গরলগাছার ফুটবল সংস্কৃতিকে মূল স্রোতে নিয়ে আসাই স্বপ্ন গ্রামের গর্ব রানা ঘরামির 

0

উত্তর চব্বিশ পরগণার ডানকুনি । তারও পরে গরলগাছা । কলকাতা থেকে ট্রেনে প্রায় দু ঘণ্টার যাত্রা । একটা ছোট্ট গ্রাম । এখন অনেকটাই শহরের ছোঁয়া লেগেছে সেই গ্রামে । সেই গরলগাছা স্পোর্টিং ক্লাব আর তার কোচিং ক্যাম্প ।অদ্ভুত এক কোচিং ক্যাম্প । সেখানে কোন প্রতিষ্ঠিত কোচ নেই । যারা ছোটবেলা থেকে বলে লাথি মারতে মারতে মাঝবয়সে পৌছেছেন, তাদের মধ্যেই কেউ না কেউ দাঁড়িয়ে যান ওই ক্যাম্পের ফুটবল শিক্ষার্থীদের সামনে । যে কারণে সেখানে অনেক প্রতিভাময় ফুটবলার থাকলেও তাদের কলকাতা ফুটবলের মুলস্রোতে আসা হয় না ।আতুঁরঘরেই শেষ হয়ে যায় যাবতীয় সম্ভাবনা ।


একটি ছেলে ব্যাতিক্রমি হয়েছিল । আর পাঁচটি ছেলের মতো সেও ছোটবেলায় গরলগাছা স্পোর্টিং ক্লাবের মাঠে ফুটবল নিয়ে পরে থাকত । তখন কি তাকে দেখে মনে হতো খুব সম্ভবনাময়? রানা ঘরামি বলেছিলেন, “সেরকম কিছু নয় । তবে ফুটবল নিয়ে আবেগটা ছিল । দুপুরে খেয়ে দেয়েই ঘড়ি দেখতে শুরু করতাম কখন বিকেল হবে । মাঠে যাওয়ার জন্য ছটফট করতাম ।” রানা ঘরামি আজ গরলগাছার গর্ব । একমাত্র ছেলে যিনি ওই গ্রাম থেকে উঠে এসে মোহনবাগানের জার্সি পরেছেন । এই মরসুমে তার গায়ে আরও একটি বড় ক্লাব মহামেডান স্পোর্টিংয়ের জার্সি । বাংলার সিনিয়র দলের হয়ে তিনবার সন্তষ ট্রফি খেলে ফেলেছেন । তার আগে অনুর্দ্ধ ২১ বাংলা দলের প্রতিনিধিত্ব করা, সিনিয়র বাংলা দলের হয়ে জাতীয় গেমসে চ্যাম্পিয়ন হওয়া- গরলগাছার ফুটবল ইতিহাসে রানাই প্রথম রানা প্রতাপ ।ওর আগে ওই গ্রামের কেউ ওই লাল মাটির পথ দিয়ে দুই কিলোমিটার হেঁটে স্টেশনে গিয়ে দুই , দুই চার ঘণ্টার ট্রেন যাত্রার পর প্রতিষ্ঠিত হতে পারেনি । রানা বললেন, “কাকভোরে বাড়ি থেকে বেরিয়ে প্রায় তিন ঘণ্টা সাড়ে তিন ঘণ্টার ধকল সামলে কলকাতায় এসে প্র্যাকটিস করে আবার বাড়ি ফেরা, ঘুমে চখ জুড়িয়ে আসত ।” তবু ভাল করে ঘুমাতেন না রানা, একটা অব্যক্ত যন্ত্রণা রানার চোখে দেখতেন তার কাকা প্রফুল্ল ঘরামি । যাকে তার ফুটবলার হয়ে ওঠার সমস্ত কৃতিত্ব উৎসর্গ করেছেন রানা । তাই কলকাতা থেকে প্র্যাকটিস করে বাড়ি ফিরে কয়েকঘন্টা বিশ্রাম নিয়ে আবার গরলগাছা স্পর্টিং ক্লাবের মাঠে প্র্যাকটিসে যেতেন রানা । সেটা ২০০৯ এর ঘটনা, তখনও বড় ক্লাবের জার্সি ওঠে নি তার গায়ে ।গরলগাছা স্পোর্টিংয়ের কলকাতায় প্রথম ডিভিশনে খেলা ক্লাব আছে । রানা সেখানে সই করেছেন । গরলগাছা থেকে ময়দানে ঘরের ক্লাবে প্রথম কারোর জার্সি পরা । কাকা তখনও অধিকাংশ দিন ভাইপোর সাথে একই ধকল সামলে থেকেছেন ওর সাথে । রানা বলেছেন, “কাকার নিজের স্বপ্ন ছিল প্রতিষ্ঠিত ফুটবলার হওয়ার, হতে পারেননি নানারকম প্রতিকুলতার জন্য । তাই আমাকে দেখতে চাইতেন একজন প্রতিষ্ঠিত ফুটবলার হিসেবে । তার অধরা স্বপ্ন পুরন করতে চাইতেন আমার সাফল্যের মধ্যে দিয়ে । কি অসম্ভব পরিশ্রম করেছেন আমার জন্য । দিনের পর দিন । আমি যতটুকু সফল হয়েছি তার সবটুকুই কাকার উৎসাহ আর ত্যাগের জন্য ।” ওই লড়াইয়ে রানার একটাই সুবিধা ছিল, কাকা সরকারি চাকরী করতেন । তাই রানার ফুটবলার হয়ে ওঠার লড়াইয়ে যা যা দরকার ছিল তার সবই পেয়ছিলেন রানা । বললেন, “বুটজোড়া, ভাল জার্সি, প্যান্ট, সুষম খাবার সবই কাকার আর্থিক সহায়তায় ।” নাহলে বাবার গরলগাছায় একটা ছোট্ট দোকান থেকে হওয়া নামমাত্র আয়ে রানা হয়তো পারতেন না ফুটবল সংক্রান্ত সমস্ত প্রয়োজন মেটাতে । কিন্তু উৎসাহ সমর্থনের কোন খামতি ছিল না । রানা বললেন, “বাবা, মা যেভাবে কাকার পাসে থেকে আমাকে অপরিসীম উৎসাহ দিয়ে গেছেন এবং এখনও দেন সেই ছবিটাই আমি খেলার আগে দেখি । ওদের উৎসাহই আমার প্রত্যেকদিনের মোটিভেশন ।”

ভারতীয় ফুটবলে রানার প্রিয় ফুটবলার রহিম নবি । তার নবি-দাকে দেখেই রানার ডিফেন্ডার হওয়া । বিশ্বফুটবলে রানার প্রিয় ফুটবলার ইংল্যান্ডের জন টেরি আর ক্রিশ্চিয়ানো রোনাল্ডো । রানার লক্ষ্য কি? ভারতের সিনিয়র দলের প্রতিনিধিত্ব করা । আর ইন্ডিয়ান সুপার লিগে কোন একটা ফ্র্যাঞ্চাইজির দলের জার্সি পরা । আর্থিকভাবে তাহলে আরও সমৃদ্ধ হওয়া যায়। তখন বাবাকে তার বলার ইচ্ছা যে, অনেক বছর ধরে দোকানে যাও । এবার বাড়িতেই বিশ্রাম নাও । এখনও তো রানা ভুলতে পারে নি কলকাতার প্রথম পরিচিত ক্লাব পিয়ারলেসে তার এক লাখ টাকার চুক্তিতে সই করা, চার বছর আগের ঘটনা সেটা । রানা বললেন, “ট্রেনে সেদিন কলকাতা থেকে ফেরার সময় ট্রেনে বসে ভেবেছিলাম কি করব অতগুলো টাকা নিয়ে ।”

হয়তো এই ভাবনাই উৎস । রানাকে কিন্তু ব্যাতিক্রমী করে দিয়ে গেল এই ভাবনার উৎস । তৈরি করে দিল এক অনন্য স্বপ্নের ।যে স্বপ্নের কথা সাধারণত বলতে চান না লাজুক রানা । তার স্বপ্ন গরলগাছা স্পোর্টিং ক্লাবের ফুটবল সংস্কৃতি তৈরি করে যাওয়া । যেখানে এই কোচিং ক্যাম্পের উন্নয়নে বছর তিনেক ধরেই রানা ঘরামি বিনিয়গ করছেন । ফুটবল খেলে রজগারের অনেকটা অংশই রানা দিয়ে দেন কোচিং ক্যাম্পে । যখন যেরকম সাহায্য ক্লাবের লোকেরা তার কাছে চান । আর একটা কাজ রানা নিঃশব্দে করেন । গরলগাছায় যত খুদে ফুটবল প্রতিভা আছে তাদের আর্থিকভাবে সাহায্য করা । রানা বললেন, “এখনও বাড়িতে থাকলে বিকেলে পাড়ার মাঠে যাই । দেখি অনেক সম্ভবনাময় ছেলে খেলে । কিন্তু তারা এত গরিব যে ছেঁড়া বুট পরেই খেলে যায় । তাদের আমি বুট কিনে দিই, জার্সি প্যান্ট কিনে দিই ।” এই দেওয়াটা নিয়মিত চলে । আরও গুরুত্বপুর্ন একটা কাজ রানা করেন । গরলগাছার সম্ভননাময় উঠতি ফুটবলারদের কলকাতায় বিভিন্ন ক্লাবে ট্রায়াল দেওয়ানর চেষ্টা করা । রানা বললেন, “আমি চাই গরলগাছার ফুটবল সংস্কৃতিকে ফুটবলের মূল স্রোতে নিয়ে আসতে । কিন্তু সময় লাগবে । আমার স্বপ্ন, গরলগাছার মানুষ যাতে ভবিষ্যতে আমাকে দেখিয়ে বলতে পারে , এই ছেলেটা গ্রামের জন্যে কিছু অন্তত করেছে ।” পাঁচ ফুট এগারো ইঞ্চির রানা ঘরামি এভাবেই চান নিজের উচ্চতা আরও বাড়াতে ।