ছৌ-এর জৌলুস আজ অতীত, ধুঁকছেন চড়িদার শিল্পীরা

2

পুরুলিয়া শহর থেকে বাঘমুণ্ডি হয়ে অযোধ্যা যাওয়ার পাহাড়, জঙ্গল ঘেরা সর্পিল রাস্তা। বাঘমুণ্ডি থেকে পাঁচ কিলোমিটার দূরে পাহাড়ের কোলে চড়িদা গ্রাম। ঠিকঠাক রাস্তা না চিনলে গ্রামটিকে খুঁজে পাওয়া এক কথায় অসম্ভব। পথনির্দেশ-এর নামমাত্র চিহ্ন যেমন নেই, তেমনই রাস্তায় ছোট এক-দুটো জনপদ ছাড়া কিছুই চোখে পড়বে না। এই চড়িদা গ্রামে প্রায় একশো পরিবারের বাস। কয়েক প্রজন্ম ধরে যাঁরা একটাই কাজ করে থাকেন - ছৌ নাচের মুখোশ তৈরী করা। খুব আশ্চর্য়ের বিষয়, পুরুলিয়া ছৌ যে মুখোশের জন্য প্রসিদ্ধ - সেই মুখোশের আঁতুরঘর চড়িদার কথা সাধারণ মানুষ শোনেননি বললেই চলে। অথচ, এখানে একের পর এক ছোট ছোট বাড়িতে সার দিয়ে সাজানো শুধুই রঙ বেরঙের মুখোশ। আপনার শহুরে জীবন ছেড়ে হঠাৎ এখানে গিয়ে পড়লে একটাই কথা মনে হবে, "ইস্‌, এটাই তো হতে পারত এরাজ্যের অন্যতম বড় একটা ইন্ডাস্ট্রি।"

চড়িদার কথা বলার আগে, পুরুলিয়া ছৌ-এর বিষয়ে একটা তথ্য জানা দরকার। ভারতের অন্যতম প্রসিদ্ধ এবং সবচেয়ে পুরনো লোকনৃত্য ছৌ-এর ঠিকানা আক্ষরিক অর্থে দুটি। ওড়িশার ময়ুরভঞ্জ এবং পশ্চিমবঙ্গের পুরুলিয়া। কিন্তু এই দুই ধরণের ছৌ নৃত্যকে আলাদা করে তোলে একটাই বিষয়। মুখোশ। ময়ুরভঞ্জ ছৌ-নাচে মুখোশের ব্যবহার নেই। আর পুরুলিয়া ছৌ-কে বিশ্বের দরবারে পরিচিত করেছে তার মুখোশ এবং সাজপোশাক। 

বহুবছর পুরুলিয়া শহরে থাকার সুবাদে ছৌ-এর মুখোশ দেখার সুযোগ আমার বহুবার হয়েছে। ছৌ-নাচের মতোই মুখোশ তৈরীও যে কত বড় শিল্প, সে-সম্পর্কে সম্যক ধারণা আমার ছিল। যেটা ছিল না, সেটা হচ্ছে এই শিল্পীদের হাল-হকিকত সম্পর্কে সঠিক জ্ঞান। চড়িদা পৌঁছে বুঝলাম, একসময় যে শিল্পের সঙ্গে যোগ ছিল ঐতিহ্য আর জাঁকজমকের, আজ সেখানে শুধুই যেন আফশোস আর আশঙ্কা।

চড়িদা গ্রামে ঢুকতেই সরু রাস্তার দুধার জুড়ে চোখে পড়বে অধিকাংশ কাঁচা এবং খুব অল্প কয়েকটি পাকা বাড়ি। প্রত্যেকটি বাড়ির দাওয়ায় ছড়িয়ে ছিটিয়ে মাটির মণ্ড। কোথাও কাগজ পেতে রোদে শুকোতে দেওয়া সদ্য তৈরী মুখোশ। 

ঠিক কবে থেকে তাঁরা এই কাজ করছেন, তা এই রুখা মাটির সহজ-সরল মানুষগুলো ঠিক করে জানেন না। "আমি আমার দাদু আর বাবাকে মুখোশ বানাতে দেখেছি। শুনেছি দাদুর বাবাও এই কাজই করতেন। দেখে দেখেই শিখেছি, তবে ঠিক কবে এই কাজ শুরু হয়েছিল বলতে পারব না," বললেন স্থানীয় মুখোশ শিল্পী জন্মেঞ্জয় সূত্রধর। একটা মুখোশ বানাতে সময় লাগে অন্তত পাঁচদিন। মাটি তোলা, সেই মাটিতে মুখোশের আকার দিয়ে তা শুকোতে দেওয়া-এতেই প্রায় দিন তিনেক সময় চলে যায়। তারপর মাটিতে রঙের প্রলেপ। তা শুকোলে সব শেষে এখানকার মুখোশের ট্রেডমার্ক, অর্থাৎ জরি-চুমকির কাজ। ঠিকঠাক ক্রেতা পেলে একটি মুখোশ বিক্রি করে, লাভ হয় ১০০ চাকার মতো। কলকাতা বা এদেশের যেকোনও বড় শহরে যে মুখোশ বিক্রি হয় অন্তত ১০০০ টাকায়, সেই মুখোশ চড়িদা থেকে হয়তো কিনে আনা হয় ২০০-৪০০ টাকায়। "সত্যি বলতে কি এখানে খুব কম মানুষই আসেন। ক'টা লোক এই জায়গার কথা জনেন বলুন? এখানকার মানুষের পুরুলিয়া শহরেই দোকান দেওয়ার ক্ষমতা নেই," বলছিলেন জন্মেঞ্জয়। একথা ঠিক, পুরুলিয়া শহরের নামোপাড়া এলাকা, যেখানে সাজঘর এবং মুখোশের দোকান রয়েছে, সেখানেও মুখোশের দোকান হাতেগোনা। খুব বেশি হলে ৬-৭টি। অর্থাৎ চড়িদার শিল্পীদের মুখোশ বিক্রির একমাত্র উপায়, পর্যটক বা শহুরে বাবু-বিবিদের তাঁদের গ্রামে আগমনের আশায় পথ চেয়ে থাকা। বিক্রিবাটা বলতে গেলে দিনে খুব বেশি হলে ১০০০টাকার। তবে সেই সুযোগ হয়তো আসে সপ্তাহে একদিন। ফলে অধিকাংশ দিনই ভাঁড়ে মা ভবানী। সব মিলিয়ে চার-পাঁচজনের সংসারে মাসিক গড় আয় তিন থেকে পাঁচ হাজার টাকা।

তাহলে এখানকার শিল্পীদের চলে কী করে? তাঁদের মতে, "আর যাই হোক, মুখোশ বানিয়ে চলে না। এখন তো আমাদের গ্রামের প্রায় সব ছেলেই পুজোর মরশুমে বাইরে চলে যায়। ধীরে ধীরে বিভিন্ন ঠাকুরের মূর্তি তৈরী শিখে নিয়েছে সবাই। আর খানিকটা বেশি রোজগার হয়, যদি দুর্গাপুজোয় কলকাতার কোনও থিমের পুজো থেকে ডাক আসে। গত কয়েক বছর ধরে কোনও না কোনও পুজোর ডাক এসেছে। তবে সেই ডাক তো আর ১০০ ঘরের সব শিল্পী পায় না। যাদের ভাগ্যে শিকে ছেঁড়ে তাদের সুবিধা।" "কিন্তু বিদেশে তো ছৌ-এর মুখোশের কদর আছে। সেখানে আপনাদের জিনিস কীভাবে যায়?" জিজ্ঞেস করতে খানিকটা হেসেই ফেললেন শিল্পীরা। "এটা একেবারে ভুল ধারণা। আমাদের এখান থেকে নিয়মিত বিদেশ কেন, এদেশের কোনও জায়গাতেই মুখোশ যায় না। এক্ষেত্রে বাইরে থেকে কেউ অনেকে এসে হয়তো অনেকগুলো মুখোশ একসঙ্গে কিনে নিয়ে যান। সেখানে গিয়ে তাঁরা চড়া দামে মুখোশ বিক্রি করেন। আমাদের লাভ কিছুই হয় না। হ্যাঁ, একসঙ্গে কেউ ২০টা মুখোশ কিনলে, সেই মাসে একটু বেশি টাকা আসে।" তবে জন্মেঞ্জয়বাবু বললেন, "দেখুন একেবারে কোনও সুযোগ আসে না তা নয়। বছর দুয়েক আগে আমাকে পুরুলিয়ার এক শিক্ষক নেদারল্যান্ডস নিয়ে গিয়েছিলেন। মুখোশ তৈরীর ওয়ার্কশপ করাতে। ওই কয়েকদিনে বিক্রি করে কিছু টাকা ঘরে আনতে পেরেছিলাম।" কিন্তু এই সুযোগ আর কজনের কপালে জোটে। যাঁরা যান তাঁরাও হয়তো ওই একবার বা দু'বারই।


বিভিন্ন এনজিও বা এনপিও দেশের বিভিন্ন প্রান্তের লোকশিল্পীদের নিয়ে কাজ করছে বলে শোনা যায়। তবে চড়িদায় তাঁদের কেউই কোনওদিন সেভাবে পৌঁছননি। পৌঁছলেও সাতদিনের ওয়ার্কশপ ছাড়া আর কিছুই হয়নি। বড় সংস্থা বা এখনকার স্টার্ট আপ তো দূর অস্ত, সরকারি কোনও সাহায্যও এখানকার শিল্পীরা পান না। "পরিবর্তনের সরকার ভাতার ব্যবস্থা করছে শুনে আশার আলো দেখেছিলাম। কেউ কেউ কলকাতা গিয়েছিল। পৌঁছনোর পর জানতে পারে এই ব্যবস্থা শুধু ছৌ নাচ যাঁরা করেন তাঁদের মধ্যে কয়েকজনের জন্য। মুখোশ শিল্পীরা কানাকড়িও পাবেন না।" ফলে একরাশ হতাশা নিয়ে সেখান থেকেও খালি হতে ফিরতে হয়েছে শিল্পীদের। 

কয়েক প্রজন্ম ধরে চলতে থাকা এই কাজ এখনকার প্রজন্ম করতে চায় না। প্রত্যেকেই চান তাঁদের ছেলেমেয়েরা পড়াশুনো করে ছোট হলেও যেন কোনও একটা চাকরি জোগাড় করতে পারেন। এই অবস্থায় আর কতদিন এগোতে পারবেন এখানকার শিল্পীরা? জন্মেঞ্জয়বাবু বলেছেন,"দশবছর পর হয়তো এটুকুও থাকবে না। হয়তো সাংবাদিকরা আসবেন, রিসার্চ হবে, সার্ভে হবে। আমাদের কাজ নিয়ে নয়। কাজ কেন বন্ধ করে দিতে হল তা নিয়ে।"

এই গ্রামের প্রত্যেকের চোখেমুখে হতাশার ছবিটা স্পষ্ট। একসময় ছৌ নাচের জন্য পদ্মশ্রী সম্মান পেয়েছিলেন পুরুলিয়ার গম্ভীর সিং মুড়া। শেষ বয়সে অর্থাভাবে, বিনা চিকিৎসায় মৃত্যু হয়েছিল তাঁর। "এত বড় স্বীকৃতি পেয়েও যখন কাউকে এইভাবে চলে যেতে হয়। তখন আমরা তো কোন ছার," বললেন জন্মেঞ্জয়। সত্যিই কি এত ঐতিহ্যবাহী একটি গ্রামের জন্য অপেক্ষা করে আছে এরকমই কোনও করুণ পরিণতি? সেই আশঙ্কাই এখন তাড়া করে বেড়াচ্ছে চড়িদার ছৌ-মুখোশ শিল্পীদের।


ছবি সৌজন্যে: রণদীপ দত্ত