৬৪ খোপের বাইরেও ছোট্ট স্নেহা রাজাকে বাঁচাচ্ছে

1

বয়েস মাত্র আট। ৬৪ খোপে অনায়াসে ঘুরে বেড়ায় মেয়েটা। বাবাকে যখন তখন চেকমেট করে ছোট্ট স্নেহা। সম্প্রতি আন্তর্জাতিক দাবা প্রতিযোগিতায় প্রথম হয়েছে এই এক রত্তির মেয়ে। কলকাতার তারাতলার হালদার পরিবারের মেয়েটা এখন এলাকার গর্বের বিষয়। মেয়েকে নিয়ে অনেক স্বপ্ন বাবা ভগীরথ হালদারেরও। কিন্তু টাকার অভাব তাঁকে ইতিমধ্যেই বেশ কয়েকবার চেক দিয়ে ফেলেছে। সামান্য কটা টাকার জন্য অনূর্ধ্ব ৯ জাতীয় দাবা প্রতিযোগিতায় অংশ নেওয়া প্রায় ভেস্তে যেতে বসেছিল। তারাতলার হালদার পরিবারে এখন স্বপ্নে বাস্তাবে কিস্তিমাতের খেলা চলছে। ভাঙা টিনের চাল। ছোট্ট এক কামরার ঘর। সরকার পোলের এই কুঁড়ে ঘরে আসবাব বলতে একটি খাট। আর গোটা ঘর জুড়ে নানা ট্রফি। তার মধ্যে দাবার ছকে মগ্ন স্নেহা। মুখোমুখি ভগীরথবাবু।

মাত্র আট বছর বয়েসেই কয়েকবার জাতীয় স্তরে খেলা হয়ে গিয়েছে ছোট্ট স্নেহার। গত বছর অল্পের জন্য সোনা হাতছাড়া হয়েছে। এই অক্টোবরে অনূর্ধ্ব ৯ বছরের আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতায় যোগ দিতে নেপাল গিয়েছিল স্নেহা। সেখানে প্রথম হয় সে। কিন্তু নেপাল যাওয়ার পথ মসৃন ছিল না। বাবার সামর্থ ছিল না মেয়েকে প্রতিযোগিতায় অংশ নেওয়ার জন্য নেপাল নিয়ে যাওয়ার। এগিয়ে আসেন স্নেহার কাকার পরিচিত রাজ্য সরকারি অফিসার অমিতাভ ভট্টাচার্য এবং স্নেহাদের পারিবারিক বন্ধু স্কুল শিক্ষিকা দেবযানী রায়চৌধুরী। তাঁদের চেষ্টায় বেশকিছু টাকা ওঠে। সেই ১৫ হাজার টাকা সম্বল করে মেয়েকে নিয়ে নেপাল রওনা দেন ভগীরথবাবু। ফিরে আসেন সোনার মেডেল হাতে। আগস্টে ব্রাজিলে খেলতে গিয়েছিল স্নেহা। জাতীয় দলের হয়ে খেলতে যাওয়ায় তার খরচ বহন করেছিল কেন্দ্রীয় সরকার। কিন্তু ছোট্ট মেয়েকে একা ছাড়তে মন চাইছিল না। তাই দিল্লি পর্যন্ত এগিয়ে দিতে গিয়ে স্ত্রী অর্চনার সোনার গয়না বেচতে হয়েছিল।

মাত্র পাঁচ বছর বয়সে মেয়েকে নিজেই হাতেখড়ি দেন দাবা পাগল বাবা। দেওয়ালে খোপ কেটে কেটে চাল শেখাতেন। খুব দ্রুত শেখার ক্ষমতা আশায় বুক বাঁধেন। ভগীরথ নিজে বড় দাবাড়ু হওয়ায় স্বপ্ন দেখতেন। তখন সামর্থ ছিল না। আজও নেই। তবু নিজের ব্যর্থতার ছায়া পড়তে দিতে চান না মেয়ের ওপর। তাই মেয়ের খেলার জন্য স্ত্রীর সোনার চুড়ি বন্ধক দিতেও বুক কাঁপেনি ভগীরথবাবুর। স্নেহাকে প্র্যাকটিস করানো থেকে বিভিন্ন প্রতিযোগিতায় নিজেই নিয়ে যেতে গিয়ে একটা স্কুলের আংশিক সময়ের শিক্ষকের চাকরি খুইয়েছেন ভগীরথ। এখন তাঁর প্রাইভেট টিউশনের সামান্যে কটা টাকায় স্ত্রী, কন্যাকে নিয়ে তিনজনের সংসার চলে। মা অর্চনার সেলাই ফোঁড়াইয়ে যৎসামান্য আয় স্বামীকে সংসার চালাতে সাহায্যে লেগে যায়। এমন পরিবারের মেয়ের পড়াশোনা এবং প্রতি বছর বিদেশে গিয়ে আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতার খরচ জোগানো প্রায় অসম্ভব হয়ে উঠছে। নভেম্বরে অনূর্ধ্ব ৯ জাতীয় দাবা প্রতিযোগিতার আসর বসছে। গুরুগ্রামে সেই প্রতিযোগিতায় অংশ নিতে ২৫,০০০ টাকার দরকার। টাকার অভাবে প্রতিযোগিতায় অংশ নেওয়া বন্ধ হতে বসেছিল। মেধাবী এই মেয়ের সাহায্যে শেষমেশ এগিয়ে এসেছে শিশু সুরক্ষা কমিশন। তাদের আর্থিক সাহায্যেই অবশেষে হরিয়ানা যাওয়ার টিকিট পাকা করতে পেরেছে স্নেহা।

স্নেহা বলছিলো, দাবায় হারার কিছু নেই। সবটাই লাভ। জেতার জন্যই লড়াই করে ও। আর জিতলে তো বাবা নেচে নেচেই পাগল হয়ে যায়। স্নেহার হার না মানা লড়াইয়ে পাশে সবসময় বাবা বলে যান, ফাইট স্নেহা ফাইট। লড়াইটা যত না প্রতিপক্ষের সঙ্গে তার চেয়ে অনেক বেশি নুন আনতে পান্তা ফুরনো পরিস্থিতির সঙ্গে।