এক টুকরো জাপানের সন্ধান পাবেন কলকাতাতেও

1

এর আগে মামাগোতোর হদিস দিয়েছি আমরা। দক্ষিণ পূর্ব এশিয়ার স্বাদ চেখে দেখার জন্যে মামাগোতো আইডিয়াল প্লেস। কিন্তু জাপানি রান্না! পাবেন কোথায়! হদিস দিলেন কলকাতার এক উদ্যোগপতি পলাশ বন্দ্যোপাধ্যায়। ফুজি দ্য জাপানিজ রেস্তরাঁ। ২০৯-এ শরৎ বোস রোডে। জিভে জল আনা সব রেসিপি। কলকাতায় পাওয়া যাচ্ছে জাপানি খাবার। এটাই এখন খবর।

জাপান বললেই আমাদের এক অতি পরিচিত বন্ধুর কথা মনে পড়ে। শান্তিনিকেতনের ছাত্র, শান্তিনিকেতনেই বাড়ি। নীলাঞ্জন বন্দ্যোপাধ্যায়। এক সঙ্গে কাজ করেছি আমরা। একটি বেসরকারি টেলিভিশন চ্যানেলে সাংবাদিকতার কাজ। সেখানেই প্রথম আলাপ হয়েছিল নীলাঞ্জনের সঙ্গে। জাপানের সংস্কৃতি সেদেশের সাহিত্য রাজনীতি সমাজ নিয়ে রীতিমত গবেষণা করতেন নীলাঞ্জন। ওর মাতৃভাষা বাংলা হলেও জাপানি ভাষার প্রতি দারুণ ঝোঁক। বহুবার জাপানে গিয়েছেন। জাপানি সাহিত্যিক কবি বন্ধুদের আমন্ত্রণ জানিয়েছেন ভারতে। সাংস্কৃতিক কূটনীতিক নীলাঞ্জনের বাড়ির নাম জাপানি, পোষা কুকুরের নামও। জাপানি ফুল, জাপানি ক্যাকটাস, জাপানি অর্কিডে সুন্দর সাজানো ওর বাগান।

কিন্তু কলকাতায় যে পরিমাণ চিনে সংস্কৃতির রমরমা, যে পরিমাণ বিলিতি কালচার গড়াগড়ি খাচ্ছে সে পরিমাণ জাপানি শিল্প সাহিত্য সংস্কৃতির উপস্থিতি কম। অথচ কূটনৈতিক দিক থেকে এবং ঐতিহাসিক অনুষঙ্গে জাপান ভারতের দীর্ঘদিনের মিত্র। চিনের চেয়ে ঢের অন্তরঙ্গ। শান্তিনিকেতনে রবিঠাকুরের দৌলতে ভারত জাপান মৈত্রীর একটা সুর বাধা হয়েছিল। নেতাজি সুভাষ চন্দ্র বসুর সঙ্গে জাপানের একটি রাজনৈতিক বোঝাপড়া হয়েছিল। বাংলা সাহিত্যের জাপানি ভাষায় অনুবাদও হয়েছে প্রচুর। টোকিও শহরে রবীন্দ্রচর্চার কেন্দ্র আছে। টোকিওতে বৈশাখী মেলার আয়োজন করেন সেদেশের বাঙলা ভাষাভাষী মানুষ। খুব সম্প্রতি জীবনানন্দ দাশের বনলতা সেন কবিতার জাপানি অনুবাদও দারুণ জনপ্রিয় হয়েছে সূর্যোদয়ের দেশে।

আপনি কি জানেন, বারাসতে এক ভদ্রলোক থাকেন নাম বিপুল কৃষ্ণ দাস। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র। ১৯৯১ সাল নাগাদ গিয়েছিলেন জাপানে। সেদেশের ভাষা সাহিত্যের প্রতি কৌতূহল নিয়ে। ফিরে এসেছেন ১৯৯৯ সাল নাগাদ। ২০০৫ নাগাদ বারাসতে খুলে ফেলেছেন তার শাকুরা ট্যুরস অ্যান্ড ট্র্যাভেলসের ব্যবসা। ভারত বাংলাদেশ এবং জাপানের মধ্যে একটি সাংস্কৃতিক সেতু তৈরি করেছেন একেবারে নিজের উদ্যোগে। জাপানি পর্যটকদের নানান পরিষেবা দেওয়া হয় তাঁর সংস্থার মারফত। পাশাপাশি শুরু করেন জাপানি ভাষা শিক্ষার কেন্দ্র শাকুরা আকাদেমি। এই আকাদেমিতে আপনি যেমন ভাষা শিখতে পারেন, তেমনি পাবেন জাপানের সাহিত্য সংস্কৃতি নিয়ে কাজ করার সুযোগ। অনুবাদের কাজ থেকে শুরু করে সেদেশের বিভিন্ন সাংস্কৃতিক এবং সামাজিক বিষয় নিয়ে গবেষণাও করা যাবে এই সংস্থার মারফত।

পাশাপাশি মধ্যমগ্রামে একটি সেলুনও জাপানি সেলুন। নামটা ইংরেজি হরফে নয় বড় বড় করে লেখা জাপানি হরফে নিপ্পন সেলুন। খুব একটা সচরাচর দেখা যায় না এরকম জাপানি সংস্কৃতির বিস্তার। যেমন খুব সচরাচর দেখা যায় না জাপানি খানার আয়োজনও। তবে ফুজিতে আপনি প্রবেশ করলেই টের পাবেন আপনি কলকাতায় এমন একটি ঠিকানায় আছেন যেখান থেকে আগ্নেয়গিরি খুব দূরে নয়। এমন গন্ধ মম করে, যেন পেটের ভিতর ঢেকুর তোলে হোক্কাইডো। জাপানি রসুইয়ে সুগন্ধ আপনাকে অভ্যর্থনা জানাবে। কলকাতায় বসে শান্ত স্নিগ্ধ অথচ হাইটেক জাপানকে উপভোগ করতে চাইলে চমকে ভরা জিভে জল আনা রেসিপি আর পানীয়ের এটাই সব থেকে ভালো সন্ধান। চ্যালেঞ্জের সুর ফুজির ম্যানেজিং ডিরেক্টর পলাশ বন্দ্যোপাধ্যায়ের গলায়।

বাঙালির মাছ-ভাত যেমন সুশি জাপানিদের জন্য ঠিক সেরকমই। স্বাদে গন্ধে রেসিপিতে ফুজির সুশি অথেনটিক স্বাদ বজায় রেখেছে। সুশি ছাড়াও ট্যামপুরা, কুশিয়াগেও জাপানের খুব জনপ্রিয় খাবার। ব্রেকফাস্টের জন্য মাইসো স্যুপ উইথ রাইস, তাছাড়া লাঞ্চ এবং ডিনারে রামেন বাউলস পছন্দ করেন জাপানিরা। একই মেনু একই রেসিপি এবং পদের নামগুলোও এখানে এক রাখা হয়েছে।

পাতের পাশে চপস্টিক তো থাকছেই। কিন্তু অভ্যাস না থাকলে ও যুদ্ধে গিয়ে কাজ নেই। কাঁটা চামচও আছে। এবার চোখ বুলিয়ে নিন মেনুর দিকে। বুটা নিরাতামা, সাকনান মিসোঝুকা, আবুরা সোবা নামগুলি যদি মাথার ওপর দিয়ে উড়ে যাচ্ছে তবে পরিবেশনকারীদের ডেকে জেনে নিন কোনটা কী পদ কীভাবে রান্না হয়েছে। হরে দরে প্রতি প্লেট কমবেশি শ'পাচেক টাকা পড়বে। ফলে আর দেরি কেন। জাপান এবং আপনার জিভকেও একটু সুযোগ দিন।