ই-কমার্সের সাফল্যে লজিস্টিকসই প্রাণভোমরা

0

ফ্লিপকার্ট এবং স্ন্যাপডিলের সঙ্গে আট সদস্যের ইউনিকর্ন ক্লাবে জুড়েছে পেটিএম। আর তার সঙ্গে সঙ্গে গত কয়েক বছরে ভারতের ই-কমার্সের ব্যবসা বেড়েছে রকেট গতিতে। ২০১৫য় ব্যাঙ্ক অব আমেরিকা মেরিল লিঞ্চের একটি রিপোর্ট বলছে, ২০২৫এ ভারতের অনলাইন বাজার হবে ২২০ বিলিয়ন ডলারের। প্রোডাক্টের মানের মতোই দ্রুত ডেলিভারির বিষয়ও যথেষ্ট গুরুত্বপূর্ণ। গ্রাহক ধরে রাখতে ই-কমার্সগুলির সাফল্য লজিস্টিকসের ওপর অনেকটাই নির্ভরশীল বললে ভুল হবে না।

নভোনাসের বাজার জরিপে ‘লজিস্টিকস মার্কেট ইন ইন্ডিয়া ২০১৫-২০২০’ এর হিসেব অনুযায়ী বর্তমানে দেশের লজিস্টিকস ইন্ডাস্ট্রি ৩০০ বিলিয়ন ডলারের। রিপোর্ট বলছে, ভারতের লজিস্টিক বাজারই ২০২০ র মধ্যে ১২.১৭ শতাংশ হারে বাড়বে। কম খরচে, কম সময়ে, দ্রুত বেশি জায়গায় পৌঁছাতে গেলে নতুন নতুন ভাবনা এই সেক্টরে অত্যন্ত জরুরি। বাজারের বড় বড় ই-কমার্স খেলোয়াড়রা কীভাবে ২০১৬র জন্য ময়দান তৈরি করল এবং লজিস্টিকসের জন্য ই-কমার্সগুলির কী প্ল্যান তার একটা ছবি তুলে ধরার চেষ্টা করল ইওরস্টোরি।

২০১৫য় ভারতে বহু স্টার্টআপ এসেছে, পুঁজির জোয়ার বয়ে গিয়েছে। সেক্ষেত্রে বছরটিকে ই-কমার্সে লজিস্টিকসের জয়জয়কার বললে খুব একটা বাড়াবাড়ি হবে না। স্ন্যাপডিল, ফ্লিপকার্ট, পেটএমের মতো অনলাইন মার্কেটপ্লেসগুলি লজিস্টিকসে নয়া নয়া পদ্ধতি হাজির করাচ্ছে একই সঙ্গে বিনিয়োগও আসছে বড় অঙ্কের। ট্রেন্ড বুঝে ২০১৫য় সবচেয়ে বড় ঘটনা ঘটিয়ে ফেলেছে স্ন্যাপডিল। হাইপারলোকাল রুট নিয়ে লঞ্চ করেছে স্ন্যাপডিল ইন্সট্যান্ট। এর মাধ্যমে অর্ডারের একঘণ্টার মধ্যেজিনিস পৌঁছে যায় ক্রেতার কাছে। ৫০০ মিলিয়ন ডলারের ফান্ডিং পেয়ে আরও উৎসাহী স্ন্যাপডিল ‘ফোর আওয়ার ডেলিভারি’, ‘কার্ড অন ডেলিভারি’ এবং ‘৯০ মিনিটস রিভার্স পিকআপ’ চালু করে। বর্তমানে সংস্থা নিজের ফুলফিলমেন্ট সেন্টার থেকেই ৬০ শতাংশ অর্ডার ডেলিভারি দেয়, যেখানে ২০১৫র শুরুতে হিসেবটা ছিল ৭ শতাংশ মাত্র।

এই বছর অ্যামাজন আরও আটটি ফুলফিলমেন্ট সেন্টার নিয়ে এসেছে। সারা দেশে ২১ টি সেন্টারে ৫ মিলিয়ন কিউবিক ফুট একরের স্টোরেজ ক্যাপাসিটি নিয়ে অ্যামাজনের দাবি ভারতের ই-কমার্স ইন্ডাস্ট্রিতে তাদেরটাই সবচেয়ে বড় ওয়্যারহাউস।

দক্ষ ডাটা অ্যনালিটিকস এবং ক্রেতাদের চাহিদার ভবিষ্যৎবাণী যারা করছেন তাদের ওপর বেশি বিনিয়োগ করে লজিস্টিকসে খরচ কমাতে চাইছে ই-কমার্স প্লেয়াররা। ফ্লিপকার্ট এই ক্ষেত্রে কিছু স্থানীয় স্টোরের সঙ্গে গাঁটছড়া বেঁধে তাদের বিকল্প ডেলিভারি চ্যানেল হিসেবে ব্যবহার করছে। এর ফলে ক্রেতারা ওইসব দোকান থেকে শিপমেন্ট সংগ্রহ করতে পারছেন। ‘ডেলিভারি এবং পিকআপের ক্ষেত্রে অটোমেশন সিস্টেম চালু করে প্রসেস দ্রুত করার চেষ্টা করছি আমরা’, বললেন ইকার্ট এবং ফ্লিপকার্টে লজিস্টিকসের আধিকারিকরা। দ্রুত ডেলিভারির জন্য লোকাল নেটওয়ার্কের ব্যবহার ২০১৫য় সবচেয়ে হিট ব্যবস্থা। অনেকটাই স্ন্যাপডিলের ওমনি চ্যানেল স্ট্র্যটেজির মতো পেটিএম মোবাইল ফোনের জন্য টু আওয়ার ডেলিভারি মডেল লঞ্চ করেছে। ই-ফুলফিলমেন্ট সেন্টার এবং রিটার্ন প্রসেস সেন্টারও ২০১৫য় পেটএমের বৃদ্ধিতে সাহায্য করেছে। পেটিএমের ভাইস প্রেসিডেন্ট রেনু সাত্তি বলেন, ‘লোকাল ডেলিভারি সংস্থার সঙ্গে গাঁটছড়া বেঁধে ডেলিভারি নেটওয়ার্কের পরিধি বাড়ানো আমাদের লক্ষ্য’।

ক্রেতাদের সন্তুষ্টির জন্য প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়াতে হবে। আশিস চিত্রভানসি, অপারেশনের ভাইস প্রেসিডেন্ট স্ন্যাপডিল স্ট্র্যাটেজিক টেকনোলজি এবং থার্ড পার্টি লজিস্টিকস পার্টনারের মাধ্যমে শিপমেন্ট ট্র্যাকিং ব্যবস্থার উন্নতি ঘটিয়েছে। অ্যামাজন বলছে, দ্রুত, বিশ্বস্ত ইন্টারনেট কানেকটিভিটির মাধ্যমে ভেহিক্যাল ট্র্যাকিং সহজ হয়েছে। দ্রুত ডেলিভারির জন্য কার্যকর রুট প্ল্যনিং এবং নিয়ন্ত্রণ খুব জরুরি। ২০১৫র সেপ্টেম্বরে পেটিএম সাপ্লাইচেনের জন্য টেক ইকোসিস্টেম পেতে লজিস্টিকস সলিউশন প্রোভাইডার লজিনেক্সটে বিনিয়োগ করেছিল। ফ্লিপকার্ট একইভাবে এই সুবিধা নিয়েছিল ব্ল্যাকবাকের কাছ থেকে। ‘তথ্য যোগাড়ে আরও দক্ষতা এবং নিয়মবদ্ধতা আনা আগামী বছরে আমাদের প্রাথমিক লক্ষ্য’, বলেন এককার্টের মুখপাত্র।

প্রযুক্তির উন্নতিতে বিক্রেতা, থার্ডপার্টি লজিস্টিক পার্টনার এবং বিক্রতাদের যোগাযোগে ম্যানুয়েল মেথডের ব্যবহার কমেছে। স্মার্টফোনে থ্রি-জি এবং ফোর-জির ব্যবহার বাড়ায় দ্বিতীয় এবং তৃতীয় শ্রেণির শহর থেকে অর্ডারের গতি পেয়েছে। স্ন্যাপডিল ৬০ থেকে ৭০ শতাংশ অর্ডার পেয়ে এই ক্ষেত্রে এগিয়ে, অন্যদিকে ফ্লিপকার্ট এইসব জায়গা থেকে অর্ডার পায় মাত্র ২০ শতাংশ। অপরিমিত কভারেজ সত্বেও বড় বড় ই-কমার্স সংস্থাগুলি দ্রুত ডেলিভারির মাধ্যমে পরিস্থিতি সামাল দেয়। নর্থইস্টের মতো জায়গাতেও যাতে ভালো পরিষেবা দেওয়া যায় তার জন্য স্ন্যাপডিল সাপ্লাইচেন তৈরি করেছে। ফ্লিপকার্ট দাবি করে, অংক কষে রুটিংয়ের ফলে তাদের ডেলিভারি এবং পিকআপ অন্য সংস্থার থেকে অনেক বেশি সঠিক এবং দ্রুত। ম্যাপমাইইন্ডিয়া-তে তাদের বিনিয়োগ এই ক্ষেত্রে অনেক বেশি সাহায্য করেছে। এককার্ট মুখাপাত্র জানান, ‘ঠিকঠাক ঠিকানার ডাটা ক্রেতা এবং বিক্রেতা দুপক্ষকে সঠিক ডেলিভারি এবং পিকআপে সাহায্য করে’।

আরও এক ধাপ এগিয়ে গ্রামীণ এলাকা এবং তৃতীয় ও চতুর্থ শ্রেণির শহরগুলিতে ডেলিভারির জন্য পাইলট প্রজেক্ট হিসেবে অ্যামাজন ইন্ডিয়া এনজিওকে কাজে লাগাচ্ছে। লজিস্টিক ফার্ম কানেক্ট ইন্ডিয়া ই-কমার্স প্রাইভেট লিমিটেড এবং BASIX গ্রুপের প্রতিষ্ঠাতার সঙ্গে সেতুবন্ধন গড়ে সাপ্লাই নেটওয়ার্ক চালু রেখেছে। গ্রামীণ এলাকাগুলিতে BASIX এর ডিস্ট্রিবিউশন নেটওয়ার্ককে কাজে লাগিয়ে একেবারে শেষ প্রান্ত পর্যন্ত ডেলিভারি করাই সংস্থার লক্ষ্য। অ্যামাজন ইন্ডিয়ার ট্রান্সপোর্টেশন ডিরেক্টর স্যমুয়েল থমাস জানান, ২০১৫তে সংস্থা ৬৫ শতাংশ অর্ডার পেয়েছে দ্বিতীয় এবং তৃতীয় শ্রেণির শহর থেকে। গ্রাম্য এলাকাগুলিতে ডিস্ট্রিবিউশন সেন্টার করার জন্য প্যাকেজিং, শিপমেন্ট চেকিং, মোবাইল অ্যাপের মাধ্যমে ডেলিভারি ট্র্যাকিং, ঠিক সময়ে ডেলিভারি দেওয়ার জন্য রুট প্ল্যানিংয়ের প্রশিক্ষণ দেয় অ্যামাজন। স্যামুয়েল জানান, প্রশিক্ষণের ফলে সেন্টারগুলিতে ডেলিভারির সংখ্যা পাঁচগুন বেড়ে গিয়েছে। প্রান্তিক এলাকাগুলিতে ডেলিভারির জন্য অ্যামাজনের ‘সার্ভিস পার্টনার’ প্রোগ্রামও চালু রয়েছে। এই প্রোগ্রামের মাধ্যমে ১০০টি স্যাটেলাইট শহর এবং দ্বিতীয় ও তৃতীয় শ্রেণির শহর ও গ্রাম কভার করা সম্ভব হয়েছে বলে জানান স্যামুয়েল।

ই-কমার্সে লজিস্টিকসের উন্নতির জন্য এই বছর টাকার জোয়ার লেগে যাবে। বিটুবি লজিস্টিকস স্টার্টআপ ব্ল্যাকবাকে বিনিয়োগ করে ফ্লিপকার্ট ঘোষণা করেছে আগামী ছার থেকে পাঁচ বছরে লজিস্টিকসে তারা ২.৫ বিলিয়ন ডলার লগ্নী করবে। অন্যদিকে গোজাভাসের সঙ্গে যুক্ত হয়ে প্রযুক্তি এবং লজিস্টিকস সেক্টরে ৬টি অধিগ্রহণ করে ডেলিভারি টাইম ৭০ শতাংশ কমিয়ে ফেলেছে।

২০১৫তে যে ট্রেন্ড দেখা গিয়েছে ২০১৬তেও তার অনেকটাই দেখা যাবে বলে মনে করা হচ্ছে। একার্ট মুখপাত্র বলেন, দ্বিতীয় ও তৃতীয় শ্রেণির উন্নত প্রযুক্তির সাপ্লাইচেন চালু হবে, পরিষেবায় দক্ষতারও প্রয়োজন বাড়বে। লজিনেক্সট এবং গ্রে অরেঞ্জের পর রোডরানার এবং ডেল্লিভারিও বড় বড় সংস্থাগুলির সঙ্গে গাঁটছড়া বাঁধতে চলেছে। অ্যামাজন, ফ্লিপকার্ট, স্ন্যাপডিল এমনকী পেটিএমও অফলাইনের বড় বড় সংস্থাগুলির দিকেও নজর দিচ্ছে। লক্ষ্য লজিস্টিকসে বিশ্বাসযোগ্যতা তৈরি করা।

লেখক-আথিরা নায়ার

অনুবাদ-তিয়াসা বিশ্বাস