"যা ঘটেছে তা বদলাতে পারব না, তবে হারব না"

এক সাধারণ মেয়ের গল্প। এমন এক ঘটনার মুখোমুখি যা আপনারা মাঝেমধ্যেই শুনে থাকেন। অ্যাসিড হামলা। শুনুন সেই গল্প।

0

জীবনে এমন একটি বিশেষ মুহূর্ত আসে, যখন সবকিছু ওলটপালট হয়ে যায়। আমাদের অস্তিত্বকেই প্রশ্নচিহ্নের মুখে দাঁড় করিয়ে দেয়।

আমি বেশ কয়েকজন মানুষকে এইরকম পরিস্থিতির মুখোমুখি দাঁড়াতে দেখেছি। কেউ কঠিন কোনও রোগভোগের পর জীবনকে নতুন ভাবে দেখতে শিখেছেন। কেউ আবার প্রিয়জনকে হারিয়ে বেঁচে থাকার উদ্দেশ্যই হারিয়ে ফেলেছেন। জীবনে অনেক কিছুই ঘটে। সেইসব মুহূর্তে একজন ব্যক্তিকেই ঠিক করতে হয় তিনি কী করবেন, সমাজ তার বিধান দিতে পারে না।

আপনারা নিশ্চয় ভাবছেন কে এই দার্শনিক যে এত কথা বলছে ? কী এমন ঘটেছে তাঁর জীবনে? আমার কাহিনি একটু অন্যরকম। আমিও জীবনে বেশকিছু ঘটনার মুখোমুখি হয়েছি। এর মধ্যে কিছু ঘটনা আমার জীবনটাকে সম্পূর্ণ বদলে দিতেও পারত। কিশোরী বয়সে চলন্ত ট্রেনে ঢিলের আঘাতে আমার নাক ভেঙে গিয়েছিল। কেরিয়ার নিয়ে প্রাণপাত করা, সবচেয়ে প্রিয় মানুষটির সঙ্গে বিয়ে এসবই আমার জীবনটাকে বদলে দিতে পারত।

এর কোনওটাই তেমন কোনও মোড় এনে দেয়নি, যা ঘটল একটি অপ্রত্যাশিত ও দুর্ভাগ্যজনক ঘটনায়। প্রতিশোধ নিতে এক ব্যক্তি আমার গায়ে অ্যাসিড ছুঁড়ে মারল। ঝলসে গেল শরীর।মুখ ও শরীরের দগদগে ক্ষত ঢাকতে বেশ কয়েকবার অপারেশন টেবিলে উঠতে হল। সহ্য করতে হল অসহ্য যন্ত্রণা। যা ঘটেছে তা মেনে নেওয়ার মধ্যেই শান্তি খুঁজে নিতে চেষ্টা করলাম। বেঁচে থাকার তাগিদও আমাকে জাগিয়ে রাখল। শান্তির সন্ধান আর বেঁচে থাকা, দুই-ই এল হৃদয়ের গভীর থেকে। যা ঈশ্বরের বরদান। যা পরবর্তীকালে ঈশ্বর আমাকে দিয়েছেন দুই সন্তানের মাধ্যমে, আমার মাতৃত্বে। একজন মা হয়ে ওঠা আমার জীবনটাকেই বদলে দিল।

স্বপ্নের মধ্যে আয়নায় আমার আগের চেহারা ভেসে উঠত। একসময় ত্বকের উজ্জ্বলতা বাড়াতে কতকিছুই না ব্যবহার করতাম। মুখে কোনও দাগ হলে অস্থির হয়ে উঠতাম। এখন বিউটি প্রোডাক্ট নিয়ে ভাবতে হয় না। আমি এখন যেমন, সেভাবেই স্বাভাবিক থাকার চেষ্টা করি। চারপাশের লোক আমাকে বিস্ফারিত চোখে দেখে। বাচ্চারা দেখলে ভয় পায়। আতঙ্কে চেঁচিয়ে ওঠে। কেউ কেউ তাদের মা-কে জিজ্ঞাসা করে, এই মহিলার চেহারা এমন কদাকার কেন। আমাকে দেখলে লোকজন অনুসরণ করে। কেউ-কেউ পালাতে পারলে বাঁচে। প্রতিবেশী এক শিশু একবার তো আমাকে বলেছিল, আমার মুখ,চোখ, ঠোঁট,হাত দেখে সে আমাকে ঘৃণা করে। আমি নাকি একটা ডাইনি।

ঠিক এখন যদি আপনি আমাকে জিজ্ঞাসা করেন, আমার জীবনের সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য ব্যাপার কোনটা, তাহলে আমি বলব এর কোনওটাই নয়। বরং আমি বলব, যেদিন সেই গর্বিত সিদ্ধান্ত নিলাম, আমার জীবনটাকে আমাকেই নিয়ন্ত্রণ করতে হবে। নিজেকেই সাহস ও শক্তি জোগাতে লাগলাম। আমি বিশ্বাস করতে শুরু করলাম, আমার জীবনে যা ঘটেছে তার জন্য আমি দায়ী ছিলাম না। যা আমি পরিবর্তন করতে পারব না, তা আমাকে নিয়ন্ত্রণ করবে কেন? যা ঘটে গিয়েছে তা মেনে নেওয়ার মধ্যেই শান্তি খুঁজে পেয়েছি। বরং আমি এটাই ভাবি, অতীতে যা ঘটে গিয়েছে তা ভুলে গিয়ে যা গড়ে তুলতে চাই তাতেই জীবনের সার্থকতা।

এই উপলব্ধিটাই আমার শিরায়-শিরায় ছড়িয়ে পড়েছে। হ্যাঁ, আমি জীবনে খারাপ অভিজ্ঞতার মুখোমুখি হয়েছি। কিন্তু তাতে কী? সেই অ্যাসিড হামলা, তার পরবর্তী ঘটনার জন্য তো আমি দায়ী ছিলাম না। এমনকী আমি যতই চেষ্টা করি না কেন, তা আর বদলাতেও পারব না। কিন্তু এখন আমি যা করছি সেটাই আমার সিদ্ধান্ত। তবে বলা যতটা সহজ, কাজে করা ততটা সহজ নয়। কিন্তু বিশ্বাসটা আছে। আমি এত সহজে হারব না। একটা হৃদয়হীন লোক আমার জীবনটাকে নষ্ট করে দিয়েছে এবং তা সত্ত্বেও আমি লড়াই করে বাঁচার চেষ্টা করছি বলে আমাকে দয়া করে সাহসিনী বলে যেন তকমা দেবেন না। আমি কোনও সমবেদনা চাই না। যদি কিছু চাই, সেটা সহযোগিতা। সেই ঘটনায় আমার শরীরটা ঝলসে গিয়েছে ঠিকই, জীবনের দামি কিছু সময় হারিয়ে ফেলেছি, এগুলো বাস্তব। কিন্তু আমার স্বপ্নটা মরে যায়নি। অতিজীবন ফাউন্ডেশন-এর জন্য আমি যা কিছু করেছি, তার জন্য এখন আমি গর্বিত। আমার মতোই যাঁরা একই ঘটনার সাক্ষী হয়েছে, তাঁদের পাশে দাঁড়াতে হবে, এটাই আমার কাজ। আশার আলো জ্বালাতেই হবে। জীবনের অর্ধেকটা যদি শেষ হয়েও গিয়ে থাকে, বাকি অর্ধেকটা এখনও আশায় পরিপূর্ণ।