'বাপের বেটি' দেবস্মিতার মরমী তুলি গল্প বলে

0

শাবানা বাসিজকে দিয়েই বরং এই গল্প শুরু করা যাক। এই আফগানি মহিলা ইউসুফজায়ী নন। নোবেল পাননি। গুলি বিদ্ধ হননি। কিন্তু শাবানার জীবনেও তালিবানি অত্যাচার রেখাপাত করেছিল। শাবানার সময়ও মেয়েদের স্কুলে যেতে বাধা দেওয়া হত। কিন্তু নিজের মেয়ের পাশে থেকে তাকে স্কুলে পড়তে যাওয়ার সাহস জুগিয়েছিলেন শাবানার বাবা। তিনি শাবানাকে বলেছিলেন, "তালিবানরা তোমার কাছ থেকে সব কেড়ে নিতে পারে, কিন্ত তোমার জ্ঞান এবং শিক্ষা কোনওদিনও কাড়তে পারবে না।" এরপর শাবানা তাঁর স্কুলের পড়া শেষ করে আমেরিকা থেকে মাস্টার্স ডিগ্রি নিয়ে কাবুলে ফিরে আসেন। এখন সেখানে আফগান মেয়েদের জন্য একটি স্কুল চালান। তাঁর বাবা তাঁর পাশে না থাকলে শাবানা কোনওদিন এই কাজ করতে পারতেন না।

মেয়েদের জীবনে বাবার রোল নিয়ে সিগমন্ড ফ্রয়েড কী বলেন সেটা এ ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ নয়। বরং বাবা এই সম্পর্কটাই এমন ভাবে পৃথিবীর বিভিন্ন প্রান্তে মেয়েদের উদ্বুদ্ধ করেছে তা ক্রমানুসারে একটা কনটিনিউয়াস প্রলাপের মতো সুন্দর উপাখ্যান হতে পারে। প্রগলভ সেই উপাখ্যানের ছবি ও হতে পারে। শিল্পের ভাষায় অনেক না বলা কথা বলা যায়। বাবার বলা সবগুলো প্রেরণা জাগানো গল্প এঁকে রাখেন দেবস্মিতা দাশগুপ্ত। পেশায় নয়, নেশায় একজন চিত্রশিল্পী। বাবা-মেয়ের চিরন্তন এই সম্পর্কের গল্প আঁকেন। একটা দুটো করে শয় শয় গল্পে তাঁর 'My father Illustrations'-এখন মহাকাব্যিক আকার নিয়েছে।

মাস কমিউনিকেশনে স্নাতক দেবস্মিতা তাঁর স্পেশালাইজেশন করেছেন কমিউনিকেশন ফর নন-প্রফিট্‌স-এ। Oxfam এবং United Nations-এর মতো আন্তর্জাতিক সংস্থার সঙ্গেও কাজ করার অভিজ্ঞতা রয়েছে তাঁর। বর্তমানে তিনি সিঙ্গাপুরে থাকেন এবং Asia-Europe Foundation (ASEF)-এ কাজ করেন। আর তাঁর ব্যস্ত হাত এঁকে চলে তার ড্রিম প্রজেক্ট 'পিতা ণঃ অসি'র কাহিনি।

২০১০-এ 'কথা' নামে দিল্লির একটি প্রকাশনা সংস্থার সংস্পর্শে আসেন। সৌভাগ্যক্রমে ওই সংস্থার প্রতিষ্ঠাত্রী গীতা ধর্মরাজনের সঙ্গে আলাপ হয়। ওই বছরই ছিল রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ১৫০তম জন্মবার্ষিকী। গীতা এই উপলক্ষ্যে একটি বিশেষ বইয়ের সিরিজ প্রকাশের কথা ভাবছিলেন, যার মূল বিষয়বস্তু ছিল রবীন্দ্রনাথের লেখা কতটা সমসাময়িক তা তুলে ধরা। দেবস্মিতা বলেন. "গীতা আমাকে জিজ্ঞেস করেন এই বইগুলির মধ্যে কোনও একটির ছবির কাজ আমি করতে চাই কি না? আমিও সঙ্গে সঙ্গে রাজি হয়ে যাই। আসলে পরপর এতগুলো সংস্থার সঙ্গে কাজ করতে করতে সবসময়ই মনে হত, যদি নিজে কিছু করার সুযোগ পেতাম!"

ব্যস্‌, সেই থেকে শুরু। এরপর বিভিন্ন সংস্থার হয়ে ফ্রিল্যান্স ইলাস্ট্রেটরের কাজ করেছেন দেবস্মিতা। বাঁধাধরা চাকরির পাশাপাশি এখনও বিভিন্ন নন-প্রফিট অর্গানাইজেশনের হয়ে আলাদা করে এই কাজ করে চলেছেন তিনি।

তবে মাই ফাদার ইলাস্ট্রেশনের কাজটা শুরু হয়েছে একটু অদ্ভুত ভাবেই। বলতে বলতে ২০১৩-র একটা ঘটনার কথা বলছিলেন দেবস্মিতা। বলছিলেন টেড টকে শাবানার বক্তৃা শুনেই তার টনক নড়ে। উপলব্ধি হয় বাবা এই সম্পর্কটা কত মূল্যবান। এ এক এমন সম্পর্ক যা ভাষায় প্রকাশ করা যায় না। সেই সম্পর্কের দুনিয়া, যেখানে মেয়েরা সকলেই যেন এক একজন 'রাজকন্যে'। আর তাদের বাবারা, তাদের 'হিরো'। একটা বয়সে দেবস্মিতা ভাবতেন "Daddy's girl" হয়ে উঠতে পারলেই যেন জীবন সার্থক হয়ে যাবে। ছোট থেকেই, একটি শিশুকে মানুষ করার ক্ষেত্রে নামভূমিকায় সবসময় আমরা মায়েদেরই দেখি। তা সত্ত্বেও বাবার কাঁধে চড়ে খেলে বেড়ানোর স্মৃতিগুলো যেন বিশেষ। এমনসব মুহূর্ত তৈরী করে দিয়ে গেছে যা কখনও ভোলার নয়। অনেক অনেক বছর পর, স্মৃতির সরণীতে ফিরে তাকালে বোঝা যায়, "আসলে এটাই তো সেই মুহূর্ত যা একজন শিশুকে চোখ মেলে দেখার সাহস জোগায়। বিশ্বসংসারের মানবসমুদ্রে তাকেও নিজের স্থান তৈরী করে নিতে শেখায়।"

দেবস্মিতাও তাঁর বাবার অত্যন্ত কাছের মানুষ ছিলেন। শাবানার কথাগুলো তাঁর মনে গেঁথে গিয়েছিল। "২০১৩ সালে পরপর নারী নিগ্রহের বেশ কিছু ঘটনা সামনে আসতে থাকে। যার মধ্যে দিল্লি গণধর্ষণের মতো ন্যক্কারজনক ঘটনাও ছিল। সেই সময় মহিলাদের অধিকার রক্ষার্থে বেশ কিছু গ্রুপ তৈরী হয়। দেবস্মিতার মনে হতে থাকে, পুরুষদের ইতিবাচক দিকগুলোও সকলের সামনে উঠে আসা দরকার। বলছিলেন "শাবানার জীবনের ঘটনা সকলের জানা উচিত। সংবাদমাধ্যমে কাজের অভিজ্ঞতা থেকে আমি জানি, অনেকসময় নিজেদের ভালো-র জন্য তারা এইসব নেতিবাচক খবরই তুলে ধরে। আমার মনে হল আমার কিছু করা উচিত। আমি শাবানার কাহিনী ছবির আকারে তুলে ধরে ফেসবুকে পোস্ট করে দিলাম। শুরু হয়ে গেল আমার কাজ। ড্রিম প্রজেক্ট।" কীভাবে? 

শাবানার কন্ট্যাক্ট খুঁজে বের করে ওঁর সঙ্গেও ছবিটি শেয়ার করেন দেবস্মিতা। শাবানা সেটি তাঁর ছাত্রীদের ফরওয়ার্ড করেন এবং বহু আফগান পুরুষের কাছ থেকে ই-মেল পেতে শুরু করেন দেবস্মিতা। তাঁরা সকলেই তাঁকে ধন্যবাদ জানায়। তাঁরা বলেন এই প্রথম কেউ আফগানিস্তানের পুরুষদের ইতিবাচক দিকটি তুলে ধরার চেষ্টা করল। আফগানিস্তান থেকে একের পর এক কাহিনীর ইলাস্ট্রেশনের অনুরোধ পেতে শুরু করেন। তিনি উপলব্ধি করেন, "যদি শুধুমাত্র আফগানিস্তানেই বাবা-মেয়ের সম্পর্কের এমন অসাধারন সব কাহিনী থাকতে পারে, তাহলে গোটা বিশ্বে এমন ইতিবাচক ঘটনার সংখ্যা কত!"

দেবস্মিতা এরপর এধরণের গল্প খুঁজতে শুরু করেন। আর খুব আশ্চর্যভাবে, গল্পগুলোও কীভাবে যেন তাঁকে খুঁজে নিতে থাকে। "জানেন, একজন সম্পূর্ণ অপরিচিত কারও জীবনের কাহিনী যখন আমার ইনবক্সে এসে পৌঁছয়, একজন অজানা অচেনা ব্যক্তি যখন তাঁর জীবনের ভালোলাগার অনুভূতি আমাকে বলেন, এবং আমার মাধ্যমে সকলের সামনে তুলে ধরতে চান - সে এক অন্য অভিজ্ঞতা।" আর এভাবেই পথচলা শুরু করল আমার প্রজেক্ট 'মাই ফাদার ইলাস্ট্রেশনস'।

আমরা সঙ্গে সঙ্গে দেবস্মিতার বাবার সম্পর্কে জানতে চাইলাম। "বাবা আমাকে অনুপ্রাণিত করেন। তিনি একজন সাধারণ মানুষ এবং আমাদের পরিবারও অত্যন্ত সাধারণ, মধ্যবিত্ত। বাবা সরকারি চাকরির পাশাপাশি থিয়েটারও করতেন। এখন তিনি অবসর গ্রহণ করেছেন, কিন্তু এই বয়সেও পুরোদমে থিয়েটার করে চলেছেন। ছোটবেলা থেকেই বাবা আমাকে বলতেন, জীবনে 'ইঁদুর দৌড়'-এ কখনও সামিল হ'য়ো না, তুমি প্রথম হলে কিনা তাতে কিছু যায় আসে না। তুমি শিখেছো কিনা তুমি জানো কিনা সেটাই আসল। বাবা একজন খেলোয়াড় ছিলেন। তিনি আমাকে সবসময় বলতেন, তুমি যদি একজন অ্যাথলিট হও, তাহলে রেসে প্রথম হওয়া নয়, রেস শেষ করাই তোমার লক্ষ্য হওয়া উচিত। প্রথম স্থান কেউ পেয়ে গিয়েছে জেনেও কোনও অ্যাথলিট কখনও দৌড় থামায় না। নাহলে তারা ডিসকোয়ালিফাই হয়ে যাবে। তোমার জীবনও সেরকম হওয়া উচিত, যখন যে কাজ শুরু করবে, তা অবশ্যই শেষ করতে হবে।" বাবার বলা প্রত্যেকটা কথা এখনও মনে রেখেছেন দেবস্মিতা, সেই কথাগুলোর গুরুত্ব তাঁর জীবনে কতটা তা এখন উপলব্ধি করেন দেবস্মিতা।

২০১৩ সালে শুরু হওয়া ‘My Father Illustrations’-এর মূল লক্ষ্যই হল এই বিশেষ সম্পর্কের বিভিন্ন কাহিনী সকলের সামনে নিয়ে আসা। এর মধ্য দিয়ে আরও একটি কাজ করতে চান দেবস্মিতা। তা হল মেয়েদের বিভিন্ন অধিকারের জন্য লড়াইয়ে বাবাদের সামিল হতে উদ্বুদ্ধ করা। দেবস্মিতার কাছে রোজই এরকম কোনও না কোনও মানুষ তাঁদের জীবনের কথা তুলে ধরেন। দেবস্মিতা কিন্তু এর মধ্যে কোনও কাহিনীকেই 'না' বলেন না। তাঁর মতে, "প্রত্যেকটা গল্পই স্পেশাল। আমি সাধারণ মানুষের জীবনের কাহিনী খুঁজে বের করার চেষ্টা করি, কারণ সেলিব্রিটিদের জীবনের গল্প কোনও না কোনও ভাবে মানুষের কাছে ঠিক পৌঁছে যায়। আমি বিশেষ করে কোনও গ্রামের বা সমাজের পিছিয়ে পড়া মানুষের কথা জানতে এবং তা তুলে ধরতে চাই।"

এপর্যন্ত নিজের ইলাস্ট্রেশনের মধ্যে দিয়ে ৩৬ টি দেশের ১৫০-রও বেশি কাহিনী তুলে ধরেছেন তিনি। "আমি এই কাহিনীগুলিকে কোনও একটি জায়গায় আবদ্ধ করে রাখতে চাইনি। গোটা বিশ্বের সামনে এই গল্পগুলোকে তুলে ধরতে চেয়েছি," বললেন দেবস্মিতা।

Doodle with Dad

অনলাইন দর্শকের সীমিত সেই উপলব্ধি এবং জনগণের কাছে পৌঁছতে পারার ইচ্ছে থেকেই জন্ম ‘Doodle with Dad’-এর। দেবস্মিতা বলেন "আপনাকে একটি গোষ্ঠীর কাছে পৌঁছতে হবে এবং সেখানকার মানুষকে জিজ্ঞেস করতে হবে - আপনাদের কাহিনিগুলি কী কী?"

‘Doodle with Dad’ সেশনে দেবস্মিতা নিজে হাজির থাকেন। এখানে বাবারা এবং মেয়েরা একসঙ্গে আসেন তাঁদের গল্প ছবির আকারে তুলে ধরতে। "এটা শুধুমাত্র বাবা এবং মেয়েকে কাছে আনার জন্য নয়, শিল্পকে যোগাযোগের মাধ্যম হিসেবে ব্যবহার করার পাঠ শেখায় এই সেশন।" মুম্বইয়ে 'ম্যাজিক বাস' এবং 'লেহের'-এর মতো এনজিও এবং এনপিও দেবস্মিতাকে ‘Doodle with Dad’ -এর দুটি সেশন সফলভাবে আয়োজন করতে সহযোগিতা করেছে।

প্রথমদিকে এই উদ্যোগের সাফল্য সম্পর্কে দেবস্মিতা পুরোপুরি নিশ্চিত হতে পারেননি। "আমি একজন বহিরাগত, সকলের কাছে তাঁদের জীবনের কাহিনী জানতে চাইছি, কিন্তু তাঁরা আমাকে সব কথা বলবেন কেন? তারপর আবার আমি রবিবার, ছুটির দিনে ডেকে পাঠাচ্ছি।" যদিও প্রথম থেকেই পুরোপুরি সফল হয় এই উদ্যোগ। "আমি ভাবতেই পারিনি। এই বাবারা তাঁদের এত ভালোবাসেন এবং সম্মান করেন। তাঁরা চান তাঁদের মেয়েরা এগিয়ে যাক, পড়াশুনো করুক, এবং প্রতিটা ধাপে তাঁরা তাঁজের মেয়েদের পাশে থাকতে চান।"

দেবস্মিতা মেয়েদের পাশাপাশি বাবাদেরকেও তাঁদের ছবি আঁকায় সাহায্য করতে বলেন। তাঁর মতে,"আমি একবার মাত্র বাবাদের বলেছিলাম শুধুমাত্র মেয়েরা আঁকলে কিন্তু চলবে না, আপনাদেরকেও হাত লাগাতে হবে। ব্যস্ আর দেখে কে, বাবারা উৎসাহ নিয়ে বেশিরভাগটাই এঁকে ফেলেন আর কী!"  

আমরা দেবস্মিতার কাছে এমন একটি স্টোরি জানতে চাইলাম, যা তাঁর কাছে একটু বেশি স্পেশাল। যদিও তাঁর মতে, প্রত্যেকটি গল্পই স্বতন্ত্র। তবে একটি ঘটনা তাঁর মনকে বিশেষভাবে ছুঁয়ে গিয়েছিল। "একটি মেয়েকে পশ্চিমবঙ্গের একটি গ্রাম থেকে মুম্বই পাচার করে দেওয়া হয়েছিল। মেয়েটির বাবা তাঁকে ফিরে পেতে সমস্ত উপায়ে চেষ্টা করেছিলেন। তিনি তাঁর গ্রাম ছেড়ে মুম্বই চলে যান। মুম্বই পুলিসের সঙ্গে সমানতালে মেয়েকে খুঁজে বের করার চেষ্টা করতে থাকেন এবং অবশেষে সফল হন। কিন্তু সেখানেই তাঁর লড়াই শেষ হয়ে যায়নি। পাচারকারীরা তাঁর মেয়ের মুখের হাসি কেড়ে নিয়েছিল। তিনি তাদের শাস্তি দিতে বদ্ধপরিকর ছিলেন। তাঁর জীবনের তখন একটাই লক্ষ্য, মেয়ের হারিয়ে যাওয়া হাসি ফিরিয়ে দেওয়া।"

দেবস্মিতা সারা জীবন ধরে তাঁর ছবির মাধ্যমে এধরণের নানা গল্প বলে যেতে চান। "যখন আমি এই ছবিগুলি আঁকি তখন আমিও কিন্তু গল্পের সেই বাবা বা তাঁর মেয়ের মতোই খুশি হই। গল্পের গভীরে যেতে আমি বিশেষভাবে অভিব্যক্তির উপর নজর দিই।" 

আপনারও যদি এধরণের কোনও কাহিনী বলতে চান, তাহলে 'My Father Illustrations'-এর ফেসবুক পেজে যোগাযোগ করুন দেবস্মিতার সঙ্গে। আর যেসব বাবারা তাঁদের মেয়েদের 'রিয়েল হিরো', তাঁদেরকে ইওর স্টোরির স্যালুট।

Related Stories