সাংবাদিক মিতালি এখন চায়েওয়ালি

0

মিতালি চায়েওয়ালি। আজকাল নিজেকে এই নামেই ডাকেন মিতালি মিত্র। এক সময়ের দাপুটে সাংবাদিক। এখন চা বুটিকের মালকিন। লিভস অ্যান অ্যারোমা। শুধু চায়ের দোকান বললে ভুল হবে। আদতে লিভস অ্যান অ্যারোমা হল শহরের কাছে, প্রকৃতির কোলে ইকো পার্কে আড্ডা জোন। নিজেও চায়ের কাপে তুফান তুলে আড্ডা দিতে ভালোবাসেন। তাই নিজের গড়া চা বুটিকেও সবার জন্য চা খেতে এসে বই পড়া, প্রাণ খুলে আড্ডা, গান গাওয়া-সব ব্যবস্থা করে রেখেছেন মিতালি।

নদিয়ার কৃষ্ণনগরে জন্ম। বড় হওয়া, পড়াশোনা সবই সেখানেই। রাষ্ট্রবিজ্ঞানে স্নাতকোত্তর হয়ে পেশা হিসেবে বেছে নেন সাংবাদিকতাকে। ৯২ সালে প্রতিদিন-এ (খবরের কাগজ) যোগ দেন। সেখান থেকে খাস খবর হয়ে তারা নিউজ। অডিও ভিস্যুয়ালে ব্রেকিং নিউজে জুড়ি ছিল না মিতালি মিত্রের। সাংবাদিকতা ছিল মিতালির নেশা এবং পেশা। প্রথম দিকে এডুকেশন বিট, পরে পলিটিক্যাল বিটে সাংবাদিকতায় দক্ষতার স্বাক্ষর রেখেছেন। মহাকরণ, পরে নবান্নের (রাজ্যের প্রশাসনিক সদর দপ্তর) সাংবাদিকদের ঝাঁকে সবসময় হাজির সদা হাস্য মিতালি মিত্র। যারা বাংলা নিউজ চ্যানেলগুলির নিয়মিত দর্শক তাঁদের কাছে মিতালি মিত্র পরিচিত মুখ। খবরের থেকে যাকে আলাদা করে ভাবা যায় না সেই মিতালিই একদিন ঠিক করলেন, অনেক হয়েছে। এবার অন্য কিছু। অন্যকিছু বলতে কী করবেন? খুব বেশি সময় নেননি সিদ্ধান্ত নিতে। ঠিক করে ফেলেন, চায়ের বুটিক করবেন। গোদা বাংলায় চা উইথ আড্ডাবাজি। নিজের জমানো টাকার প্রায় সবটা, ব্যাঙ্ক থেকে লোন, পরিচিতদের কাছ থেকে আর্থিক সাহায্য সবকিছু এককাট্টা করে খুলে ফেললেন চায়ের বুটিক। হঠাৎ চায়ের দোকান কেন? মিতালি বলেন, ‘চা খেতে ভালোবাসি, নিজের হাতে চা বানিয়ে খাওয়াতে ভালোবাসি। কাজের মধ্যে ভালোবাসা না থাকলে সেই কাজ সম্পূর্ণ হয় না। অতএব চায়ের দোকান’।

আর এই ভালোবাসা থেকেই জন্ম লিভস অ্যান অ্যারোমার। ২৩ বছরের সাংবাদিকতা পেশা ছেড়ে বোনঝি সুনেত্রা চৌধুরীকে সঙ্গে নিয়ে রাজারহাটের ইকো পার্কে মিতালির চায়ের বুটিক। পঞ্চাশোর্ধ মিতালির কাছে বয়স শুধু একটা সংখ্যা। তিনি বলেন, মনটাই আসল। মন তাজা থাকলেই পঁচিশে যা সম্ভব, পঞ্চাশেও তাই সম্ভব। তাই এই বয়সে অন্যরা যখন একটু কম পরিশ্রমের কাজ খোঁজেন, এমনকী অবসরের কথাও ভাবেন, মিতালি সেখানে ব্যতিক্রম। সবরকম ঝক্কি, ঝামলা, নতুন করে শুরু করার ঝুঁকি-সব কিছু মাথায় রেখেও অ্যাডভেঞ্চারে নামতে এতটুকু ভয় পাননি নির্ভিক সাংবাদিক মিতালি।ডলিস বুটিক, ওযাইজ আওল আরও অনেক বুটিক দেখে নিজেরও একটা চায়ের বুটিকের স্বপ্ন দেখতেন। সেখান থেকেই লিভস অ্যান অ্যারোমার আইডিয়া।

পরিচিত মহলে এমনিতেই বেশ জনপ্রিয় মিতালি। সব বয়সের সবার সঙ্গে মেলামেশা, সবাইকে আপন করে নেওয়ার প্রবণতা স্বাধীনচেতা মিতালিকে সবার প্রিয় পাত্র। তাই নতুন উদ্যোগ নেওয়ার পর মিতালির পাশে দাঁড়িয়েছে সেই সব বন্ধুরাই। নানাভাবে সবার কাছ থেকে কোনও না কোনও সাহায্য পেয়েছেন। অকপটে স্বীকার করেন মিতালি।

আগেই বলেছি, চা খুব ভালোবাসেন মিতালি। শহরের যত চায়ের ঠেক উত্তর থেকে দক্ষিণ,কোথায় কোন চায়ের কত দাম, কেমন টেস্ট, চা কাপে দেয় না ভাঁড়ে দেয় নাকি কাচের গ্লাসে-সব নখদর্পণে বছর পঞ্চাশের চির তরুণ এই উদ্যোক্তার। আর নিজের স্টলে চায়ের সঙ্গে কোনও আপোষ চান না। তাই দত্তপুকুর থেকে ভাঁড় আসে মিতালির দোকানে। সেই ভাঁড়ে করে পরিবেশিত হয় চা। মসালা টি থেকে শুরু করে দার্জিলিং অর্থডক্স টি, গ্রিন টি, অসম টি, কোল্ড টি যত রকম চা হতে পারে মিলবে মিতালি চায়েওয়ালির কাছে। সঙ্গে আইসক্রিম, ঠাণ্ডা পানীয়, ফিস ফ্রাই, চিকেন নাগেট, ফিস পকোড়ার মতো স্ন্যাকসও রয়েছে। আর আপনি যদি বই পড়তে ভালোবাসেন তাহলে তো কথাই নেই। দত্তপুকুরের ভাঁড়ে মিতালির বানানো চা আর বই হাতে নিভৃতে বসে পড়ুন। চাইলে বই কিনতেও পারবেন এখান থেকে। দোকানের ভেতর যেমন বসার ব্যবস্থা রয়েছে, যারা বাইরে বসে চায়ে চুমুক দিতে চাইবেন তাদের জন্যও ব্যবস্থা রয়েছে। রয়েছে ওয়াইফাইয়ের সুবিধা। মিতালি বলেন, ‘আমার আড্ডা জোন সবার জন্য অবারিত দ্বার। বয়স্করা এসে বই পড়তে পারেন, যতক্ষণ খুশি আড্ডা দিতে পারেন। গান গেয়ে আসর জমিয়ে দিতে পারে কলেজ পড়ুয়ারা। গান, আড্ডা আর চায়ে টিপিক্যাল বাঙালিয়ানা চেয়েছিলাম আমার বুটিকে। সেটাই করতে পেরে আমি খুশি’। চায়ের এই বুটিক ঘিরে মিতালির আরও অনেক প্ল্যান রয়েছে। তাঁর ইচ্ছে রয়েছে মাঝে মধ্যেই গান বাজনার আয়োজন করবেন। ব্যান্ডের উঠতি তারকা থেকে বাউল শিল্পী, আধুনিক গানের শিল্পীরা এসে গান গাইবেন। সমস্যা একটাই। পুঁজি সামান্যই। ওই অল্প পুঁজিতে এখনই সব করে ওঠা সম্ভব হচ্ছে না। মিতালির ভবিষ্যৎ পরিকল্পনার মধ্যে রয়েছে এই সবকিছু।

সাংবাদিকতা থেকে কাট টু চায়ের দোকান। খুব একটা সহজ নয়। হিডকোর কাছ থেকে ওপেন টেন্ডারে ঘর পাওয়া, ব্যাংক থেকে লোন সব ঝামেলা একা হাতে সামলেছেন। খবরের নেশা চায়ে কাটে কি না জানেন না মিতালি। তবে যেভাবে চেয়েছিলেন লিভস অ্যান অ্যারোমাকে দেখতে ঠিক তেমনটাই হয়েছে। দোকানের বই গোছানো থেকে চায়ের কাপ গোছানো, চা বানানো, পরিবেশন সবটা নিজের হাতেই করেন। বোনঝি সুনেত্রা সরকরি কর্মী। অফিস সামলে সন্ধেবেলা ঠিক হাজির মাসির পাশে। মিতালির ইচ্ছে, এরপর তাঁর চায়ের দোকানেই বাচ্চাদের জন্য কিডস কর্নার করে দেবেন, যাতে বাবা-মায়ের সঙ্গে বাচ্চারও এসে সমান উপভোগ করতে পারে।

ব্যবসা এখানে ধীরে ধীরে জমে উঠছে। এবার কলেজ স্ট্রিট, লেকটাউন এবং দক্ষিণ কলকাতা জুড়ে জনবহুল এলাকায় লিভস অ্যান অ্যারোমার শাখা খোলার ইচ্ছে রয়েছে মিতালির। শুধু চা নয়। মনে মনে মিতালির ইচ্ছে ডানারা মাঝে মাঝেই পাহাড়ে ঢুঁ মারে। কার্শিয়ং, কালিম্পংয়ের মতো জায়গায় হোমস্টে অর্থাৎ পর্যটকদের স্থানীয়দের বাড়িতে রেখে সেখানকার সংস্কৃতিকে কাছ থেকে বোঝার, জানার সুযোগ করে দেওয়ার ইচ্ছে রয়েছে তাঁর। তাতে পর্যটকদের থাকার খরচ যেমন কম পড়বে, স্থানীয় মানুষেরও রোজগারের রাস্তা খুলবে। নতুন নতুন নানা ব্যবসার আইডিয়া গিজগিজ করছে মিতালির মাথায়। দু একবার রেকিও করে এসেছেন। তবে এখন নয়। আপাতত মিতালি নিজের হাতে চা খাওয়ানোতে মন দিয়েছেন। ইকো পার্কের প্রকৃতি আর মিতালির হাতে তৈরি চায়ে চুমুক দিয়ে জমিয়ে আড্ডার এই সুযোগ মিস করবেন না কিন্তু।