নেতাজী : লিভিং ডেঞ্জারাসলি- কিছু প্রশ্ন ,কিছু অজানা কথা

0


স্বাধীনতা উত্তর ভারতবর্ষের ইতিহাসে আজও সবচাইতে আলোচিত ও কুয়াশাঘেরা অধ্যায়ের নাম নেতাজী মৃত্যু রহস্য। ১৯৪৫ সালের ১৮ ই অগস্ট তৎকালীন তাইহোকু বা আজকের তাইওয়ানে বিমান দূর্ঘটনায় আদৌ নেতাজী সুভাষ চন্দ্র বসুর মৃত্যু হয়েছিল নাকি বিমান দূর্ঘটনায় সময়ের পরও বহুকাল জাতীর নায়ক জীবিত ছিলেন তা আজও অমীমাংসিত। ঐতিহাসিক নথি ও দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধোত্তর তৎকালীন আর্ন্তজাতিক ও জাতীয় রাজনৈতিক পরিস্থিতির নিরিখে এই রহস্যের সমাধানের প্রয়াস করেছেন প্রবীণ সাংবাদিক কিংশুক নাগ তার সাম্প্রতিক বই নেতাজী : লিভিং ডেঞ্জারাসলি তে। নেতাজী বিশেষঞ্জদের এবং ঐতিহাসিকদের একাংশ যে মতের সমর্থক অর্থাৎ বিমান দূর্ঘটনায় মত্যু নয় সেভিয়েত রাশিয়ায় ওমস্কে যুদ্ধবন্দিদের ক্যাম্প বা গুলাগ-এ (GULAG) যুদ্ধবন্দি রুপে নেতাজীর শেষ খোঁজ মিলেছিল , সেই তত্ত্বই তার বইয়ের মূল ভিত্তি। কিভাবে স্বাধীনতার পর তৎকালীন নেহেরু সরকার এই জাতীয় নায়কের অনুসন্ধানের ক্ষেত্রে নিষ্ক্রিয় থাকে । পরাধীন ও স্বাধীন ভারতে স্বাধীনতা সংগ্রামে কিভাবে বিভিন্ন সময় তার অবদানকে বিভিন্ন সময় অস্বীকার করার চেষ্টা হয়েছে সেই তথ্য অনুসন্ধানের প্রয়াস করেছেন কিংশুক।

সম্প্রতি কলকাতার টলি ক্লাবে নেতাজী বিশেষঞ্জ প্রফেসর চিত্রা ঘোষ ও ডঃ পূরবী রায় ও রাজ্যসভায় অল ইন্ডিয়া তণমূল কগ্রেসের নেতা সাসদ ডেরেক ওব্রায়েনের উপস্হিতিতে প্রকাশিত হল এই বইটি ও তার বঙ্গানুবাদ নেতাজী: অগ্মিপথে অশ্বারোহী । পশ্চিমবঙ্গ রাজ্য সরকার সম্প্রতি নেতাজী সক্রান্ত যে নথি প্রকাশ অনুষ্ঠানে মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় মন্তব্য করেছিলেন ১৯৪৫ সালের পরও সুভাষ চন্দ্র বোসের জীবিত থাকার সম্ভাবনার কথা। বইটির উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে এসে তাই সাংসদ ডেরেক ওব্রায়েন মন্তব্য করেন ‘এই সময়ই এই বইটির প্রকাশের সঠিক সময়।‘

ঐতিহাসিক তথ্য ঘেঁটে কিংশুক ১৯৪৫ এর আঠারোই অগস্ট তাইহোকুতে বিমান দূর্ঘটনায় নেতাজীর মত্যুর তত্ত্ব খারিজ করেছেন। নেতাজীর মত্যুরহস্যের কারণ জানতে গঠিত মূখার্জি কমিশনও অতীতে ২০০৫ সালে এই সিদ্ধান্তেই পৌছেছিল। কিন্তু কোনও অজানা কারণে তৎকালীন ইউ পি এক সরকার মুখার্জি কমিশনের রিপোর্টকে মান্যতা দেয়নি। ফলে স্বাধীনতার আগে ব্রিটিশ গর্ভমেন্টের তৈরী বিমান দূর্ঘটনার তত্ত্ব যা ১৯৫৬ তে নেহেরুর প্রধানমন্ত্রীত্ত্বকালীন গঠিত শাহনাওয়াজ কমিটি ও ইন্দিরা গান্ধীর প্রধানমন্ত্রীত্ত্বকালীন গঠিত ১৯৭০ এর এক সদস্যের জি ডি ঘোসলা কমিটির রিপোর্টে বলা হয়েছিল তাই চালানোর চেস্টা চলেছে। কিংশুক এর দাবী নেতাজী দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ শেষ হওয়ার পর সেভিয়েত বাহিনীর হাতে চীনের মাঞ্চুরিয়ায় আত্মসমপর্ণ করেন । তার স্বপ্ন ছিল আই এন এর পরাজয়ের পর রাশিয়ার মাটি থেকে নতুনকরে ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামের লড়াইএর প্রস্তুতি নেওয়া। কিন্তু স্তালীনের ভারতের স্বাধীনতা আন্দোলনের গতিপ্রকৃতি নিয়ে অজ্ঞতার সুযোগ নিয়ে ব্রিটিসেরা রাশিয়ার কাছে নেতাজীকে ব্রিটিশদের চর হিসাবে প্রোজেক্ট করে। সন্দেহের পরিবেশে শেষপর্যন্ত নেতাজীর ঠাঁই হয় রাশিয়ার দক্ষিণ পশ্চিমে অবস্হিত ওমস্ক শহরের একটি গুলাগে (Gulag ) বা যুদ্ধবন্ধীদের ক্যাম্পে। নেতাজীর বন্দিদশার কথা জানতে পারলেও তাকে ভারতে ফেরানোর কোনও চেস্টা করেনি ব্রিটিসরা। ভয় ছিল পাছে নেতাজী দেশবাসীর কাছে আরও বড় হীরো হয়ে যান ।আর ততদিনে ব্রিটিশদের ভারত ছাড়ার দিনক্ষ‌ণও চূড়ান্ত হয়ে গিয়েছে এপরিস্হিতিতে এই কাজ মূর্খামি বলে মনে করেছিলেন লর্ড ম্যাউন্টব্যাটেন। ১৯৪৭ এর ১৫ অগস্ট ভারতের আকাশে প্রথম সূর্যোদয়ের সময় রাশিয়ার ওমস্কে যুদ্ধবন্দী হিসাবেই কঠোর পরিশ্রম করে দিন কাটে ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামের এই অপরাজেয় সেনানীর । এর পরের ইতিহাস আরও রহস্যেঘেরা। কিংশুকের মতে এর পরে হয়ত কোনও এক সময় রাশি‌য়ার গুলাগ থেকে মুক্তি পান নেতাজী কিন্তু ততদিনে আমূল পরিবর্তন ঘটেছে তার জীবনদর্শণে ।এক নতুন আধ্ম্যাতিক সুভাষচন্দ্রের জন্ম হয়েছে । দেশে ফিরে ফৈজাবাদে ১৯৮৫ তে মৃত্যুর আগের দিন পর্যন্ত গুমনামি বাবা হিসাবেই লোকচক্ষুর আড়ালে জীবনের শেষ বছরগুলো কাটান সুভাষ চন্দ্র বোস। কিন্তু স্বাধীনতার পর কেনও নেতাজীর জীবিত থাকার সম্ভাবনার কথা জেনেও স্বাধীন ভারতের সরকার কেন তাকে ফেরানোর কোনও উদ্যোগ নে‌য়নি তা আমাদের নেতাজীর প্রতি জওহরলাল নেহেরুর উষ্মার কথাই মনে করা‌য় । যেকারণে আজও তিনি স্মৃতির গভীরে “নেতাজী দ্যা আনসাং হিরো ” হয়েই রয়ে যান । আর এখানেই কিংশুকের সাফল্য, শেষপর্যন্ত তার বইটি উত্তীর্ণ হয় নেতাজী বিষয়ক নিছক একটি নিরস গবেষণা গ্রন্থ থেকে একটি রসোর্ত্তীর্ণ সফল মরমী সময়ের দলিল রুপে।