বর্ধমানের রাম মালিকের কলকাতা জয়ের কাহিনি

1

রাম মালিক। নামটা খুব চেনা, তাই না? হ্যাঁ ঠিক ধরেছেন। মোহন বাগানের মিড ফিল্ডার। কলকাতা লিগে যার দু'পায়ের কারসাজিতে অবাক হয়েছিল ফুটবল দুনিয়া। তার সট থেকে বল যখন গোল পোস্টের জাল ভেদ করছিল আর চলছিল সবুজ মেরুন সমর্থকদের উন্মাদনা, করতালি, তখন কারো জানা ছিল না এই দুরন্ত ছেলেটার লড়াইয়ের আসল কাহিনি। জানা ছিল না কত অভাব আর প্রতিবন্ধকতা পেরিয়ে আজ কলকাতার মাঠ জয় করেছে বর্ধমানের প্রত্যন্ত গ্রামের এই ছেলে। আজ না হয় টাকা পয়সা নাম সব পেয়েছেন রাম কিন্তু শৈশব কেটেছে রীতিমত অনটনে।

বর্ধমানের জামালপুরের মাহিন্দ্রা গ্রামে ছোট্ট একটি মাটির ঘরে বেড়ে উঠেছেন রাম। ঘরের চাল মাথা নুইয়ে দিয়েছে। তাই লম্বা ছেলেটা কোনওদিন মাথা তুলতে পারবেন না অনেকেই একথা ভেবেছিলেন। কিন্তু অদম্য চেষ্টায় প্রতিবন্ধকতাকে স্লাইড ট্যাকেল করে স্বপ্নের গোলটা দিয়েই দিলেন রাম। 

ছোটোবেলাটা কেটেছে হ্যারিকেনের আলোয়। গ্রামে বিদ্যুৎ নেই। থাকলেও গরিবের জন্যে নয়। অভাবের সংসার। তাই ঠিকমতো স্কুলে যাওয়া হত না। দুবেলা দুমুঠোর জোগাড় করতে বাবা অজয় মালিকের সাথে মাঠে লাঙলের হাল ধরতে হত। পরের জমিতে চাষ করে যেটুকু আয় হতো তাতে কোনওক্রমে চলতো সংসার। তাবলে পড়াশোনায় ইতি টানেননি। চালিয়ে গেছেন লেখাপড়া। পাশাপাশি চালিয়ে গেছেন খেলাধুলাও। ছোট থেকেই ফুটবল খেলতে ভালবাসতেন রাম। মাঠের কাজ সেরে বাড়ি ফিরে পাড়ার মাঠে ফুটবল নিয়ে নেমে পড়তেন। নিত্য অভাব। তবু বুঝে গিয়েছিলেন গেম চেঞ্জার হতে গেলে বড় ফুটবলার হতেই হবে। স্বপ্নটা শুধু দেখতেন না নিজেকে তৈরিও করেছেন সেভাবেই। জেদ আর ইচ্ছাশক্তি রামকে তার লক্ষ্যে পৌঁছে দিয়েছে।

কাজটা সহজ ছিল না। স্কুল ও স্থানীয় ক্লাবের খেলায় বরাবরই নজর কেড়ে ছিলেন ছেলেটি। কিন্তু কলকাতা থেকে প্রায় ৮০ কিলোমিটার দূরে এই গ্রামে বসে বড় ক্লাবে খেলার সুযোগ পাওয়াটাই কঠিন ছিল। কাকার সাথে জৌগ্রামে ফুটবল ক্যাম্পে যেতেন। সেখান থেকে দুর্গাপুরে মোহনবাগান আকাডেমিতে কোচিং এর সুযোগ পান। এই প্রতিভাবান ফুটবলারকে চিনতে ভুল করেননি সেই সময়কার মোহনবাগান কোচ করিম বেঞ্চারিফা। কলকাতা লিগে খেলার সুযোগ পেলেন। ভুল করেননি রাম। যেন একটাই লাইফটাইম একটাই চান্স। নিজেকে উজাড় করে দিলেন। পা দিয়ে যেন আগুন জ্বলছিল। নিজেকে প্রমাণ করতে পেরেছিলেন রাম। তাই আর পিছন ফিরে তাকাতে হয়নি।

অসম্ভবকে সম্ভব করে দেখিয়েছেন। এখন আর ঘাঁড় গুজে ঘরে ঢুকতে হয় না। কলকাতায় থাকেন ঝাঁ চকচকে ফ্ল্যাটে। মাথা তুলে বলেন তিনি গ্রামের ছেলে। তাঁর শিকড় তাঁকে টেনে নিয়ে যায় জামালপুরের দিনগুলোয়। টুর্নামেন্টের ঠাসা কর্মসূচির মাঝেও সুযোগ পেলেই ছুটে যান গ্রামের বাড়ি। সেখানেই তো লুকিয়ে আছে জীবনের ম্যাচে ডজ-ড্রিবল-স্লাইড ট্যাক্‌লের স্কিল। রাম স্বপ্ন দেখছেন ক্লাবে খেলার পাশাপাশি দেশের হয়ে খেলবেন। ওঁর সাফল্যের জন্যে শুভেচ্ছা রইল টিম ইওর স্টোরির।