পুলিশ ছেড়ে ব্যবসায়: স্বপ্নের হাতে ‘হাতকড়া’ দেবদুলালের

0

পুলিশকর্মী। ভদ্রস্থ বেতন। তবুও উদ্যোগপতি হওয়ার স্বপ্নটা ধূসর হয়নি। কিন্তু যখনই কিছু শুরু করেছেন তখনই ঠোক্কর খেয়েছেন। টানা ব্যর্থতাই জেদটা বাড়িয়ে দেয়। লেডিজ ব্যাগ তৈরি করে সাফল্য পাওয়ার পর আর পিছনে তাকাতে হয়নি। চিনা ব্যাগ সরিয়ে শিলিগুড়ি ও উত্তর পূর্বের বাজার এখন সেই তথাকথিত ‘ব্যর্থ’ মানুষের হাতে। এতটাই প্রত্যয় যে হেলায় নিশ্চিন্তের চাকরি ছেড়ে পুরোদস্তুর উদ্যোগপতির ভূমিকায় তিনি। যার সুবাদে রায়গঞ্জের কয়েকশো মহিলা রুটিরুজির নতুন পথ খুঁজে পেয়েছেন।

আলাপ করুন। ইনি দেবদুলাল বাগচি। সকাল দেখলে দিনটা কেমন যাবে নিয়ে যারা পূর্বাভাস করেন তাঁদের হিসাবটা গুলিয়ে যেতে পারে দেবদুলালবাবুকে দেখলে। কারণ ছেলেবেলা থেকেই যখন কিছু শুরু করতে চেয়েছেন তখনই শুনতে হয়েছে এসব করে কিছু হবে না। ক্লাসে টেনে পড়ার সময় একটি বিজ্ঞাপনে দেখেছিলেন ব্যবসার ব্যাপারে সরকার থেকে স্বল্প সুদে ঋণ দেওয়া হচ্ছে। ‌বাড়িতে এই নিয়ে কিছু বলায় উপেক্ষাই জুটেছে। তবুও স্নাতক হওয়ার মুখে পুলিশের চাকরির ডাক পান। সময়টা তখন ১৯৯১ সাল। টালিগঞ্জে থাকাকালীন স্বাধীনভাবে কিছু করার স্বপ্ন তাঁর মাথায় সবসময় ঘুরপাক খেত। কাপড়ের ব্যবসা শুরু করলেন। তেমন জমল না। আরও কিছু করার চেষ্টা করলেন। সেখানেও ধাক্কা। পরিচিতরা তাঁকে কার্যত ‘ব্যর্থ’-র খাতায় ফেলে দিয়েছিলেন। এমনকী পরিবার থেকেও তেমন ভরসা পাননি। এত নেতির মধ্যে ইতিবাচক খুঁজে বেরিয়েছিলেন দেবদুলালবাবু। বুঝতে পেরেছিলেন কোনও কাজ নিজে না জানলে তাতে সাফল্য পাওয়া দুষ্কর। রায়গঞ্জের এই বাসিন্দা তখন শিলিগুড়িতে পোস্টিং। শিলিগুড়ি জুড়ে চিনা ব্যাগের দাপট দেখে তাঁর মনে হয়েছিল এধরনের ব্যাগ বানালে কেমন হয়। নিজের বাড়িতে কার্যত লুকিয়েই শুরু করলেন ব্যাগ বানানো। শুরুতে নিজেই মিস্ত্রি, নিজেই সেলসের কাজ। শিলিগুড়ির কয়েকটা চেনা দোকানে তা দেওয়ার পর ভরসা পেয়ে যান দেবদুলালবাবু। স্থানীয় কয়েকজন ছেলেকে বেছে নেন। এই কাজের জন্য তাদরেকে ট্রেনিংও দেন তিনি। এরপরের ঘটনা তো ইতিহাস।

শিলিগুড়িতে বাজার ধরে নেওয়ার পর অন্য সমস্যা তৈরি হয়। কীরকম। দেবদুলালবাবুর কথায়, ‘‘চাহিদা প্রচুর। কিন্তু আমি একা করে উঠতে পারছিলাম না। রায়গঞ্জের কয়েকজনের সঙ্গে কথা বলি। তাঁরা এককথায় রাজি হয়ে যান। নতুন ছেলেমেয়েদের পেয়ে কাজের গতি আরও জোর পায়।” নতুন উদ্যম পেয়ে ২০০৪-০৫ সময়ে শিলিগুড়ি ছাড়িয়ে উত্তর পূর্বের রাজ্যগুলির বাজারেও ঢুকে পড়ে দেবদুলালবাবুর ‘বাগচি ব্যাগ ইন্ডাস্ট্রিজ’। প্রথমে শ্বশুরবাড়ির একটা ঘর নিয়েছিলেন। কাজের তোড়ে আবার নতুন ঠিকানা খুঁজতে হয়। রায়গঞ্জের চণ্ডীতলায় একটি ঘরকে কারখানা বানিয়ে চলতে থাকে ব্যবসাকে আরও এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার পালা।


এগিয়ে চলার নতুন নতুন শৃঙ্গজ‌য়ের মুখে তখন দেবদুলালবাবু বুঝতে পারেন হয় চাকরি না হলে ব্যবসা। একটা পথ ধরতে হবে। তিনি দেওয়াল লিখন পড়তে পারলেও বাড়ির লোকজন কেন তা শুনবেন। ‘‘প্রিয়জনকে সেই মুহূর্তে সামলানো ছিল এক মস্ত বড় সমস্যা।’’ নিজের ফ্যাক্টরিতে হাসতে হাসতে বলছিলেন দেবদুলালবাবু। সব পিছুটান সরিয়ে পুরোদমে ঝুঁকে পড়েন ব্যাগ ব্যবসায়। তাই ২০১২ সাল থেকে পুলিশের চাকরি থেকে ইতি। কারণ তাঁর মনে হয়েছিল মানুষের কাছে চিনের থেকেও সস্তায় ব্যাগ তুলে দিতে হবে। আর এর মাধ্যমে বহু মহিলা স্বাবলম্বী হবেন। সেই মিশনে অনেকটাই এগোতে পেরেছেন এই ব্যবসায়ী। প্রতিদিন বিকেলে তাঁর কারখানায় মেয়েদের মেলা লেগে যায়। রায়গঞ্জ শহর ও লাগোয়া এলাকার অন্তত ২০০ জন মহিলা তাঁর সংস্থার ব‍্যাগ তৈরিতে যুক্ত। মূলত স্বনির্ভর গোষ্ঠীর মেয়েরাই এই কাজ করেন। দেবদুলালবাবুকে দেখে তাঁদের উপলব্ধি চাকরির অপেক্ষায় হাপিত্যেশ করে বসে থাকা নয়, নিজেকেই কিছু করতে হবে। গোষ্ঠীর মহিলারা ফেন্সি ব্যাগ বানিয়ে মাসে তিন থেকে চার হাজার টাকা রোজগার করছেন। ওই যোদ্ধাদের অভাবের ঘরে এখন আত্মবিশ্বাসের আলো। তাদের সুন্দর ব্যাগ শিলিগুড়িতে চিনের বাজার অনেকটাই দখল করে নিয়েছে। উত্তর পূর্বের প্রায় সর্বত্রই রমরমিয়ে চলছে ‘বাগচি ব্যাগ ইন্ডাস্ট্রিজ’র নজরকাড়ার ব্যাগ। ৪৬ বছরের মানুষটির কাছে এইসব বেশ তৃপ্তি দেয়। দেবদুলালবাবুর কথায়, “মহিলাদের কাজের ব্যস্ততায় যখন কারখানা গমগম করে তখন মন ভরে যায়। আরও অনেক মহিলার মুখে এমন হাসি দেখতে চাই।” প্রিয়জনরা একসময় মুখ ঘুরিয়ে নিলেও এখন সব্বাই পাশে। অচেনা পথে নামার আগে একটা বইয়ের বেশ কিছু শব্দবন্ধ মনে রাখতেন দেবদুলাল বাগচি। তা হল – যেকোনও কাজ করা হোক না কেন, তা সার্বিক এবং সামাজিক উন্নয়ন মাথায় রেখে করলে কখনই তার উদ্দেশ্যা ব্যর্থ হয় না। এই শিক্ষাই তাঁর জীবনবোধকে এগিয়ে নিয়ে চলেছে।