দৃষ্টিহীনদের জন্যে বাঙালি দম্পতির স্টারফিশ

0

'দু'বছর আগে আমরা তখন বস্টনে। শীতের এক সকালে আমি আর আমার স্ত্রী (সৌমিতা) আমন্ত্রিত হয়েছিলাম দৃষ্টিহীনদের নিয়ে একটি Job Fair ক্যামেরাবন্দি করার জন্য',বললেন প্রজেক্ট স্টারফিশের প্রতিষ্ঠাতা, মেন্টর তথা ট্রেনার শুভাশিস আচার্য।'একজন ভারতীয় হিসাবে আমি ক্যামেরাবন্দি করতে চেয়েছিয়াম যাতে অন্য দৃষ্টিহীনরাও জানতে পারে এইসব দৃষ্টিহীনরা কীভাবে বাধার পাহাড় সরিয়ে এমন একটা জায়গায় পৌঁছেছেন।আমি নিজেও উত্তেজনা অনুভব করছিলাম যখন দেখলাম এইসব দৃষ্টিহীনরা হাতে বায়োডেটা নিয়ে লাইনে দাঁড়িয়ে।নিয়োগকর্তাদের সামনে তাঁরা তাঁদের দক্ষতা তুলে ধরতে চায়। কিন্তু আশ্চর্য হয়ে দেখলাম দেড়শোর মতো শিক্ষিত এইসব কর্মপ্রার্থীদের মধ্যে কাউকেই পছন্দ হল না নিয়োগকর্তাদের। এটা আমার জীবনের মোড় ঘুরিয়ে দিল। সেই প্রথম দেখলাম শারীরিক প্রতিবন্ধকতার সমস্যা'।সেই সময় থেকেই তাঁর স্বপ্ন দেখা শুরু। দৃষ্টিহীনদের জন্য এমন একটি প্ল্যাটফর্মের ব্যবস্থা করতে হবে যেখানে তাঁরা প্রয়োজনীয় অভিজ্ঞতা অর্জন করতে পারবে। এমন অভিজ্ঞতা যা নিয়োগকর্তারা চাইছেন। একটা বিশ্বজনীন ইউনিক মডেল, যা নিয়োগকারী এবং কর্মপ্রার্থী, দু'জনের প্রয়োজনই মেটাবে। কোনও দয়াদাক্ষিণ্য নয়, এই প্ল্যাটফর্ম এমন হবে যা দাঁড়িয়ে থাকবে ব্যবহারকারীদের দক্ষতা ও প্রতিভার ওপর। সেই ভাবনারই ফসল Project Starfish.


স্ত্রী সৌমিতার সঙ্গে শুভাশিস আচার্য
স্ত্রী সৌমিতার সঙ্গে শুভাশিস আচার্য

চাকরি পেতে গেলে চাই কাজের অভিজ্ঞতা। দৃষ্টিহীনদের পক্ষে সেই অভিজ্ঞতা অর্জন সহজে সম্ভব নয়। ফলে ডিগ্রি থাকলেও কাজ মেলে না। পরিসংখ্যান বলছে বিশ্বজুড়ে এই ধরনের দৃ্ষ্টিহীনতার সমস্যায় ভুগছেন প্রায় ২৫ কোটি মানুষ।সেই সংখ্যাটাও ক্রমশ বাড়ছে।আমেরিকায় দৃষ্টিহীনদের ৮০ শতাংশের ক্ষেত্রে রোজগারের একমাত্র মাধ্যম হল সামাজিক সুরক্ষায় সরকারি অনুদান। বিশ্বের বাকি অধিকাংশ দেশে সেটাও নেই। বেঁচে থাকার একমাত্র পথ অন্যের দয়াদাক্ষিণ্য।রয়েছে আরও বিভিন্ন ধরনের শারীরিক প্রতিবন্ধকতা।তাঁরাও ভুগছেন অর্থের সমস্যায়। তাঁদের আমরা সহানুভূতি বা অনুপ্রেরণা দেওয়ার চেষ্টা করলেও সমস্যার সুরাহা হবে না। হবে তখনই যখন আমরা তাঁদের জন্য আর্থিক স্বনির্ভরতার একটা মঞ্চ তৈরি করে দিতে পারব। যেখানে অন্যদের মতো তাঁরাও সমান সুযোগ পাবেন। মেলে ধরতে পারবেন তাঁদের দক্ষতা। আর তা না হলে কোনও কিছুই পরিবর্তন হবে না।

সেই পরিবর্তনের ভাবনা থেকেই শুভাশিস চালাচ্ছেন প্রজেক্ট স্টারফিশ। শুভাশিস বলেন,'যাঁরা আমাদের শর্ত পূরণ করতে পারবেন তাঁদের সকলের জন্যই সমান সুযোগ রয়েছে স্টারফিশে।আমাদের এমন এক প্রশিক্ষণ পদ্ধতি রয়েছে যাতে কয়েক সপ্তাহের মধ্যে সদস্যদের দক্ষতা বাড়ানো যায়। এজন্য আমরা কোনও ডোনেশন নিই না। আসলে আমরা বাঁচতে শেখাই, বাঁচিয়ে রাখায় আমরা বিশ্বাসী নই। কোনওরকম ফান্ডিং ছাড়াই কিন্তু আমরা আন্তর্জাতিক একটা সংস্থা গড়ে তুলতে পেরেছি'। আমরা শুনে আশ্চর্য হয়ে গেলাম যে শুভাশিস ছাড়া তাঁর টিমের বাকিরা কেউই চোখে দেখতে পান না।


শুভাশিসের সংস্থায় যাঁরা প্রশিক্ষণ নিতে আসেন তাঁদের মধ্যে উচ্চশিক্ষিত যেমন রয়েছেন, তেমনই আছেন কমশিক্ষিত বা নিরক্ষররা। এমনও অনেকে রয়েছেন যাঁদের পিএইচডি, এমবিএ বা মাস্টার্স ডিগ্রি রয়েছে। এদের সকলকে নিয়েই একটি ব্যবসায়িক পরিমণ্ডলে পুরো বিষয়টি পরিচালিত হয়।কোন ক্ষেত্রে গেলে বা কী করলে কাজ মিলবে, সেটারই প্রশিক্ষণ চলে।এজন্য বিভিন্ন ক্ষেত্রের প্রফেশন্যালসদের ফ্যাকাল্টি হিসাবে কাজে লাগান হয়। দক্ষতা বৃদ্ধির এই সাধনায় প্রজেক্ট স্টারফিশের লক্ষ্য ৫ বছরের মধ্যে কমপক্ষে হাজার সদস্যকে আর্থিক স্বনির্ভরতায় পৌঁছে দেওয়া।

বাজার কী চাইছে? নলেজ ইন্ডাস্ট্রি কী চাইছে?সেলস গ্রুপ কী চাইছে? গবেষণামূলক ক্ষেত্র কী চায়? সেটাই ভালোভাবে বুঝে নিতে চেয়েছে প্রজেক্ট স্টারফিশ। সেভাবেই তৈরি করা হচ্ছে সদস্যদের। যে কোনও লিখিত আর্টিকেলের জন্য প্রয়োজন প্রুফ রিডিং। এজন্য স্ক্রিন রিডারের মাধ্যমে তৈরি করা হচ্ছে সদস্যদের। রিক্রুটমেন্ট এজেন্সিগুলির জন্য তথ্যগত সহায়তার কাজ।সেখানেও সফটওয়্যারের মাধ্যমে প্রশিক্ষণের কাজ চলছে।সেই প্রশিক্ষণের কাজে রোজ দুপুরের পরে ৬-৭ ঘণ্টা দিয়ে থাকতেন শুভাশিস। তার আগে সকালে চাকরি করতেন। এভাবেই একসময় মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে যথেষ্ট সাড়া ফেলে দেয় স্টারফিশ।শুভাশিসের কথায়,'দুটো জিনিস বুঝেছি।মানুষ আর আস্থাই হল বিশ্বের একমাত্র কারেন্সি। আর আপনি যখন নিজের ওপর পরিপূর্ণ আস্থা নিয়ে কোনও কিছু এগিয়ে নিয়ে যাবেন, লোকে আপনাকে বিশ্বাস করবেই'।

সেই বিশ্বাসের বাস্তবিকই ফল মিলেছে। স্টারফিশ ইতিমধ্যে প্রায় একশোজন দৃষ্টিহীন প্রফেশন্যালকে প্রশিক্ষণ দিয়েছে ন'টি দেশে।আটটি দেশের ৪৫টিরও বেশি স্টার্টআপের সঙ্গে কাজ করা হয়ে গিয়েছে। একপয়সা ডোনেশন না নিয়েও স্টারফিশে এসেছে এক লক্ষ মার্কিন ডলার।যা এনে দিয়েছেন দীর্ঘসময় কাজ না পাওয়া দৃষ্টিহীনরাই। সদস্যদের ৭০ শতাংশই এখন কাজ করেন, রোজগার করেন।অনেকেই ফুল টাইম বা পার্ট টাইম কাজের সঙ্গে যুক্ত।

দিনে ১৮ ঘণ্টা কাজের সঙ্গে যুক্ত শুভাশিস অনুপ্রেরণা পান কী থেকে? শুভাশিস বলেন, 'সবথেকে বড় অনুপ্রেরণা তো এইসব দৃষ্টিহীন মানুষ। এরাই আমাকে উৎসাহিত করেন।একই বিষয়কে একটু অন্যভাবে দেখা, এটাই আমার কাছে সবচেয়ে বড় আবিষ্কার'।