অবিনাশের এখন ফিটনেস ট্রেনার আছেন

0

চড়িয়াল বাজার। দক্ষিণ ২৪ পরগণার বজবজ স্টেশন থেকে অটোরিকশায় প্রায় এক ঘণ্টার পথ। সাইকেলে গেলে সময় আরও বেশি লাগে। বাজারের মুখে, রেল স্টেশন থেকে বড় রাস্তা যেখানে গিয়ে পড়েছে সেখানে তিনি বসেন। প্রত্যেকদিন। তার দোকানটা এখন বেশ বড়। বাইশ বছর আগে যখন শুরু করেছিলেন তখন খুবই ছোট ছিল। রাস্তার ধারে মাটিতে প্লাস্টিক পেতে বসা। মাঝে মাঝে গাড়ির চাকা সেই প্লাস্টিক মাড়িয়েও যেত। অনাদর, অবহেলা আর উপেক্ষার যন্ত্রণা নিয়ে তিনি- শ্যাম রুইদাস তার জুতো সেলাইয়ের সরঞ্জাম নিয়ে বসতেন রোজ। ভাবতেন ছেলেটা যদি মানুষ হয়।

ছেলে মানে বড় ছেলে, অবিনাশ রুইদাস। গত বছর ফেব্রুয়ারি মাসে আই লিগে ১৮ বছরের ছেলেটা প্রথম বড়দের সঙ্গে মাঠে নেমেই গোল করে ফেলেছিল স্পোর্টিং ক্লুব দ্য গোয়ার বিরুদ্ধে, ব্যাস। অবিনাশের এসবেস্টসের চাল লাগানো হাড়জিরজিরে বেড়ার ঘর দেখতে পরের দিন সকালেই কলকাতা থেকে ছুটেছিলেন সাংবাদিক-দল। দারিদ্র একটি দ্রষ্টব্য বিষয়। আর সেখানে যদি তারা নেমে আসে তাহলে তো আর কথাই নেই। নায়াগ্রা দেখার উৎসাহ নিয়ে ছোটেন মানুষ। খুব চেষ্টা ছিল অবিনাশকে রাতারাতি সেলেব্রিটি বানিয়ে দেওয়ার। কিন্তু সে আশায় ছাই ফেলে দিলেন রুইদাস। দেবেন না-ই বা কেন? তার জীবন থেকে তখনও তো যায় নি দারিদ্র্যের সাথে লড়াই করে বেঁচে থাকার যন্ত্রণা। বাবা শ্যাম রুইদাস পেশায় মুচি। বাড়িতে স্ত্রী আর অবিনাশ ছাড়াও আরও একটি ছেলে। অর্থাভাব এত যে মাঝে মাঝে অবিনাশের ভাই স্কুলেও যেতে পারেননি। আর অবিনাশ? বলল, “পুষ্টিকর খাবার? ছেড়ে দিন। ছোলা আর আখের গুড় ছিল ছোট থেকে আমার একমাত্র পুষ্টিকর খাবার।” প্রত্যেকদিন কাকভোরে শ্যাম তার বড়ছেলেকে নিয়ে মাঠে যেতেন। সেই থেকে ফুটবল হল অবিনাশের প্যাশন। ভবিষ্যতে ফুটবলকে ঘিরেই একটু সচ্ছল ভাবে বেঁচে থাকার স্বপ্নের সেই শুরু। কিন্তু শুধু প্র্যাকটিস করলে তো আর হবে না। পুষ্টিকর খাবারের সাথে চাই একজোড়া ভাল বুট। ভাল বুট? অবিনাশ হেসে বলল, “বজবজ ফুটবল অ্যাকাডেমিতে প্রথম যেদিন বাবা নিয়ে গিয়েছিলেন, ওখানকার কোচকে বলেছিলেন ছেলে এখন খালি পায়েই শুরু করবে।” শ্যাম রুইদাসও মাথা নাড়ছেন। বললেন, “জুতো সেলাই করে আর কতই বা রোজগার হয়?”

একদিকে তীব্র অনটনের জ্বালা। অন্যদিকে ফুটবলকে আঁকড়ে ধরার তীব্র খিদে। সংসার সামাল দিতে গিয়ে শ্যাম রুইদাস কে তার একমাত্র পৈত্রিক জমিটা বিক্রি করে দিতে হয়। মাত্র দেড় কাঠা জমি। শ্যাম রুইদাস ভেবেছিলেন কিছুই তো নেই, জমিটা যদি রেখে দেওয়া যায়। অথবা ওই জমিতেই যদি একটা বাড়ি করা যায় ভবিষ্যতে। ওই দেড় কাঠা জমির পাসের অংশ যেখানে অনির্বাণদের বেড়ার ঘর, এবছর সেই ঘরেই উঠেছে পাকা দেওয়াল। কিন্তু ওই পর্যন্তই। জমি বিক্রির প্রায় পুর টাকাই শ্যাম রুইদাস দিয়ে দিয়েছেন তার বড় ছেলের ফুটবলে। অবিনাশের জীবনে বুটজোরা এলো। পরনে এলো জার্সি আর একজোড়া প্যান্ট। অবিনাশ বলল, “গতবছরটা ওই একজোড়া জার্সি আর প্যান্ট পরেই খেলে গিয়েছি।” প্রত্যেকদিন প্রাকটিস সেরে ফিরেই একটা সেট জামা, প্যান্ট কেঁচে রাখতাম।” বজবজ অ্যাকাডেমি থেকেই অবিনাশ রুইদাসের ফুটবল জীবনে উত্তরণ হয় জুনিয়র ইস্টবেঙ্গলে। যেখানে কোচ, ইস্টবেঙ্গলের প্রাক্তন আন্তর্জাতিক ফুটবলার তরুণদের প্রশংসা ও স্বীকৃতি নিয়েই সিনিয়র ইস্টবেঙ্গলে অবিনাশের সই করা। গত মরশুমের আই লিগ শুরু হওয়ার আগে। প্রায় পাঁচ ফুট উচ্চতার লিকলিকে শরীরটা নিয়ে অবিনাশ যখন মাঠের বাঁ প্রান্ত ধরে দৌড়ায় তখন তার মাথায় কোন ছবিটা ভাসে?

অবিনাশ বলল, “একটা দিন দেখতে চাই যেদিন বাবাকে প্রত্যেকদিন ভোরে উঠে আড়াই কিলোমিটার হেঁটে গিয়ে দোকান খুলতে হচ্ছে না।” সেইদিন খুব দূরেও হয়তো নয়। চলতি মরশুম শুরু হবার পরেই তার বাবাকে একটা নতুন সাইকেল কিনে দিয়েছেন ইস্টবেঙ্গলের তরুণ তুর্কী। আগামী মরশুম শুরু হওয়ার পর বাবাকে বলবেন "আর দোকানে যেও না। তোমাকে আর জুতো সেলাই করতে হবে না।”

মারাদোনার অন্ধ ভক্ত অবিনাশ। কিন্তু তার হাতে চে গেভারার ট্যাটু কেন? অবিনাশের জবাব, “স্যরের কাছে শুনেছি Che একজন ভীষণ সত মানুষ ছিলেন। সত না হলে সফলও হওয়া যায় না।” এই স্যর কে? চিন্ময় বন্দ্যোপাধ্যায়। বজবজ অ্যাকাডেমির প্রধান কোচ। যে ফুটবল স্কুলে শুরু হয়েছিল অবিনাশের খেলার পাঠ। শুধু ইস্টবেঙ্গল নয় দেশের হয়ে খেলাও এই ১৯ বছরের ফুটবলারের স্বপ্ন। কিন্তু শরীরের ওজন যে এখনও পর্যাপ্ত নয়। মাত্র ৪৫ কিলোগ্রাম। এই শরীর নিয়ে কতদূর আর উন্নতি করা যাবে? ইন্টারনেটের মাধ্যমে নিয়মিত বিদেশী ফুটবলের খোঁজ নেন অবিনাশ। এবছর থেকেই সে তাঁর বজবজ অ্যাকাডেমির স্যর কে জিগ্যেস করে একজন নিউট্রিশিয়ান এক্সপার্টের কাছ থেকে ডায়েট চার্ট বানিয়ে এনেছেন। আরও একটা কাজ করতে চলেছেন, একজন ব্যক্তিগত ফিটনেস ট্রেনরও রেখেছেন। বাংলার ফুটবলে তার প্রজন্মের ফুটবলারদের মধ্যে এটা একটা বিরল ঘটনা। আগামী মরশুমে অবিনাশের সামনে একাধিক লক্ষ্য। আরও ভাল খেলে বেশি টাকা রোজগার করা। যাতে বাবাকে আর দোকানে গিয়ে বসতে না হয়। দ্বিতীয় লক্ষ্য, জাতীয় দলে সুযোগ করে নেওয়া। বাড়ির পাকা দেওয়ালের উপর অ্যসবেস্টসের চালটা সরিয়ে পাকা ছাদ দেওয়া। আরও একটা ইচ্ছা আছে অবিনাশের। ঘরে একটা শীততাপনিয়ন্ত্রিত যন্ত্র বসানো। অবিনাশ বলছে, সাধনায় ফাঁকি না দিলে সবই হবে আমি জানি।

Related Stories
পুরুলিয়ার মাটি জানে লক্ষ্মী মাণ্ডির স্ট্রাইড

অ্যাথলিট তৈরির কারখানা চালান দ্রোণাচার্য কুন্তল

ঘুরে দাঁড়ানোয় অপরাজিতা বাংলার পৌলমী