। কিন্তু কলকাতার বস্তির শিশুরা যাদের নিয়ে সমীক্ষা হয়েছে তাদের মধ্যে ২০ শতাংশ শিশুই অঙ্গনওয়াড়ির নাগালের বাইরে। আইসিডিএস স্কিমে শিশুদের কৃমিমুক্ত করা, আইরন-ফলিক অ্যাসিড ট্যাবলেট এবং ভিটামিন এ-র সাপ্লিমেন্ট দেওয়া হয়। সমীক্ষায় দেখা গিয়েছে, কলকাতার বস্তির সব শিশুদের কাছে সেই পরিষেবা পৌঁছয় না। যাদের ওপর সমীক্ষা হয়েছে তাদের মধ্যে ৬০ শতাংশই আয়রন-ফলিক ট্যাবলেট পায় না, ভিটামিন এ এবং কৃমি রোধের ওষুধ পৌঁছায় যথাক্রমে ৬৯ এবং ৬১ শতাংশের কাছে।

আইসিডিএসের পরিষেবাতেও কিছু গলদ ধরা পড়েছে। একটি নির্দিষ্ট অংশের ওপর সমীক্ষায় দেখা গিয়েছে, আইসিডিএস কেন্দ্রগুলি যেভাবে শিশুদের বৃদ্ধির ওপর নজর রাখছে তাতে ৮৭ শতাংশ বাবা-মা খুশি। উলটো দিকে ৪৫ শতাংশ বাবা-মায়ের আবার অভিযোগ, তাঁরা সেন্টারগুলি থেকে ঠিকমতো ফিডব্যাক পাচ্ছেন না। সবচেয়ে চিন্তার হল ৭৬ শতাংশ বাবা-মাকে অঙ্গনওয়াড়ি কেন্দ্র থেকে বলাই হয়নি তাদের শিশুরা কম ওজনের এবং হাসপাতাল বা স্বাস্থ্যকেন্দ্রে নিয়ে যাওয়া জরুরি।

জন্ম নথিবদ্ধকরণ বা শিশুদের স্তন্যপান করানোর ক্ষেত্রে কলকাতা এগিয়ে। পাঁচটি মেট্রো সিটিতে সমীক্ষায় দেখা গিয়েছে, জন্ম নথিবদ্ধকরণে কলকাতা দ্বিতীয়, যার হার ৮৫.১ শতাংশ। সুখের বিষয়, কলকাতার বস্তিগুলিতে দেখা যায় ৯৪ শতাংশ নবজাতককে মায়ের দুধ খাওয়ানো হয়।

একনজরে দেখে নেব কলকাতার বস্তিগুলিতে শিশুস্বাস্থ্যের কী হাল-

  • ১ থেকে ৬ বছরের যেসব শিশুর ওপর সমীক্ষা চালানো হয়েছে তাদের মধ্যে ৪৯ শতাংশ শিশুর ওজন কম। ৩৩ শতাংশ অপুষ্টিতে ভোগে।
  • ৫১.৭ শতাংশ ছেলে (শিশু) অপুষ্ট, ৪৭ শতাংশ মেয়ে অপুষ্ট
  • ৩ বছরের কম এমন শিশুদের মধ্যে ৪০ শতাংশেরই টিকাকরণ হয়নি
  • ৩১ শতাংশ শিশু ভিটামিন এ সাপ্লিমেন্ট পায় না, ৩৯ শতাংশের কৃমিনাশ হয়নি, ৫৮ শতাংশ শিশু আয়রন-ফলিক সাপ্লিমেন্ট পায়নি।
  • ৪৫ শতাংশ বাবা-মা অঙ্গনওয়াড়ি থেকে ওয়ার্ডের স্বাস্থ্য পরিস্থিতি নিয়ে নিয়মিত ফিডব্যাক পান না।
  • ৭৬ শতাংশ বাবা-মাকে বলা হয় না তাদের ওয়ার্ডের শিশুরা স্বল্প ওজনের।

ক্রাইয়ের সিইও পূজা মারওয়াহা বলেন, ‘শিশুদের জন্য জন্ম থেকে ৬ বছর পর্যন্ত অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ সময়। এই সময় শিশুদের সামাজিক, মানসিক বৃদ্ধি, ভাষাজ্ঞান, দায়িত্ববোধের ভিত তৈরি হয়। একটু কিছু ভুল হলেই তার প্রভাব পড়ে কচি মন এবং শরীরে। তাই এই বয়সের শিশুদের জন্য স্বাস্থ্য, পুষ্টি এবং শিক্ষা নিশ্চিত করা জরুরি’। পূজার সংযোজন, ‘ক্রাইয়ের পরামর্শ হল, স্বাস্থ্য, পুষ্টি এবং শিশুদের দিকে নজর তাদের অধিকার হিসেবে দিতে হবে। খুব দ্রুত তাদের স্বাস্থ্যের জন্য পুষ্টি নিশ্চিত করা জরুরি। শহরের বস্তি পরিবারগুলিতে বেশিরভাগ ক্ষেত্রে বাবা-মা দুজনেই কাজে যান। সেক্ষেত্রে শিশুদের রাখার জন্য ক্রেশের ব্যবস্থা ভাবতে হবে’। ৩৫ বছরের এই এনজিওর বর্তমান সঙ্গী সংখ্যা ২০০। শহুরে বস্তিগুলির ওপর এই সমীক্ষা ক্রাইয়ের উদ্যোগ হেলদি স্টার্ট-এর মূল লক্ষ্য হল, জন্ম থেকে ৬ বছরের শিশুদের জন্য স্বাস্থ্য সুরক্ষা, পুষ্টি, শিক্ষা নিশ্চিত করা। হেলদি স্টার্টের অংশ হিসেবে ক্রাই গেট হেলদি, গিভ হেলদি ক্যাম্পেনও চালু করেছে। শিশুদের স্বাস্থ্যকর বৃদ্ধি সম্পর্কে মানুষের মধ্যে সচেতনতা তৈরি করে দেওয়াই এই ক্যাম্পেনের উদ্দেশ্য।