'অ্যাঞ্জেল' কোন অ্যাঙ্গেলে দেবদূত!

0

ইঞ্জিনিয়ারিং পড়ার শেষ বছরে আমার নিজের প্রথম সংস্থা RightHalf.com এ যখন রাকেশ মাথুর নামের জনৈক আইআইটি বম্বের প্রাক্তনী ২৫০,০০০ মিলিয়ন মার্কিন ডলার বিনিয়োগ করেছিলেন, তখনই আমি প্রথম ‘অ্যাঞ্জেল ইনভেস্টর’ কথাটি শুনি। এই ‘অ্যাঞ্জেল’ কথাটি যতদূর সম্ভব এসেছে ব্রডওয়ে থিয়েটার থেকে, যেখানে বিত্তশালী ব্যক্তিরা আর্থিক দৈন্যের কারণে বন্ধ হওয়ার মুখে চলে আসা নাট্যসংস্থাগুলিতে বিনিয়োগ করে সেগুলিকে উঠে যাওয়ার হাত থেকে বাঁচাতেন। সিলিকন ভ্যালি, যেখানে সফল উদ্যোগপতি এবং ধনী ব্যক্তিরা উঠতি, সম্ভাবনাময় উদ্যোগপতিদের পরিকল্পনা বাস্তবায়নে সাহায্য করতেন। ব্যক্তিগতভাবে অর্থের যোগান দিতেন সেখানেও এই শব্দটির ব্যবহার শুরু হয়। প্রদত্ত এই অর্থসাহায্য কিন্তু অনুদান নয়, কিংবা ব্যবসায়িক বিনিয়োগও নয়। বরং এটা বলা সঙ্গত হবে যে, শুরুয়াতি সংস্থাগুলিতে ‘অ্যঞ্জেল’দের বিনিয়োগের মূল উদ্দেশ্য নিছক আর্থিক লাভের আকাঙ্খাও নয়, বরং তার চেয়ে অনেক বেশি কিছু।  

আয়ারল্যান্ডের ডাবলিনে অনুষ্ঠিত হতে চলা একটি অ্যাঞ্জেল সামিটে যোগ দেওয়ার জন্য এই বছরের গোড়ার দিকে আমন্ত্রণ পাই। গতমাসের প্রথম দিকে এটি অনুষ্ঠিত হয় এবং বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে আসা কয়েকশো অ্যাঞ্জেল ইনভেস্টর এতে অংশগ্রহণ করেন। ‘ওয়েব সামিট’ নামের মূল উদ্যোগের অংশ ছিল এই অ্যাঞ্জেল সামিট, ২০১০ এ ৪০০ ডেলিগেটের অংশগ্রহণ দিয়ে শুরু হয়। সেই ওয়েব সামিটের ২০১৫ এর সম্মেলনে আমন্ত্রিতের সংখ্যা ছিল ৪০,০০০ এরও বেশি। অর্থাৎ, ২০১০ এর তুলনায় একশো গুণ। 

এই সামিটে বেশ কয়েকজনের সাথে আমার পরিচয় হয়। যেমন ইউ এস মেরিন কর্প এর প্রাক্তন এক কর্মী, যিনি উবেরের একজন অ্যাঞ্জেল ইনভেস্টর; একজন নন-টেক আন্তেপ্রেনিওর। যিনি এলন মাস্ক এর সোলার সিটি এর বোর্ড সদস্য ছিলেন; বেবো নামের এক কুখ্যাত সোশ্যাল নেটওয়ার্কিং সাইটের ফাউন্ডার; একজন আইরিশ রাগবি খেলোয়াড় যিনি বিভিন্ন শুরুয়াতি উদ্যোগে বিনিয়োগ করেন। এছাড়াও পরিচয় হয় আরো কয়েকজন অ্যাঞ্জেল ইনভেস্টরের সাথে। তবে নিজেদের ব্যক্তিগত অর্থ বিনিয়োগ করেন এরকম ইনভেস্টরের সংখ্যাটা এই সামিটে বেশ কমই ছিল। কারণ, আমি বুঝতে পারলাম যে এই সামিটের বেশিরভাগ অভ্যাগতই হলেন পেশাদার লগ্নিকারী, যাঁদের কাজ হল অন্য কারুর থেকে অর্থ নিয়ে সেটা শুরুয়াতি সংস্থায় প্রাথমিক মূলধন হিসাবে বিনিয়োগ করা। কিভাবে অ্যাঞ্জেল ইনভেস্টমেন্ট করা হয়, সেটা জানার জন্যই ওঁরা এই সামিটে এসেছিলেন।

দুপুরবেলা খাবার সময় অপ্রত্যাশিতভাবেই হাসিখুশি কয়েকজন ইংরেজের সাথে আলাপ হয়ে গেল। আমরা নিজেদের মধ্যে হাসি-ঠাট্টা করছিলাম। এঁদের মধ্যে একজন প্রাক-পরিকল্পনা স্তরে থাকা উদ্যোগপতিদের সাহায্য করে, এরকম একটি স্টার্ট-আপ অ্যাকসিলারেটর সংস্থার ম্যানেজার। আরেকজন নিজের পরিচয় দিলেন ‘ওয়েলথ্‌ ম্যানেজার’ হিসাবে। এবং জানালেন যে অ্যাঞ্জেল ইনভেস্টিং কিভাবে হয়, সেটা ওঁর মক্কেলদের হয়ে উনি শিখতে এসেছেন। এঁরা একে অপরকে নিয়ে মজাদার সব মন্তব্য করছিলেন -

“প্রাক পরিকল্পনায় বিনিয়োগ। তো কেউ যদি আপনার কাছে এসে বলে যে তার একটা ব্যবসার পরিকল্পনা আছে, তখন কি করেন আপনারা?” জিজ্ঞাসা করলেন একজন।

“দাঁড়ান। তার মানে অ্যাঞ্জেল ইনভেস্টমেন্ট এখন অ্যাসেট ক্লাস?” অপরজন উত্তর দিলেন।

“...তাতে অসুবিধা কোথায়?” প্রথমজন জিজ্ঞাসা করলেন। আমরা আড়চোখে একে অপরকে দেখছিলাম এবং ভাবছিলাম।

এঁদের সবার মধ্যে একমাত্র আমিই ছিলাম কিঞ্চিৎ বেমানান। কারণ এখানে আমি উদ্যোগপতি হিসাবে নিজের পরিচয় দিলেও ইনভেস্টরের ব্যাজের দাম কম হওয়ায় আমি এখানে এসেছিলাম ইনভেস্টর পরিচয় দিয়ে। আর তাছাড়া এই পরিচয়ের সুবাদে আমি গোটা সামিটের সর্বত্রই অবাধে প্রবেশ করতে পারছিলাম। দুপুরের খাওয়ার পর একটা বিতর্কসভা আয়োজিত হল, যার বিষয়বস্তু ছিল আমেরিকায় সদ্য পাশ হওয়া এক নতুন রেগুলেশান, যে রেগুলেশান অনুসারে এখন আমেরিকায় যে কেউ চাইলেই শুরুয়াতি উদ্যোগে বিনিয়োগ করতে পারবেন। ইতিপূর্বে বিনিয়োগের এই সুবিধা সংরক্ষিত ছিল কেবলমাত্র স্বীকৃত বিনিয়োগকারীদের জন্য। এখানে উপস্থিত ছিল অ্যাঞ্জেললিস্ট এর মত অনেকগুলি সংস্থা, যার মাধ্যমে কোনও শুরুয়াতি উদ্যোগে কেউ চাইলে এমনকি ১০০০ ডলারের মত ন্যুনতম অর্থও বিনিয়োগ করতে পারেন।

২০০৮ সালে, ভারতের সদ্য গড়ে উঠতে থাকা স্টার্ট-আপ অর্থনীতির পরিসরে প্রথম যখন ‘ইন্সটিটিউশনাল অ্যাঞ্জেল’ এর কথা জানতে পারি, সেইসময় বিষয়টাকে বেশ সন্দেহের নজরেই দেখেছিলাম। এর মূলে ছিল আমার দ্বিতীয় কম্পানি ‘চৌপাতি বাজার’ শুরু করার সময়ে ভারতের কিছু অ্যাঞ্জেল সংস্থার সাথে আমার ব্যক্তিগত সম্পর্কের অভিজ্ঞতা। যদিও আমেরিকায় কাজ করা একজন অ্যাঞ্জেল(আনন্দ রাজারামন) আমাকে সাহায্য করছিলেন, তা সত্ত্বেও আমি যোগাযোগ করেছিলাম ভারতীয় অ্যাঞ্জেলদের সাথে। এই দুধরনের অ্যাঞ্জেলের কাছে প্রত্যাশা এবং এদের কাজের ধরন সেইসময় আমার পক্ষে বোঝাটা একটু মুশকিল ছিল (এ বিষয়ে আরো অনেক তথ্য পাবেন ‘The Golden Tap’ নামের প্রকাশিত হতে চলা বইয়ে)। স্বাভাবিকভাবেই আমি সিলিকন ভ্যালিতে কাজ করা, বন্ধুতপূর্ণ স্বভাবের অ্যাঞ্জেলকেই আমার কাজের জন্য বেছে নিয়েছিলাম এবং ঠিক করেছিলাম যে কোনও অ্যাঞ্জেল সংস্থার কাছে আর কখনও যাবনা। আমি নিজেকে এটা বুঝিয়েছিলাম যে দ্বিতীয় সারির যেসব উদ্যোগপতি রয়েছে, যারা প্রকৃত অ্যাঞ্জেলের থেকে বিনিয়োগ যোগাড় করতে পারেননা, তারাই এই ধরনের সংস্থাগুলির কাছে যান এবং সেটাই হয়ে ওঠে তাঁদের উদ্যোগের ব্যর্থতার কারণ। ফলে একরকম দৃঢ়প্রতিজ্ঞ হয়েই প্রাথমিক কথাবার্তার পরই আমি এই সংস্থাগুলিকে আর কোনওভাবেই এগোনোর সুযোগ দিতে চাইনি। ‘অ্যাঞ্জেল’ এর মত পবিত্র কোনো শব্দের বদলে এই সংস্থাগুলির ক্ষেত্রে শকুনি, হাঙর প্রভৃতি শিকারি প্রাণীর উপমা আমার কাছে যথোপযুক্ত বলে মনে হয়েছিল। কিন্তু এর সাত বছর পর আজকের দিনে দেখুন – এখন সারা বিশ্বেই এ ধরনের গ্রুপ চলছে এবং আগামী দিনেও এগুলি চলবে।

বিবিধভাবে, বিভিন্ন প্রক্রিয়ায়, বিভিন্ন ছন্দে গড়ে উঠেছে এই অ্যাঞ্জেল ফান্ডগুলি। এর মধ্যে অনেকগুলিই সাফল্য অর্জন করতে সক্ষম হয়েছে। বলা যায় যে VC ও HNI এর পরিসরে এই ফান্ডগুলি নিজেদের জন্য একটা জায়গা তৈরি করে নিতে সক্ষম হয়েছে এবং পাশাপাশি এটা উদ্যোগপতিদের দিয়েছে প্রয়োজনমত বাছাই এর অনেক বেশি সুযোগ। সারা বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তেই অ্যাঞ্জেল ফান্ডগুলি বেশ উল্লেখযোগ্য সংখ্যক কম্পানি গড়ে তুলতে সক্ষম হয়েছে। যারা এখান থেকে বিনিয়োগ নিয়েছে এবং বিভিন্ন অঙ্কের ‘EXIT’ সম্ভব করেছে। ৫০০ টি শুরুয়াতি উদ্যোগ নিজেদের সাফল্যকে ‘pony’ (EXIT ১০০ মিলিয়ন মার্কিন ডলারের কম), Centaurs(EXIT ১০০ মিলিয়ন মার্কিন ডলারের অধিক) ও Unicorns(এক বিলিয়ন মার্কিন ডলারের বেশি, কোনো EXIT নেই) প্রভৃতি বর্গভুক্ত হিসাবে চিহ্নিত করেছে।

অধিকাংশ শুরুয়াতি উদ্যোগের মতই, অধিকাংশ অ্যাঞ্জেল ইনভেস্টমেন্টও ব্যর্থ হবে। কোনো VC যেভাবে প্রথম সারির লগ্নি টানতে পারবে, এরকম ব্র্যান্ড তৈরি করার মধ্যে দিয়ে সাফল্য অর্জন করে, অ্যাঞ্জেল ফান্ডের কাজের পদ্ধতিও সেরকম। এবং অ্যাঞ্জেল ইনভেস্টের মতই বিবিধ উদ্যোগগুলিও প্রাতিষ্ঠানিক রুপ নিচ্ছে। অভিজ্ঞতা থেকে বলা যায় যে বিনিয়োগের এই পরিসরে আগামীদিনে অনেক মানুষ এবং অনেক সংস্থাই হয়তো বিপুল আর্থিক ক্ষতির সম্মুখীন হবে। তবে যারা টিকে থাকতে পারবে, তারা কিন্তু সমৃদ্ধ করবে স্টার্ট-আপ ইকোসিস্টেমকেই।

সামগ্রিকভাবে বলতে গেলে, গত চারবছরে কিছু সংখ্যক (পরিসংখ্যানগতভাবে তা যদিও খুব একটা উল্লেখযোগ্য নয়) সংস্থার সাথে অ্যাঞ্জেল ইনভেস্টর হিসাবে কাজ করার অভিজ্ঞতা থেকে আমি যে উপলব্ধিতে এসেছি, তা হল - আমার সবচেয়ে সফল অ্যাঞ্জেল ইনভেস্টমেন্ট, তা সে সিলিকন ভ্যালিতে হোক কিংবা ভারতে – সম্ভব হয়েছে ব্যক্তিগতভাবে বিনিয়োগের মধ্যে দিয়েই। সবথেকে ভালো বিনিয়োগের সুযোগগুলি আমাকে যোগাড় করতে হয়েছে এবং উদ্যোপতিদের রাজি করাতে হয়েছে আমার থেকে লগ্নি নেওয়ার জন্য। অন্যদিকে অ্যাঞ্জেল গ্রুপগুলির মধ্যে দিয়ে যেখানে বিনিয়োগ করেছি, সেখানে তেমন সাফল্য পাইনি, এবং কিছুক্ষেত্রে ব্যর্থও হয়েছি। তাই আমি অ্যাঞ্জেল ফান্ডে বিনিয়োগ করা থেকে নিজেকে দূরে রাখাটাই পছন্দ করি।

(লেখক উদ্যোগপতি কাশ্যপ দেওরার ব্যক্তিগত মত। ইওরস্টোরির মতামতের এখানে উল্লেখ নেই। অনুবাদ – সন্মিত চ্যাটার্জী)