Andre Garcia, যার কথা বলতে কলকাতার গর্ব হয়

0

অভীক, কলকাতার সেই ছেলে যার কথা বলার আগে গর্বে কলকাতার বুকের ছাতি  ফুলে ফেঁপে বেলুন হওয়া উচিত। গত প্রায় এক দশকেরও বেশি সময় ধরে গোটা বিশ্বে ও এক চর্চিত ব্যক্তিত্ব। পোরশে, বেন্টলি, মঁ ব্লাঁর মতো ব্র্যান্ডের গায়ে গা লাগিয়ে সগৌরবে হাজির করতে পেরেছেন তাঁর নিজের ব্র্যান্ড আন্দ্রে গার্সিয়াকে। মূলত সিগার অ্যাকসেসরিজের এই ব্র্যান্ডে মজে আছে দুনিয়ার তাবড় ধনকুবের। ভক্তদের তালিকায় আছেন হলিউড স্টার আর্নল্ড শোয়ার্জেনেগারের মতো মানুষ। আলাপ করুন তরুণ উদ্যোগপতি অভীক রায়ের সঙ্গে। পঁয়তাল্লিশ ছেচল্লিশ বছরের এই যুবক কলকাতার মর্যাদা বাড়িয়েছেন। তাঁর কথা বিদেশের নামি দামী পত্রিকায় বারংবার ফলাও করে প্রকাশ পেয়েছে। অভীকের উদ্ভাবনী ক্ষমতা, সাহস আর রুচির প্রশংসায় মম করছে ঝকঝকে পাতার দারুণ সব পত্রপত্রিকা। তার মধ্যে আছে সিগার অ্যাফিসিওনাডো, রব রিপোর্ট, ভিনটেজ লুক্সে, স্মোক, অয়রোপিয়ান কুল্ট এর মতো সাময়িকী। দেশেও দুর্দান্ত আলোচিত এই বিরল উদ্যোগপতি।

আমাকে হাতে নিয়ে দেখাচ্ছিলেন একটি কেস। সিগার কেস। বাংলায় যাকে বলে চুরুটের বাক্স। বাদামি রঙের চামড়ায় মোড়া। ঢাকনাটা খুললে দুটো অংশ। বাভারিয়ার মহিষের চামড়া দিয়ে তৈরি ওই বাক্সের ভিতরে সিডারের ছাল দিয়ে একটা আস্তরণ দেওয়া। চামড়া আর সিডারের ছালের মাঝখানে ধাতুর পাতের একটি আস্তরণ আছে। সিগার যেখানে রাখা হয় সেই অংশটাতেও ধাতুর কেসিং করা। ফলে আগুন জ্বলা অবস্থাতেও কেসের ভিতর রেখে দিলে সিগার নষ্ট হয় না। নিবে যায়। সেই মেকানিজম বুদ্ধি করে করেছেন গণিতের ছাত্র অভীক। সবশেষে কেসের নিচে ওপরে মহিষের সিংয়ের একটা পাত লাগানো। চামড়ার সেলাই থেকে পেস্টিং কোথাও কোনও খুঁত নেই। নিখুঁত হওয়াটাই অভীকের জন্মগত।

বাবা অঙ্কের তুখোড় পণ্ডিত। অধ্যাপনা করতেন। নিজেও সেন্ট জেভিয়ার্সের অঙ্কে অনার্স। ভীষণই খুঁতখুঁতে আর পারফেকশনিস্ট। তবে খেলাধুলোতেই বেশি আগ্রহ ছিল অভীকের। ভবানিপুরের ছেলে। কলকাতার হেন কোনও মাঠ নেই যেখানে ও ফুটবল খেলেননি। আর ছিল কব্জির জোর। সাউথ পয়েন্টে পড়ার সময় পাঞ্জা লড়া নিয়ে বেশ নাম ডাক হয়ে গিয়েছিল। ওর থাবা থেকে নিস্তার পাওয়া সোজা ছিল না কোনও দিনই। রীতিমত ডাকাবুকো বলতে যা বোঝায় অভীক তাই। প্রাথমিক আলাপেই বেরিয়ে এলো ওর সরল স্বাভাবিক সত্তা। বলছিলেন ভয় পাওয়াটা ওর ধাতে নেই। যা স্থির করেন করবেন, করেই ছাড়েন। এমবিএ পাস করার পর প্ৰথম চাকরি পান ইন্ডিয়ান রেয়ন সংস্থায়, কাজটাকে আদৌ চ্যালেঞ্জিং মনে হয়নি। অধিকাংশ সময়ই অপচয় মনে হত। ১৯৯৭ সাল। সেই শুরু ইন্টারনেটে সিগার নিয়ে খোঁজখবর করা। শখেই। তারপর ১৯৯৯ সালে স্যাপের কোর্স জয়েন করেন। তার পর এক্সপোর্ট প্রোমোশনের ব্যাপারেও আগ্রহ তৈরি হয়। সেখানেই ধরা পড়ে যায় অভীকের প্রতিভার জৌলুস। আলাপ হয় এক্সএল এন্টারপ্রাইজের কর্ণধার সজল দত্তের সঙ্গে। ওই সংস্থা চামড়ার সামগ্রী বিদেশে রফতানি করত। সজল বাবু আসল হীরে চিনতেন। লুফে নেন অভীককে। সিগার কেস তৈরি করা সেই শুরু। নতুন নতুন আইডিয়া দিয়ে দুর্দান্ত সব সিগার কেস তৈরি করেন অভীক। ওই সংস্থায় কাজের সুবাদেই প্রথমবার জার্মানিতে অ্যামবিয়েন্তে শিল্প মেলায় যান। দারুণ সাফল্য আসে। সেখানেই আলাপ রবার্ট ফ্রাঞ্জব্লাউয়ের সঙ্গে। ফ্লোরিডার এই ভদ্রলোক গোটা থমসন গ্রুপের মালিক। যারা ওকে চিনতেন ওর প্রতিপত্তি সম্পদ আর প্রভাব সম্পর্কে যারা ওয়াকিবহাল তারা ওর সামনে দাঁড়াতে নার্ভ ফেল করত। কিন্তু অভীকের কাছে ফ্রাঞ্জব্লাউ মেলায় আসা আর পাঁচটা সাধারণ দর্শকদের মতোই একজন ছিলেন। ফলে প্রথম আলাপে দুজনেই দুজনকে পছন্দ করে ফেলেছিলেন। ওর বানানো সিগার কেস দেখিয়ে থমসন সিগারের মালিক নিজে মুখে অভীককে বলেন এই কাজ যদি সত্যিই ও করে থাকেন তবে ওর নিজে সংস্থা খুলে করা উচিত সেক্ষেত্রে থমসন সিগার ওর প্রথম ক্রেতা হতে রাজি আছে। আর ওকে পায় কে। সেই ঘুরে গেল মোড়। ভবানিপুরের ছেলেটা খুলে ফেললেন তার নিজের সংস্থা। সংস্থার রেজিস্ট্রেশন হল আমেরিকায়। ইউরো-আমেরিকান একটি নাম বাছলেন, আন্দ্রে গার্সিয়া। নামটা এমন হওয়ার পিছনে অভীকের যুক্তি নামের অর্থটা জরুরি নয়, বরং ক্রেতাদের কাছে নামটা ভালো লাগাটাই বেশি জরুরি। মূল ক্রেতা যেহেতু ইউরোপ আর আমেরিকায় ছড়িয়ে তাই স্প্যানিশ ঘেঁষা নাম।

২০০৩ থেকে ২০১৭ টানা তের চোদ্দ বছর রীতিমত শাসন করেছেন ইউরোপ আমেরিকার সিগার অ্যাকসেসরিজের বাজার। এখনও সমান জনপ্রিয়। এই দুই মহাদেশের ধনীদের কাছে আন্দ্রে গার্সিয়ার সিগার কেস রাখাটা রীতিমত স্ট্যাটাস সিম্বল।

ওদের বিজনেস ক্লায়েন্টের তালিকায় রয়েছে অ্যাস্টন সিগার, অ্যালটাডিস ইউএসএ, আর থমসন তো প্রথম থেকেই আছে। তাছাড়া ডানহিল ওদের কাস্টমর। ডেভিডঅফ, কোহিবা, মাকানুডো, সুইডিশ ম্যাচের মত তাবড় সিগার ব্র্যান্ড ওদের কাস্টমর। গোটা বিশ্বের নামকরা সব শপিং মলে ওদের প্রোডাক্ট পাওয়া যায়। জার্মানির কা দে উই থেকে বোস্টনের স্টারবাক্‌স, প্যারিসের আ লা সিভেত্তে, লন্ডনের জেজে ফক্স কিংবা আমস্টারডমের হাহেনিউস যেখানেই যাবেন পাওয়া যাবে কলকাতার আন্দ্রে গার্সিয়া। হ্যাঁ কলকাতার কারণ এই অনন্য সুন্দর কেসগুলো তৈরি হয় আলিপুরের একটি পুরনো বাড়িতে। আগে অনেক মানুষ কাজ করতেন। শিফটে কাজ হত। বছরে দেড়লক্ষ কেস তৈরি হত। এখন কমিয়ে দেওয়া হয়েছে প্রোডাকশন। জনা তিরিশেক দক্ষ কর্মী তৈরি করেন এই বিশ্বমানের প্রোডাক্ট। বছরে ওরা এখন পঞ্চাশ থেকে ষাট হাজার কেস তৈরি করেন ওরা।

অভিনবত্বেও অসাধারণ ওদের কাজ। অভীক বলছিলেন, সচরাচর বিদেশের বাজারে যেসব সিগার কেস পাওয়া যায় সেগুলোয় বেশি সিগার রাখার ব্যবস্থা থাকে না। ওরা বানালেন ১ টা থেকে আটটা বিভিন্ন আকারের সিগার রাখার মতো কেস। সঙ্গে নিয়ে যাতায়াত করার জন্যে রীতিমত কাঁধে ঝোলাবার বন্দোবস্তও করলেন। তাছাড়া চাপে যাতে ভেঙে না যায় এরকম কার্বন ফাইবারের তৈরি করা হল। লাগিয়ে দেওয়া হল চেনও। এছাড়া আন্দ্রে গার্সিয়া তৈরি করে পুরুষ এবং মহিলাদের জন্যে চামড়ার ব্যাগ। ফ্যাশন প্রোডাক্ট হিসেবে দারুণ কদর আছে সেসবের। গুণগত মান আর রুচির প্রশ্নে কোনও আপোষ করেন না অভীক। জার্মান লেদার দিয়ে টপ লাইনের ব্যাগ তৈরি করেন। আর ওর ভাই অনিন্দ মার্কিন মুলুকে থাকেন। সেখান থেকে সংস্থার মার্কেটিংয়ের যাবতীয় দায়িত্ব পালন করেন।

ভাবছেন তো ভারতে কোথায় পাবেন? ভারতের বাজারের জন্যে নিকারাগুয়া, হন্ডুরাস এবং ডমিনিকান রিপাবলিক থেকে সিগার আমদানি করছেন অভীকরা। কলকাতার অভিজাত ক্লাব আর দেশের ফাইভ স্টার হোটেলের সেলস কাউন্টারে পেয়ে যাবেন আন্দ্রে গার্সিয়ার সিগার। কলকাতায় তাজ বেঙ্গলে আছে ওদের আন্দ্রে গার্সিয়ার সিগার। সিডার কাঠের তৈরি ক্যাটালগ হাতে নেওয়াটাই একটা অভিজ্ঞতা। সওয়া তিন ইঞ্চি থেকে সাত ইঞ্চির নানান রকমের সিগার পাওয়া যায়। সিগারিলো, পুরিটোস, রোবাস্টো, টোরো, টর্পেডো, চার্চিল। কত নাম। ঠোঁটের ফাঁকে নেওয়ার কেতই আলাদা। বাইশে শ্রাবণের সেটই বলুন কিংবা নিজের সবান্ধব মজলিস, প্রসেনজিৎ চট্টোপাধ্যায় অভীকের সিগারে রীতিমত ফিদা। এই তালিকায় আছেন খোদ দেশের রাষ্ট্রপতি প্রণব মুখোপাধ্যায়ও। তালিকা দীর্ঘ করব না। তবে জেনে রাখুন আন্দ্রে গার্সিয়ার দোকান আছে ফলকনুমা প্যালেসে, উমেদ ভবনে, উদয়পুর প্যালেসে, তাজের সবকটি পাঁচতারা হোটেলে, তাজ মহলে, আর বেঙ্গল ক্লাব, ক্যালকাটা ক্লাব আর রয়্যাল ক্যালকাটা গল্ফ ক্লাবে পেয়ে যাবেন দক্ষিণ আমেরিকার সুখটানের সূত্র। প্রিমিয়াম কাস্টমারের কথা ভেবেই ওরা তৈরি করেন ওদের প্রোডাক্ট। এটাই ওদের ব্যবসার মূল ইউএসপি। আর আপনি যদি ধূমপান শৌখিন হন তাহলেও এটা আপনার সংগ্রহে থাকা উচিত।

অভীক কিন্তু চাইছেন আরও অনেক কিছু করতে। সিগার, সিগার কেস, লেদারের ব্যাগ, মেন অ্যান্ড উইমেন ফ্যাশন অ্যাকসেসরিজ তো অনেক হল এবার আরও অন্যরকম কিছু তার গ্রাহকদের উপহার দিতে চান। তাই নিয়ে ভবানিপুরের ছেলেটার তোড়জোড় তুঙ্গে। সেটা কী... জিজ্ঞেস করায় বললেন "রঘু ধৈর্যং!!!... সকলই ক্রমশ প্রকাশ্য।"

Related Stories