নাটকীয়তায় ভরপুর ছিল ২০১৫-র স্টার্টআপ ভারত

0
মোটা অঙ্কের চেক, লগ্নি, হারানো-প্রাপ্তির মেলোড্রামা, কোথাও পড়ল ঝাঁপ, কোথাও গজাল নতুন স্টার্টআপ...

২০১৫ সালটা ভারতীয় অন্ত্রেপ্রেনিওরদের জন্য ছিল এমনই নাটক আর রোমাঞ্চে ভরপুর। তাই নতুন বছরে পা দেওয়ার আগে অন্ত্রেপ্রেনিওর, মেন্টর আর লগ্নিকারীরা কী কী অভিজ্ঞতার সাক্ষী হলেন সেদিকে চোখ রাখল ইওরস্টোরি।

বছরের শুরুতে দেখা গেছে সমস্ত স্টার্টআপ বিজনেস মডেল, ক্রেতার পছন্দ-অপছন্দ, অর্থনীতির হিসেবপত্তর গুলিয়ে দিয়ে লগ্নি টেনেছে। যে কোনও শর্তে বৃদ্ধির হারকে নির্দিষ্ট ব্যবসায়িক ছাঁচে ফেলাই ছিল মূল চ্যালেঞ্জ। এমনকি, স্টার্টআপের জগতে যেখানে উন্নয়নই শেষ কথা, সেখানেও দেখা গেছে মূলমন্ত্র শুধুমাত্র সংস্থার ঊর্ধ্বমুখী গ্রাফ নয়। দীর্ঘ মেয়াদে ব্যবসাকে দাঁড় করানোই মূল উদ্দেশ্য। তবে পরিবর্তনশীল হলেও লাভের মুখ দেখানোও কিন্তু সমানভাবে গুরুত্বপূর্ণ।

অমিত সোমানি, ম্যানেজিং পার্টনার, প্রাইম ভেঞ্চার পার্টনার্স

২০১৫ সালে লগ্নি, অর্থব্যয়, দেদার ছাড় এবং ক্রেতার গ্রহণযোগ্যতা বিশ্লেষণ, এই সমস্ত ক্ষেত্রে কোনও কমতি ছিল না। উৎপাদনের মানের চেয়ে কখনও কখনও বেশি গুরুত্ব পেয়ে গিয়েছিল টিম গড়ার তাগিদ। কিন্তু ছাড়ের লোভ না দেখিয়ে ক্রেতা টানার ঝোঁক চোখে পড়েনি স্টার্ট আপদের মধ্যে।

এছাড়াও বেশ কিছু অপ্রাসঙ্গিক এবং অস্বাস্থ্যকর প্রতিযোগিতা লক্ষ্য করা গেছে। দামের লড়াই বা ছাড় দেওয়ার অযথা অনর্থক হিড়িক আখেরে ক্ষতিই করেছে ব্যবসার। সেখানে মূল শর্তই হয়ে দাঁড়িয়েছিল কার পকেট কত ভারী। অথচ বাজেটের স্বল্পতা এবং মিতব্যয়িতাই কিন্তু স্টার্টআপের পরিচায়ক। ২০১৫-তে এই শব্দগুলোই কেমন যেন অপ্রাসঙ্গিক হয়ে গিয়েছিল।

আনন্দ লুনিয়া, প্রতিষ্ঠাতা, ইন্ডিয়া কোশেন্ট

সবাই যেখানে তথ্যপ্রযুক্তি এবং অ্যাপ নির্ভর স্টার্টআপ-এর কথাই বলছেন, আমি কিন্তু হার্ডঅয়্যর প্রযুক্তির কথাই বলব। এক্ষেত্রে BIRAC (Biotechnology Industries Research Assistance Council ) এবং তার সঙ্গী SRISHTI (Society for Research and Initiative for Sustainable Technologies and Institutions) -র উদ্যোগ প্রশংসনীয় । এই দুটি প্রতিষ্ঠান অন্ত্রেপ্রেনিওরদের উৎসাহ দেওয়ার জন্য সম্ভাবনাময় তরুণদের ২ বছর ধরে ১৫ লক্ষ টাকা করে ১৫ টি ফেলোশিপ প্রদানের কাজ শুরু করে। পাশাপাশি ১০০ তরুণ তুর্কিকে তাঁদের উদ্ভাবনকে পরবর্তী স্তরে নিয়ে যাওয়ার জন্য উৎসাহ দিতে ১ লক্ষ টাকা অর্থসাহায্য দেওয়ারও উদ্যোগ নেওয়া হয়। শিক্ষানবীশ অন্ত্রেপ্রেনিওর এবং হার্ডঅয়্যর টেকনোলজি স্টার্টআপদের বেশি করে উৎসাহ দেওয়ার ওপর জোর দেওয়াই কিন্তু গুরুত্বপূর্ণ।

একইসঙ্গে প্রশ্ন, স্টার্ট আপ ইন্ডিয়া, স্ট্যান্ড আপ ইন্ডিয়া নিয়ে এত ঢাক পেটানো সত্ত্বেও সেভাবে সরকারি তরফে তৎপরতা চোখে পড়ছে না। বিশেষত হার্ডঅয়্যর টেকনলজির ফ্রেশার কিংবা স্বনির্ভর ব্যক্তিদের উৎসাহ দিতে বিনিয়োগের উদ্যোগও বিরল।

এরকম চলতে থাকলে মেক ইন ইন্ডিয়াও ধাক্কা খাবে। আমাদের নিজেদেরই এই প্রশ্ন করা উচিত, কেন সমাজ এখনও নতুন প্রচেষ্টাকে স্বীকৃতি দিতে পিছপা হচ্ছে ? হার্ডঅয়্যর টেকনোলজিতে লগ্নির পরিসংখ্যানও শোচনীয়। বেশিরভাগ লগ্নিকারীই তথ্যপ্রযুক্তিতে বিনিয়োগে আগ্রহী, সেটা ভাল, কিন্তু হার্ডঅয়্যর টেকনোলজিরও কিছু লগ্নি প্রাপ্য।

অনিল কে গুপ্তা, পদ্মশ্রীজয়ী, প্রতিষ্ঠাতা, হানি বি নেটওয়ার্ক, এগজিকিউটিভ ভাইস চেয়ারম্যান, ন্যাশনাল ইনোভেশন ফাউন্ডেশন

২০১৫ উদ্ভাবনের দিক থেকে খরার বছর। একজনের আইডিয়া ক্লিক করে গেলেই বাকি ১৫ জনও লগ্নির আশায় ছুটেছেন সেই জায়গা দখল করতে। যেমন লজিস্টিকস, লাস্ট মাইল ডেলিভারি, ই-কমার্স, ফুডটেক। ডিজিটাল ইনোভেশনও পরীক্ষানিরিক্ষার পর্যায়। ডিজিটাল দুনিয়ায় ঝড় তুলতে হলে সোশ্যাল মিডিয়া, ক্লাউড, ডেটাকে সংঘটিত করতে হবে।

অঙ্কিতা বশিষ্ট, প্রতিষ্ঠাতা, সাহা ফান্ড

গ্রাহকদের অভিজ্ঞতা বিশ্লেষণেই সবথেকে কম গুরুত্ব দেওয়া হয়। অথচ ব্যবসার কিন্তু এটা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ দিক। লগ্নির দিক থেকে পিছিয়ে থেকেও গ্রাহকদের মন বোঝে যেই সংস্থা, দিনের শেষে তারাই এগিয়ে থাকে।

বছরের শুরুতে কিন্তু ব্যবসায় টাকা ঢুকেছে হুড়হুড় করে। কিন্তু লগ্নি সেই ফর্ম ধরে রাখতে পারবে কিনা তা নিয়ে বছর শেষে সন্দিগ্ধ আমরা। সংস্থার ঝাঁপ ফেলা কিংবা ব্যবসার ক্ষেত্র গুটিয়ে আনারও বহু নজির রয়েছে স্টার্টআপদের।

সাফল্যের টোটকাই হল, ক্রেতা বা গ্রাহকদের অগ্রাধিকার দিয়ে তাঁদের মুশকিল আসান করা। বাদবাকি সমস্যা আপনা আপনিই মিটে যায়। ব্যবসার এই মূল নীতিতে টিকে থাকা স্টার্টআপদের সবথেকে বড় চ্যালেঞ্জ। শুধুমাত্র বৃদ্ধিই যথেষ্ট নয়, ব্যবসায়ী নীতিকে সামনে রেখে বৃদ্ধির হার তরান্বিত করাই মূল মন্ত্র।

অপ্রমেয়া রাধাকৃষ্ণ, প্রতিষ্ঠাতা, ট্যাক্সি ফর শিওর, অ্যাঞ্জেল ইনভেস্ট

ডিজিটাল ইন্ডিয়া কনসেপ্ট ধীরে ধীরে ভিত শক্ত করছে ভারতে। ফলে লগ্নিকারীরাও সেদিকেই ঝুঁকছেন। আমার মতে, ২০১৫-য় সবথেকে সস্তা ও সহজলভ্য ছিল অর্থ। কিন্তু তাতে বাজার তার দিশা হারিয়েছিল। ‌যদিও ২০১৬-য় এই বদনাম ঘুচবে বলেই আমার আশা।

কাশ্যপ দেওরা, অন্ত্রেপ্রেনিওর, লেখক, দ্য গোল্ডেন ট্যাপ

২০১৫-য় স্টার্টআপরা, কর্মী নিয়োগের গুরুত্ব বুঝেছে। নিত্যদিনের চাপমুক্ত হতে অনেকেই কর্মসংস্থানের পথ প্রশস্ত করেছে। কিন্তু একটা কথা মনে রাখা দরকার, সাময়িক চাহিদা পূরণের জন্য সংস্থার কৃষ্টিকে বাজি রাখা বোকামো। তাই সঠিক ও যোগ্য লোককেই নিয়োগ করা উচিত।

সাহিল কিনি, ভাইস প্রেসিডেন্ট, আসপাদা ইনভেস্টমেন্ট

কল খুললেই জল পড়ার মতো সবসময় অর্থের জোগানও অফুরন্ত হয় না। তাই অর্থ আয় করার জন্যই অর্থ ব্যয় করে আয়-ব্যয়ের ভারসাম্য বজায় রাখতে হয়। ব্যবসা শুরু করার সময় এটা ধরে নিলে চলবে না যে সবসময়ই অপ‌র্যাপ্ত অর্থের জোগান বজায় থাকবে।

সুমের জুনেজা, প্রিন্সিপাল, নরওয়েস্ট ভেঞ্চার পার্টনার্স

লেখক সিন্ধু কাশ্যপ, অনুবাদ শিল্পী চক্রবর্তী