মাস্টারমশাই এখন ফিল্ম মেকার

0

ক্লাসের সেকেন্ড বয়, কিছুতেই ফার্স্ট হতে পারে না। বাবা-মায়ের চোখ রাঙানি, প্রাইভেট টিউটরের বকবকানি। ‘ফার্স্ট যদি নাই হতে পারে, তবে পড়াশোনায় লাভটা কি?’ ফার্স্ট, ফার্স্ট এবং ফার্স্ট। শব্দটা যেন পারস্য ছুরিকা। কোপায়, মস্তিষ্কে বিঁধে যায়, রক্তাক্ত করে। একদিন ফার্স্টবয়কে ছাদ থেকে ধাক্কা দিয়ে ফেলে সেকেন্ড বয় তার বাবাকে জানায়, আজ থেকে আমিই ফার্স্ট। সেই সেরা।

‘সেরা’ নামের ছুঁই-ছুঁই দশ মিনিটের শর্ট ফিল্মে নীতিকথার কচকচানি নেই। উপদেশ নেই। কিন্তু রয়েছে ধাক্কা। নম্বর কেন্দ্রিক পড়াশোনার মুখে মহম্মদ আলি মার্কা জোরদার পাঞ্চ। ‘সেরা’-র আগে আরও দুটি শর্ট ফিল্ম তৈরি করেছেন সুমিত মৈত্র। ‘দ্য আউটিং’ এবং ‘উত্থান’। যেহেতু ছাত্র পড়িয়ে পেট চালাতে হয়, সেহেতু ছাত্রী-ছাত্রীদের মনের কথাগুলো বুঝতে পারেন। হয়তো সেজন্যই ফিল্মে ঘুরে-ফিরে আসে কচি-কাঁচাদের যন্ত্রণা। নিজের না চাইলেও, যাদের নামিয়ে দেওয়া হয় ইঁদুর দৌড়ে। পরীক্ষায় নম্বর চাই। লক্ষ্যভেদী অর্জুনের নিশানায় যেমন পাখির চোখ, তোমার সে রকম নম্বর।

ফিরে আসা যাক সুমিত মৈত্র-র কথায়। জীবনের রঙ্গমঞ্চে এক একজন মানুষকে কত ভূমিকায় না অভিনয় করতে হয়। সুমিত ছাত্র পড়ান। সমান্তরালভাবে চলে ফিল্ম মেকিং। তিনিই ক্যামেরাম্যান, ডিরেক্টর, এডিটর, প্রোডিউসার এমনকী বিষয় ভাবনাও তাঁর। সুমিতের কথায় ‘‘চেয়েছিলাম এক, হল আর এক। পড়তে চেয়েছিলাম পুণের ফিল্ম ইনস্টিটিউটে, বাড়ির চাপে পড়তে হল ইঞ্জিনয়ারিং-এ।’’ মনে হচ্ছিল, এতো ‘সেরা’ গল্পের অন্য ভার্সান। ইঞ্জিনিয়ারিং হল সেই সিঁড়ি, যা পৌঁছে দেবে সাফল্যের গজদন্ত মিনারে। অতএব নিজের ইচ্ছেগুলোকে বলি দাও। ‘ফিল্ম’ নামের স্বপ্নপাখি যদি ডানা ঝাপটায়, তবে তাকে হাড়িকাঠে চড়াও। সুমিতের বাড়ির সব্বাই উচ্চ প্রতিষ্ঠিত। এ বলে আমায়, ও বলে আমায় গোছের। সেই পরিবারের ছেলে হয়ে কিনা ফিল্ম নিয়ে আদিখ্যেতা। ছোট্টবেলায় পিতৃহারা সুমিত যথেষ্ট মেধাবী। জয়েন্টের মেধা তালিকায় সামনের সারিতে নাম। বাড়ির চাপে পুণের ফিল্ম ইনস্টিটিউটের স্বপ্নটাকে গলা টিপে কার্যত ইচ্ছের বিরুদ্ধেই সুমিত ভর্তি হয়েছিলেন যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের কেমিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং-এ। পাড়া-প্রতিবেশীদের কাছে তখন এই ছেলে আদর্শ, বিধবা মা আশ্বস্ত। যাই হোক, ছেলে পরিবারের মান রাখবে।

অন্ধকার ঘর ডাকে ‘আয় আয়’

ইঞ্জিনিয়ারিং ক্লাসের মোটা বই, রসায়নের জটিলতম ফর্মুলা, পরমাণুর অন্দরে লুকিয়ে থাকা রহস্যময় জগৎ । এদ্দুর পর্যন্ত সব ঠিকঠাক চলছিল। কিন্তু সবার অলক্ষ্যে বিধাতা বোধহয় হাসছিলেন। পাওনাদারের টাকা মেটানোর জন্য শিব্রাম চক্কোত্তি যেমন লেখালেখি শুরু করেছিলেন, সেরকম ছাত্রাবস্থায় সুমিত নামলেন টিউশনিতে। সিনেমা দেখার নেশা পূর্ণ করার জন্য। সপ্তাহে অন্তত পাঁচদিন সিনেমা না দেখলে যেন মুখ বিস্বাদ হয়ে থাকে, মাথা ভারী হয়ে যায়। সিনেমা হলের অন্ধকার ঘর, বিশাল পর্দার দিকে চেয়ে থাকলে যেন মনে হয়, এটাই জীবন। সুমিত বলছিলেন, ‘‘চিত্রনাট্য কীভাবে তৈরি করতে হয়, তা শেখার চেষ্টা করতাম। বোঝার চেষ্টা করতাম আলোর প্রয়োগ, ক্যামেরার ব্যবহার।’’ কালক্রমে সিনেমা হল হয়ে দাঁড়াল পুণের ফিল্ম ইনস্টিটিউট। সর্বক্ষণ যেন সে হাতছানি দিয়ে ডাকে, ‘আয়-আয়’।

১৯৯৩ সালে ইঞ্জিনিয়ারিং পাস করার পরে চাকরি না নেওয়ায় পরিবারের সবাই বিরক্ত। মোটা মাস মাইনের জীবন ছেড়ে সুমিত কিনা যাদবপুরে খুললেন কোচিং সেন্টার। ফিজিক্স-কেমিস্ট্র-ম্যাথমেটিক্স। ‘‘কর্পোরেট চাকরিতে ঢুকলে ফিল্মের স্বপ্নটা শেষ হয়ে যেত। অনেক উপহাস, অনেক বিদ্রূপ সহ্য করার ঝুঁকিটা নিতেই হল।’’ বলছিলেন সুমিত। ধীরে ধীরে কোচিং সেন্টারে ভিড় বাড়ল, উপার্জন বাড়ল। ক্যামেরা কিনলেন সুমিত। এডিট মেশিন, আরও নানান যন্ত্রপাতি।

মাস্টারমশাই কাম ফিল্ম মেকার

তিন তিনটে শর্ট ফিল্ম। অনলাইনের রিলিজ। বিশাল হইচই। প্রশংসার বন্যা। সুমিত বলছিলেন, ‘‘সেরা তৈরি করতে খরচ হয়েছে মাত্র ৬ হাজার টাকা।’’ বিস্ময়ে আমার চোখ তো কপালে ওঠার অবস্থা। হলই বা শর্টফিল্ম। তা বলে এই সামান্য টাকা। ‘‘ক্যামেরা থেকে এডিটিং, এমনকী মেক-আপ সবটাই আমি করেছি বলে খরচ হয়নি। তার ওপর যারা অভিনয় করেছে সব্বাই আমার ছাত্র-ছাত্রী।’’ জানালেন সুমিত।

ডিজিট্যাল ফিল্ম মেকিংকে ধন্যবাদ দেন সুমিত। তাঁর কথায়, ‘‘ডিজিট্যাল ফিল্ম মেকিং সিনেমা তৈরির ধরন বদলে দিয়েছে। প্রযুক্তি যদি জানা থাকে, তবে ফিল্ম ইন্ডাস্ট্রির ওপর নির্ভর করার দরকার নেই। প্রোডিউসারের দরজায় দরজায় ঘুরতে হয় না। গোটা প্রক্রিয়াটা অনেক-অনেক সহজ। খরচও সামান্য।’’ কিন্তু পূর্ণ দৈর্ঘ্যের ছবি... সেই স্বপ্নটা কি অপূর্ণই থেকে যাবে?

ইচ্ছে তো করেই। কিন্তু পড়ানো ছেড়ে দেব শুনলেই ছাত্র-ছাত্রীদের মুখ ভার। শর্ট ফিল্ম আমাকে স্বপ্নপূরণের সুযোগ দিয়েছে। সেটা করছি। করব। হয়তো পূর্ণ দৈর্ঘ্যের ছবিও কোনওদিন...

আমার শেষ প্রশ্ন, নিজেকে সফল বলে মনে করেন?

টাকা-কড়ি দিয়ে আমি সাফল্যকে মাপি না। ছাত্র-ছাত্রীদের বলি, অন্যায় সুযোগ না নিয়ে তুমি যদি তোমার স্বপ্নপূরণ করতে পার, তবে তুমি সেরা। তুমিই সফল। আমি চেষ্টা করেছিলাম, সেটা তো করতে পেরেছি। হ্যাঁ, আমি সফল।

পুনশ্চঃ ইন্টারভিউ শেষ। রাস্তায় হাঁটতে হাঁটতে চোখে পড়ল সাদা ইউনিফর্ম পরা ছেলেকে নিউটনের থিয়োরি বোঝাতে বোঝাতে এগিয়ে চলেছেন বাবা। গন্তব্য স্কুল। সেই থিয়োরি কানে কতটা যাচ্ছিল জানি না। তবে তার চোখ ছিল পাশের মাঠে ফুটবলে মত্ত একদল ছেলের দিকে। কে জানে, হয়তো ওর নামও সুমিত। কি হতে চাও তুমি ফুটবলার নাকি ডাক্তার? প্রশ্নের উত্তরটা আমি জানি। তাই জিজ্ঞেস করিনি।

Related Stories