রাজনীতিতে কখনও সখনও মানুষ প্রায়োরিটি

0

আমরা-ওঁরার বিভেদের নাম দলাদলি। সেই বিভেদের উনোনে হাওয়া দেওয়ার নামই কেবল রাজনীতি নয়। কখনও সখনও রাজনীতিকরাও উপলব্ধি করতে পারেন মানবিকতা রাজনীতির চেয়ে দামি সম্পদ। সেখানে দলাদলির নোংরামি থাকে না। জাতিবর্ণ নির্বিশেষে কোনও রং না দেখে মানুষ যখন মানুষের পাশে এসে দাঁড়ায় তখন কুক্ষিগত রাজনীতি মিথ্যে প্রলাপ হয়ে যায়। সেখানে মানুষই সামনের সারিতে থাকে। রাজনীতির ব্যবসাদাররা চলে যান পিছনের সারিতে। অন্তত এমনটাই হল এই দমদমে।

রেল হকারদের সংগঠন ইস্টার্ন রেলওয়ে শিয়ালদহ ডিভিশন হকার্স ইউনিয়ন একটি রাজনৈতিক দলের গণসংগঠন। সংগঠনের কার্যালয় দমদম জংশন স্টেশনের ওপর। ওদের একটি মাঝারি মাপের ঘর আছে। সকাল থেকে রাত পর্যন্ত রাজনৈতিক কারণেই ব্যস্ত থাকে ঘরটি। রাত আটটার পরে ঘরটা অভাবী ফুটপাথবাসী কিশোরী মেয়েদের দখলে চলে যায়। প্রায় ৩০জন মেয়ে রাত আটটা থেকে পরদিন সকাল আটটা পর্যন্ত ইউনিয়ন রুমে থাকে। রাতের আশ্রয় ইউনিয়ন রুম। ফলে ওই মেয়েরা অনেকটা নিরাপদ বোধ করে। স্টেশন সংলগ্ন পথশিশুদের একটি স্কুলে ওরা এখন লেখাপড়া শিখছে। ছেলেমেয়েরা আগে রাস্তায় রাস্তায় ঘুরে বেড়াত। নানা রকম বদ নেশা করত। কৈশোর থেকেই জীবনটাকে নষ্ট করার প্রবণতা গড়ে উঠেছিল ওদের। তারপর যা হয়, একদিন জনসমাজের ভিড়ে অবহেলিত হতে হতে মাদকাসক্ত হয়ে পড়ত হয়তো। মেয়েরা চালান হয়ে যেত যৌনপল্লিতে।

ইস্টার্ন রেলওয়ে শিয়ালদহ ডিভিশন হকার্স ইউনিয়নের ওয়ার্কিং প্রেসিডেন্ট সুকুমার দাস বলছিলেন, দমদমের পথ শিশুদের স্কুলটি চালান এক দিদিমনি। তিনি যখন আমাদের কাছে এসে দরবার করলেন, ইউনিয়নের ঘরটায় মেয়েরা রাতে যদি আশ্রয় পায়। আমরা এককথায় রাজি হয়ে গিয়েছি।

ইউনিয়নের সদস্য সংখ্যা দমদম ‌ইউনিটে ৫৫০জন। সকলেই হকার। রেল হকারদের মধ্যে দুটি ভাগ আছে। যাঁরা স্টেশনে বসে সামগ্রী বেচেন তাঁদেরকে বলে সিটিং হকার। আর যাঁরা চলন্ত ট্রেনের কামরায় ঘুরে ঘুরে পণ্য বেচেন – কেউ ফলওয়ালা, কেউ ঝালমুড়ি কিংবা চা বেচেন অথবা সেফটিপিন থেকে হজমিগুলি বিক্রেতারা রানিং হ‌কার। সিটিং হকারদের মধ্যে ওঁরাও পড়েন যাঁরা স্টেশনের ঘুপচি দোকানে লটারির টিকিট বিক্রি করেন অথবা কচুরি-জিলিপির দোকান চালান।

ওঁ‌দের কয়েকজনের সঙ্গে আলাপ করে জানা গেল, দমদম স্টেশনে সিটিং হকার হিসাবে ব্যবসা করলেও প্রত্যেকদিন ওঁরা কেউ দক্ষিণ বা উত্তর ২৪ পরগনা, হাওড়া অথবা কলকাতা থেকে সামগ্রী নিয়ে দমদম স্টেশনে আসেন, বেচতে। বলাবাহুল্য, মানুষগুলি দিন আনা দিন খাওয়া। কারোরই বলবার মতো কোনও সঞ্চয় নেই। পরিবারের ভরণ পোষণ করতে যে টাকাটা লাগে উদয়াস্ত খেটে সে টাকাটাই মোটে রোজগার হয়। ওঁদের কাছে জমানোর মতো উদ্বৃত্ত টাকা বিলাসিতা।

অবশ্য ওঁদের তাতে কিছু যায়-আসে না। পেশায় রেলহকারদের সরকারি কোনও সামাজিক সুরক্ষা প্রকল্প নেই। অসু‌স্থ হলে অথবা অন্য কোনও বিপদে পড়ে টাকার প্রয়োজন হলে অসহায়তা ওঁদের গ্রাস করে ফেলে। তখন অনন‌্যোপায় হয়ে হাত পাততে হয়। ওঁরা জানেন, কত ধানে কত চাল। টাকা কত জরুরি জিনিস!

তাই যাঁদের এখন অবস্থা অসহনীয় – অধিকাংশেরই বার্ধক্য এসেছে। সেই মানুষটি আজীবন রেল হকার হিসাবে কাজ করার পরে বুড়়োবুড়ি হয়ে এখন কর্মক্ষমতা হারিয়ে রোজগার করার সামর্থ্য হারিয়েছেন। কেউ বা নিজে অসুস্থ অথবা পরিবারের কারও চিকিৎসার জন্যে মোটা টাকা জমিবাড়ি বেচে খরচ করছেন‌। তাঁদের পাশে আছে তাঁদের ইউনিয়ন। সংগঠনের ওয়ার্কিং প্রেসিডেন্ট জানালেন, ওঁদের ভিতর ১৫ জনকে কোনও রং বিচার না করেই প্রতি মাসে আমরা ৩০০ টাকা করে ভাতা দিচ্ছি। কোনও অনুদানের মাধ্যমে টাকাটা সংগ্রহ করা হয় না। আমরা নিজেরাই কেউ সিগারেট খাওয়া কমিয়ে কিংবা নিজের হাতখরচের টাকা থেকে কিছু টাকা ওঁদের জন্যে সাশ্রয় করে রাখি। ওঁদের হাতে মাস ফুরালে সে টাকাটা তুলে দিই। যে কয়েক জনকে আম‌রা সহায়তা দিই, তাঁদের মধ্যে ১২জনই বৃদ্ধ। বাকি তিনজন প্রতিবন্ধী। একজন অন্ধ, অন্য দুজনের হাত কাটা গিয়েছে।

মাসের প্রথম সপ্তাহে ওঁরা টাকা নিতে আসেন। ইউনিয়নের অফিসে সেদিন ওঁরা ভাতার টাকা নিতে এসেছিলেন। কোনওমতে খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে জীবন চলছে ওঁ‌দের। আমরা-ওঁরার রাজনৈতিক বিভেদ থাকলে মানুষ বঞ্চিত হত। হয়তো বা শেষ বয়সে ভিক্ষের পথে নামতে হত। কিন্তু প্রথমেই যে বলেছি, মানুষ কখনও সখনও রাজনীতিতেও প্রায়োরিটি পায়। তাই ওদের দর্শন ওরা নিজেরাই বেছে নিয়েছেন। বলছেন, সেবা হি পরমম ধর্মম। দমদমের পরোপকারী হকাররা তাই অন্য পথ মাড়াননি।