সিভিয়ার CV কে সুস্থ করে তোলে ঋতির স্টার্টআপ

দশভুজা দেবী দুর্গাই বলুন আর সম্পদ সৃষ্টিকারী লক্ষ্মী প্রতিমা এই তো কদিন আগে আপনাদের সঙ্গে তাঁর আলাপ হয়েছে। বৃন্দা সরকার। এ সরকার জুয়েলারির মালকিন। এই নারী ঘর আর বাইরের জগত সব কীভাবে একা হাতে সামলাচ্ছেন সেকথা আগেই পড়ে ফেলেছেন আপনারা। 

2

এবার সাক্ষাৎ সরস্বতীর সঙ্গে দেখা হবে। বিদ্যার দেবী। বাংলার মেয়ে। গোটা বিশ্ব জুড়ে যার শিক্ষার অঙ্গন। যার প্রতিভার আলোর বিচ্ছুরণ চোখে ধাঁধা লাগিয়ে দিতে পারে। সেই স্নিগ্ধ অনন্যার নাম ঋতি রায়।

আপনি অনেক উদ্যোগপতির কাহিনি শুনেছেন। হাজার তিনেক কাহিনি একা আমিই এতদিনে বলে ফেলেছি। অনেক ই-কমার্স সার্ভিস প্রোভাইডার। ফুড স্টার্টআপ। টেকনোলজি গুলে খাওয়া ইনোভেটিভ আইডিয়ার হলুদ বাল্‌বে ঝলমল করে ওঠা আলোময় নানান কাহিনি। সেই সব কাহিনির অসাধারণ দুর্দমনীয় উদ্যোগপতিদের সঙ্গে ঋতির গল্পে কোথাও যেন একটা দূরত্ব আছে। ঋজু স্বভাবের মেয়েটি বলছিলেন তাঁর নিজের কথা।

দুর্গা পুজো মানে ঋতির কাছেও টক জলে চোবানো ফুচকা। ম্যাডক্স স্কয়ার, লেবুতলা পার্ক, মুদিয়ালি। বাড়ি ছাদে দেদার আড্ডা। বাবা মা বন্ধুদের নিয়ে খাওয়া দাওয়া আর হুল্লোড়। নতুন জামা। নতুন জুতো। নতুন গান। পুরনো স্মৃতি আর বই। আপনার পাশের বাড়ির শান্ত মেয়েটির মতোই একটি মেয়ে ঋতি। বয়স কত হবে আটাশ উনত্রিশ। ছটফটে ঋতি তবুও অনেক আলাদা। মডার্ন হাইস্কুলে পড়তেন। ছোটবেলা থেকেই পড়াশুনোয় তুখোড়। ছোটবেলা থেকেই তাঁর প্রতিভার হীরের দ্যুতি দেখেছিলেন বাবা-মা, শিক্ষক-শিক্ষিকারা। 

স্কুলের পর যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়। ইংরেজি সাহিত্যের ফার্স্টক্লাস ছাত্রী। স্নাতকোত্তর পড়াশুনো করতে চলে যান লন্ডন। লন্ডন স্কুল অব ইকোনমিক্স অ্যান্ড পলিটিকাল সায়েন্সে সামাজিক নৃতত্ত্ব নিয়ে মাস্টার্স করেন। 

লেজিসলেটিভ অ্যাসিস্ট্যান্ট টু মেম্বার্স অব পার্লামেন্ট ফেলোশিপ পান। সেই সুবাদে ডক্টর শশী থরুরের সঙ্গে কাজ করেন। সেই সময় ইউ পি এ সরকারে ডক্টর থরুর ছিলেন মানব সম্পদ উন্নয়ন মন্ত্রকের প্রতিমন্ত্রী। এই কাজটা করতে গিয়ে ভারতের রাজনীতি দেশ, কাল এবং দেশের পিছিয়ে থাকা জনজাতির নানান সুবিধে অসুবিধে নিয়ে গভীর ভাবে অনুধাবন করার সুযোগ আসে। LAMP ফেলোশিপের মেয়াদ ফুরনোর পর যোগ দেন একটি স্বেচ্ছাসেবী সংস্থায় প্রথম এডুকেশন ফাউন্ডেশন। এরই ফাঁকে এনতার ফ্রি-ল্যান্স করেছেন। যাদবপুরে পড়াকালীন কিংবা তার পরও। দেশে বিদেশে নানান পত্র পত্রিকায় লিখেছেন এই মেয়ে। লেখা তার সব থেকে পছন্দের বিষয়। অমর্ত্য সেন যাকে বলেন Argumentative Indian, ঋতি তাই। তর্ক, মগজের কাজ পেলে আর কিছু চাই না। এরই মধ্যে রিসার্চ অ্যাসোসিয়েট হিসেবে যোগ দেন হার্ভার্ড বিজনেস স্কুলে। বাংলাদেশের বৃহত্তম এনজিও BRAC এর একটি প্রকাশনায় সহ লেখক, গবেষক হিসেবে কাজ করে ফেলেছেন। কলোম্বিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের গ্লোবাল সেন্টারে সব থেকে কমবয়সী প্রোগ্রাম অফিসার হিসেবে কাজ করেছেন। কাজ করেছেন উইনিসেফের সঙ্গেও। সম্প্রতি ব্রিটিশ কাউন্সিলের সঙ্গে যুক্ত হয়েছেন। ইতিমধ্যেই এই বিদুষী মেয়ের মুকুটে এসেছে একের পর এক পালক Charles Wallace India Trust Fellowship, Seagull Foundation এর তরফ থেকে পেয়েছেন The Choice Fellowship, এছাড়া ল্যাম্প তো আছেই পাশাপাশি The Matador Network Travel Writing Scholarship এবং the Goethe-Institut/Zubaan fellowship এবং এটি দেওয়া হয়েছে সৃজনশীল সাহিত্যের জন্যে। সেই ঘুরিয়ে ফিরিয়ে লেখা, যা তাঁর জীবনের প্রথম পছন্দ।

ঋতি অনেক কাজের সঙ্গে নিজেকে জড়িয়ে রেখেছেন। নিজের পরিচয় দেন এডিটর, রাইটার, রিসার্চর এবং ট্যুর গাইড। বেরিয়ে পড়তে ভালোবাসেন। ছবি আঁকেন। গান করেন। তাও ধ্রুপদী। যে কাজে আগ্রহ পান সেই কাজের ভিতর নিজেকে ডুবিয়ে দিতে ভালোবাসেন এই মহিলা বাঙালি উদ্যোগপতি।

ঋতি বলছিলেন তাঁর উদ্যোগের কথা। নিজের পায়ে দাঁড়ানোর তাগিদের কথা। মেয়েদের দুরবস্থার কথা। বলছিলেন ওর চেনা পরিচিত বিভিন্ন নারীকে নির্যাতিত হতে দেখেছেন। দিনের পর দিন। শুম্ভ নিশুম্ভে ভরা এই দুনিয়ায় আরও বেশি করে মেয়েদের স্বনির্ভর হওয়া যে জরুরি সেটা টের পান। আর সেই থেকেই ২০১৪ সালে শুরু করে দেন তাঁর নিজের উদ্যোগ। অ্যাগলেট ইঙ্ক। কাজ করতে গিয়ে টের পেয়েছেন এমন অনেক মানুষ আছেন যারা হয়ত স্ব স্ব ক্ষেত্রে দারুণ দক্ষ, দারুণ যোগ্য কিন্তু আদৌ প্রভাব বিস্তার করতে পারে এমন সিভি তৈরি করতে জানেন না। প্রার্থী নির্বাচনে প্রথমে তো সিভিটাই সিভ বা চালনি তে ওঠে। ফলে সেখানে যদি বাদ পড়ে যান তাহলে তো আর চাকরির শিকে ছিঁড়বে না। এই অসুবিধেটা টের পান। শুরু করে দেন ইম্প্রেসিভ সিভি লেখার কাজ। সিভি, কভার লেটার, লিঙ্কড ইন প্রোফাইল লেখার স্টার্টআপ। সোশ্যাল মিডিয়ার ওয়াল থেকে ইন্টারভিউর টেবিল পর্যন্ত অ্যাগলেট ইঙ্ক পাশে থাকে। ব্যক্তিগত ব্র্যান্ড তৈরি করে দেয়। শুধু কি তাই প্রোডাক্টের ব্র্যান্ডিং কনটেন্ট তৈরি করার কাজও করেন ঋতি। এখন ওর ক্লায়েন্টদের তালিকা দেখলে চোখ কপালে উঠবে। এই তিন বছরে অজস্র ক্লায়েন্ট হ্যান্ডল করেছেন। কে নেই সেই লিস্টে! কলেজ পড়ুয়া ছেলেমেয়ে যেমন আছে তেমনি আছেন মিড কেরিয়ার পেশাদার। আছেন বহুজাতিক সংস্থার পদস্থ হোমরাচোমরা। সব ওর ক্লায়েন্ট। তাদের কেউ হয়ত Deloitte-এর কর্মী। কেউ Accenture, PWC, HSBC, Boston Consulting Group, Welspun Group, Discovery Channel India, Maersk Line আবার আছেন IIM কলকাতার কৃতীরাও।

ভালো ইংরেজিতে নির্ভুল সিভি লিখে ফেলাটাই তো শুধু নয়, সিভিতেই কর্মপ্রার্থীর স্ট্র্যাটেজির আভাস দেওয়ার কাজটাও করে অ্যাগলেট ইঙ্ক। অ্যাগলেট এই শব্দটির অর্থ, জুতোর ফিতের প্রান্তে যে প্লাস্টিক বা ধাতুর পাতলা পাতে মোড়ানো থাকে সেই টি। যার প্রয়োজন অপরিসীম, কিন্তু আলাদা করে প্রায় দেখাই যায় না।

ঋতি বলছিলেন এভাবেই নিজেদের প্রভাবটা বাড়িয়ে যেতে চান তিনি। মুম্বাইয়ে দফতর। সেখানেই থাকেন। তবে পুজোয় আসছেন কলকাতায়। চুটিয়ে ঘুরবেন প্যান্ড্যালে প্যান্ড্যালে। এই কোটি কোটি মানুষের ভিড়ে আপনি কি খুঁজে পাবেন এই বাগদেবীকে!