রঙের নেশাই পরমাকে ঝুঁকি নিতে ফুসলিয়েছে

0

হওয়ার কথা ছিল শিল্পী কিন্তু হয়ে গেলেন কাঠখোট্টা আইনজীবী। আর্ট নিয়ে পড়াশোনার ইচ্ছে থাকলেও, চার প্রজন্মের আইনজীবী পরিবারের মেয়ে পরমা শেষ পর্যন্ত আইন নিয়ে পড়তে ঢুকলেন কারণ আর পাঁচটা বাঙালি পরিবারের মতই চিরাচরিত ধারণা ছিল তার পরিবারেরও যে শিল্প আর উজ্জ্বল কেরিয়ার এ দুটো তো এক সঙ্গে চলে না। প্রতি বছরের পরীক্ষাতেই প্রায় প্রথম স্থান পেলেন, পড়াশোনা শেষে শহরের সব থেকে পুরোনো ও নামী ল্য ফার্মে চাকরি, বিয়ে, সংসার। নিয়ম মতই চলছিল সব। কিন্তু যে মেয়ে ছোটবেলা থেকেই রং, তুলি, ছবি, শব্দের জগতকেই নিজের মনে করেছে, মুক্তি খুঁজে পেয়েছে শিল্পের মধ্যে নেহাতই মোটা মাইনের চাকরির মায়ায় যে সে আটকে থাকবে না সেটাই স্বাভাবিক, হলোও তাই. দীর্ঘ আট বছরের চাকরির সাফল্যও মন ভরাতে পারল না তাঁর।

চাকরির একঘেয়েমি এবং প্রাণের রসদ খুঁজে পাওয়ার তাগিদে যখন দমবন্ধ হয়ে আসছিল পরামার, তখনই ছোটবেলার ভালবাসাই আশ্রয় দিল. “পুরোনো শাড়ি কেটে পর্দা বানানো, চিরুণি দিয়ে গয়না বা বেঁচে যাওয়া কাপড়ে টুকরো দিয়ে কুশন কভার, এসবই বানাতাম শখে, ভালবেসে. মনে হল এটাকে আরও সময় দি, আর যত্নে বড় করি, নিজের সন্তানের মত,” বললেন পরমা। ভাবনা মতই কাজ শুরু, সৃজনশীলতা ও ভালবাসার মেলবন্ধনে গড়ে উঠতে থাকল একের পর এক অসাধারণ শাড়ি, গয়না, হোম ডেকর. বিক্রির মাধ্যম হিসেবে বেছে নিলেন ফেসবুকের পাতা, নাম দিলেন পরমা।

শুধু রং নয়, শব্দ নিয়েও খেলতে ভালবাসেন এই মেয়ে। তার বেশির ভাগ জিনিস বানানোর পেছনে যে ভাবনার উৎস তাও বইয়ের পাতা, গানের কলি বা সিনেমার দৃশ্য থেকে। প্রত্যেকটি প্রডাক্টের সঙ্গে লেখা কবিতা বা গল্প আসলে সেই প্রডাক্টটি বাননোর পিছনে অনুপ্রেরণা, কিছু সত্যি গল্প। শুরুর দিনগুলি কঠিন ছিল, তখনও পূর্ণ সময়ের চাকরিটি করছেন, পাশাপাশি পরমাকে গড়ে তোলা, শিল্পীদের সঙ্গে যোগাযোগ রাখা, ডিজাইন করা, ছবি তুলে ফেসবুকে দেওয়াসব মিলে হিমসিম অবস্থা। দিনে আইনের কচকচি, রাতে বা সপ্তাহান্তে শিল্পের সঙ্গে বাস এভাবেই কাটছিল দিন। তবে আগের ক্লান্তি আর ছিল না, শ্রম বাড়লেও ততদিনে মুক্তির খোঁজ পেয়ে গেছেন পরমা, পেয়ে গেছেন ভালবাসার সন্তান।

বেশ কিছুদিন এভাবে চলার পর পূর্ণ সময়ের চাকরিটা ছেড়ে দিয়ে একটি স্টার্টআপ ফার্মে আংশিক সময়ের চাকরি শুরু করেন। বাকি সময়টা পরমার জন্য। চাকরি ছাড়ার সিদ্ধান্ত নেওয়াটা খুব কঠিন ছিল। “ব্যবসা থেকে লাভ হচ্ছিল ঠিকই কিন্তু চাকরিতে মাসের শেষে যা পেতাম সেই তুলনায় তা কিছুই ছিল না. এদিকে আমার স্বামীও তখন মাত্র বছর দুয়েক হল নিজের ব্যবসা শুরু করেছেন।আর তাছাড়া এতদিন আইনে যে কেরিয়্যার তৈরি করেছিলাম সেটাওপুরোপুরি ছেড়ে দিতে চাইছিলাম না।তাই সপ্তাহে তিনদিন একটি স্টার্টআপ সংস্থার সঙ্গে কাজ শুরু করি।” পরমা বললেন.

পরমার কাজের একটা গুরুত্বপূর্ণ জায়গা রং। আর রয়েছে উন্মাদনা। দুটোই পরমার নিজের চরিত্রের বিশেষ বৈশিষ্ট্য।“আমাকে জীবনে সবথেকে বেশি অনুপ্রেরণা যুগিয়েছে রং।রামধনু, কাঁচের চুড়ি, ক্রেয়নের বাক্স, কাঁচের বয়ামে জেলি লজেঞ্স, প্রজাপতি, গল্পের বই।। যেখানেই রং সেখানেই ছুটে গেছি ছোট থেকে।আঁকা আমাকে অক্সিজেন যোগায়বরাবর।ছবি আর গল্পের মত আর কোনও কিছুই স্পর্শ করে না আমাকে, বললেন পরমা।

পরমার কথায় ফেব্রিক আর শব্দের মিলন হয় তাঁর স্টার্টআপে।“এটা অনেকটা স্কুলের স্ক্র্যাপবুকের মত; আমরা সেখানে ছবি লাগাতাম, স্কেচ পেন দিয়ে তার পাশে নানা উদ্ধৃতি লিখতাম,গল্প লিখতাম...সেরকম। পরমাকে বড় করতে গিয়েও এটাই আমি মাথায় রাখি। শব্দ আর ফেব্রিকের মিশেল পরমা। প্রতিটা প্রডাক্টের একটা গল্প বলার আছে।আমার পেজ-এ যারা আসবেনতাঁরা কিছু নাও কিনতে পারেন।কিন্তু এটাকে যেন তাঁদের আরাম-জায়গা মনে হয়... যেখানে একটা রকিং চেয়ার আছে, কিছু কুশন, একটা বই আর এক কাপ আরাম।ফেব্রিক সেখানে শীতের বিকেলের কমলালেবু-রোদ আর শব্দগুলো বইয়ের গন্ধ।”

পরমার সব থেকে বড় অনুপ্রেরণা তার নিজের শহর কলকাতা।বললেন, “কলকাতা আমার স্বপ্ন দেখার সঙ্গী, প্রিয় বন্ধু, প্রেমিক।কলেজস্ট্রিট বই পাড়া, হলুদ ট্যাক্সি, হাতে টানা রিক্সা, না ফুরোনো কথা, পুরোন বাড়ি, মূর্তি ও সৌধ, রাস্তার পাশের চায়ের দোকান এই সবই আমার সৃষ্টির সঙ্গী।কলকাতার আগোছালো ভাবটা আমায় শান্তি দেয়।এ শহর মোটা মাইনে, সেডান বা বড় বাংলোর আশ্বাস দেয়না। দেয় ট্রাম চড়ার আরাম আর চা খেতে খেতে ছবি আঁকা বা গল্প লেখার আরাম। সেটাই অনেক আমার কাছে।”

পরমার সব জিনিসই হাতে তৈরি।এরজন্য প্রয়োজন দক্ষতা, সময়, ধৈর্য্য।“অনেক জিনিস একসাথে বানালে যা দাম হবে, সেই দামে তো আমি দিয়ে উঠতে পারি না।আমি সব সময়ই ক্রেতাদের বলি, আপনি হাতে তৈরি জিনিস কিনছেন।একজন শিল্পীর সৃজন, সময়, হৃদয়ের একটি অংশ আর শিল্প কর্ম পাচ্ছেন আপনি।দাম সেই অনুযায়ীই হয়।”পরমার মতে যে সব শিল্পীরা তার প্রডাক্ট গুলো বানান তারাই আসল।তিনি তাঁদের সহকারী মাত্র।

ব্যবসা থেকে লাভের একটা অংশ ব্যবসার কাজেই ব্যবহার করেন পরমা।অন্য অংশটা রয়েছে বেড়ানোর জন্য।সারা পৃথিবী ঘুরতে চান পরমা।

পরমার সঙ্গে কথা বলতে গেলে প্রথমেই যা স্পর্শ করবে তা তাঁর আন্তরিকতা, সহজাত উষ্ণতা ও সহজভাবে কথা বলার ক্ষমতা যা আজকের নাগরিক জীবনে বিরল। এই ধুসর পৃথিবীতে সহজ কথা বলাটাও তো একটা শিল্প।