উদ্যোগে মেয়েদের অংশগ্রহণ কম কেন?

0
(টেকস্পার্কস ৬ এর পর প্ৰশ্নটা ঘুরে ফিরে এল। উত্তর খুঁজলেন ইওর স্টোরির প্রতিষ্ঠাতা এবং প্রধান সম্পাদক শ্রদ্ধা শর্মা।)

“সঠিক প্রশ্ন না করলে সঠিক উত্তর পাওয়া সম্ভব নয়। বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই সঠিকভাবে করা প্রশ্নই তার উত্তরের দিক নির্দেশ করে। সঠিক প্রশ্নই রোগ নির্ণয়ের অ-আ-ক-খ। অনুসন্ধিৎসু মনই পারে সমস্যার সমাধান করতে”, এডওয়ার্ড হডনেট।

মেয়ে হয়ে জন্মানো প্রায় একটি অপরাধ বলেই গণ্য হয়। মেয়েদের নিচু করে দেখাটা আমাদের সমাজের একটা অভ্যেস। সেখান থেকে কঠোর পরিশ্রম ও নিরলস চেষ্টায় (বেশিরভাগ মেয়েই যা করে থাকেন) আমি আজ এই জায়গায় পৌঁছতে পেরেছি। মহিলা উদ্যোগপতিদের জন্য যথেষ্ট না করার অভিযোগও ওঠে আমার বিরুদ্ধে।

আমার ঠাকুমা আমাকে জিজ্ঞেস করেন, “বিহারের মহিলাদের জন্য তুমি কী করছ?” আমার ঠাকুমা একজন কট্টর নারীবাদী। ১৬ বছর বয়েসে বিয়ে হয় তাঁর, ১৮ তে বিধবা। তারপর পড়াশোনা করে রাজ্যের প্রথম মহিলা সিভিল সার্ভেন্ট হওয়া। তাঁর মতে HerStory ও সেখানে আমার কাজই যথেষ্ট নয়, আমার উচিত ভাগলপুরে যেসব মহিলা শ্রমিক রেশম কারখানায় কাজ করতে গিয়ে তাঁদের হাত হারিয়েছেন তাঁদের সঙ্গে দেখা করা। ঠাকুমা আরও অনেক এরকম গল্প বলেন যা আমাকে আজও শিহরিত করে। অবসর গ্রহণের পর জাগো বহেন নামে একটি এনজিও শুরু করেন ঠাকুমা। বিহারের মহিলাদের সশক্তিকরণই উদ্দেশ্য, আমি তখন স্কুলে পড়তাম, স্কুলের পর ঠাকুমাকে কাজে সাহায্য করতাম। আমি আজ যা, তার অনেকটাই সেই কাজের অভিজ্ঞতার প্রতিফলন।

লিঙ্গ সমতা আমার কাছে খুবই ব্যক্তিগত একটি জিনিস। আমি মহিলা ইস্যু নিয়ে কথা বলা থেকে বিরত থাকি কারণ অনেক আগেই আমি বুঝেছি কথা বলে কিছু হয় না, করে দেখাতে হয়। আমি আমার রাজ্যের মেয়েদের কাছে একজন উদাহরণ হওয়ার জন্য কঠোর পরিশ্রম করি, তাঁরা যাতে বোঝে আমি পারলে তারাও পারবে।

শুরুয়াতি ব্যবসার যে দুনিয়ায় আমি বর্তমানে বাস করি সেখানে প্রায়শই প্রযুক্তি শিল্পে মহিলারা, প্রযুক্তি সংক্রান্ত কনফারেন্সে মেয়েদের কম সংখ্যা ইত্যাদি বিষয় আলোচনা হয়। এই আলোচনা আমাকে বেশ অবাক করে। এই ধরণের আলোচনা প্রয়োজনীয় হতে পারে, কিন্তু তা শুধুই আলোচনা। আর আমি আলোচনায় অংশগ্রহণ করতে চাই না, আমি চাই কাজ করতে। তাই আজ আপনাদের কাছে অনুরোধ কসমেটিক প্রশ্নের বাইরে গিয়ে ভাবনাচিন্তা করুন। যখন আমরা প্রশ্ন করছি তখন সঠিক প্রশ্নটি যেন করি। যে প্রশ্ন গভীর ভাবনা দাবি করে। আসুন আমরা উত্তর খুঁজি এক এবং সমবেতভাবে।

প্রশ্নগুলিতে যাওয়ার আগে আমি একটু আমার গল্প বলি। গত মাসে আমি এক সপ্তাহের বেশি সময় দিল্লিতে কাটিয়েছি, তিনদিন কাটিয়েছি TechSparks এ। মানে আমি বাড়িতে প্রায় ছিলামই না। গত সাত বছর ধরে, যখন থেকে আমি নিজের এই উদ্যোগ শুরু করেছি তখন থেকেই এভাবে চলছে। ঘরোয়া কর্তব্যের কথা না ভেবেই এটা আমি করেছি,কারণ আমার স্বামী আর আমি দু’জন দু’জনকে নিজেদের কাজে সহায়তা করি। স্বামী আমাকে আমার কাজের জন্য অনুমতি দেয় না, সে জানে আমার কাজ আমার কাছে ততটাই গুরুত্বপূর্ণ যতটা তার কাজ তার কাছে। আর লিঙ্গের কারণে যে কাজের গুরুত্ব কমে না তা সে জানে।

টেক স্টার্টআপ ইভেন্টের প্যানেলে কেন বেশি সংখ্যক মহিলার অংশগ্রহণ নেই এই প্রশ্ন লিঙ্গ বৈষম্য বিষয়ে বিশ্লেষণে অক্ষম। সত্যিই যদি লিঙ্গ সমতা নিয়ে ভাবতে হয় তাহলে আরও অনেক গভীরভাবে ভাবা প্রয়োজন। কেন আরও বেশি সংখ্যক মহিলা নিজেদের উদ্যোগ শুরু করছেন না? কেন বেশি সংখ্যক মহিলা উদ্যোগপতি বিনিয়োগ পাচ্ছেন না? কেন ভারতের কোনও মহিলা চালিত উদ্যোগ ইউনিকর্ন হয়ে উঠছে না? কেন বেশি সংখ্যক মহিলা বিনিয়োগকারী নেই? এই রকম আরও শত সহস্র কেন-র উত্তর খুঁজতে হবে আমাদের।

শুধু মহিলাদের নয়, সমাজকে এর উত্তর খুঁজতে হবে, আর তার শুরু আমাদের পরিবারে। আমি বাবা-মায়েদের জিজ্ঞেস করব, আপনার মেয়ে যদি প্রায় সবসময়ই বাড়ির বাইরে থাকে, দিনের ২৪ ঘণ্টাই নিজের নতুন উদ্যোগ নিয়ে ব্যস্ত থাকে, আপনি খুশি হবেন তো? কতটা সমর্থন করবেন তাকে? সমাজকে জিজ্ঞেস করব আপনার ভাইঝি, নাতনি বা বন্ধুদের আপনি কতটা উত্সাহিত করবেন তাদের নতুন উদ্যোগের জন্য দিনরাত্রি খাটতে? বাড়ির কাজ বা প্রতিবেশীরা কী ভাববে সেই চিন্তা না করে।

আমি পুরুষদের জিজ্ঞেস করব, যদি আপনার স্ত্রী, প্রেমিকা বা বোনের কেরিয়ার বা উদ্যোগের সাফল্যের জন্য আপনার থেকে এমন কোনও সাহায্য প্রয়োজন হয় যাতে আপনাকে নিজের কেরিয়ারে কিছু ত্যাগ স্বীকার করতে হয় আপনি তাতে কতটা স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করবেন?(মেয়েরা সবসময়ই যা করে থাকে)।

বিনিয়োগকারীদের কাছে আমার প্রশ্ন তারা কী মনে করেন, একজন মহিলা উদ্যোগপতি, যে তাঁর কাছে বিনিয়োগের জন্য এসেছেন, কাজের ক্ষেত্রে আবেগতাড়িত না হয়ে ঠিক ততটাই দক্ষতার সঙ্গে কাজ করতে পারবেন যতটা তাঁর পাশের পুরুষটি পারবেন? তাঁরা কী মনে করেন একটি মহিলা পরিচালিত স্টার্টআপ-এর ইউনিকর্ন হয়ে ওঠার ক্ষমতা রয়েছে?

প্রশ্নগুলি কঠিন, প্রযুক্তি শুরুয়াতির সমাবেশে বেশি সংখ্যক মহিলাকে আনলে বা একজন মহিলাকে ১৫ মিনিটের জন্য মঞ্চে তুললেই এই প্রশ্নের উত্তর মিলবে না। প্রযুক্তি ইকো-সিস্টেম, স্টার্টআপ ইকো-সিস্টেম, সাধারণ কর্মীদের মধ্যে মহিলার সংখ্যা বৃদ্ধি পেলে স্বাভাবিকভাবেই এইধরনের অনুষ্ঠানে মহিলা বক্তার সংখ্যা বৃদ্ধি পাবে। আর সবথেকে গুরুত্বপূর্ণ হল মহিলাদের নিজেদের মূল্য সম্পর্কে সচেতন হওয়া ও তা দাবি করা।

একজন মহিলাকে, শুধুমাত্র সে মহিলা বলে মঞ্চে ১৫ মিনিট বলার সুযোগ দিলে এই সমস্যার সমাধান সম্ভব নয়। তা সম্ভব যখন আমরা আমাদের বাড়িতে শুধুমাত্র স্ত্রী বা বোনের ক্ষেত্রে নয়, আমাদের কন্যা সন্তানদের জন্মের দিন থেকে তাকে যোগ্য মূল্য দিতে শুরু করব। (মনে রাখা দরকার যেকোনো চ্যালেঞ্জ, সাফল্য, ব্যর্থতা বা দুর্ঘটনায় আমাদের প্রতিক্রিয়া নির্ভর করে আমাদের বড় হওয়ার অভিজ্ঞতার ওপর)।

একটি নির্দিষ্ট সময়ের পর একটা বড় অংশের শিক্ষিত মহিলা পারিবারিক ও সামাজিক চাপে কাজ ছেড়ে দিতে বাধ্য হন। পরিবারকে সবকিছুর আগে না রাখার জন্য পরিবার, আত্মীয় ও প্রতিবেশীরা তাঁকে অপরাধী করে। এই অপরাধ বোধ ছাড়া কাজ চালিয়ে যাওয়ার জন্য যে সমর্থন প্রয়োজন তা তাঁদের থাকে না। ইঞ্জিনিয়ারিং, প্রযুক্তি বা ম্যানেজমেন্ট ক্ষেত্রে কাজ মহিলাদের মধ্যে এটা বেশি করে দেখা যায়। তাঁরা সাধারণত তুলনামূলক ভাবে কম চ্যালেঞ্জিং কোনও কাজ বেছে নেন, এই সমঝোতা অধিকাংশ ক্ষেত্রেই “আনন্দদায়ক” হয়, কারণ এতে অপরাধ বোধ দূর হয় এবং তাঁদের কাছে কিছু করারও থাকে। (ঘটনাচক্রে, কেরিয়ারের এই বদল বেশিরভাগ সময়েই খুব সফল হয় কারণ এই মহিলারা এক্ষেত্রে নিজেকে ছাপিয়ে যেতে চান)।

পৃথিবী একটি যুদ্ধক্ষেত্র, এবং প্রত্যেক নারী, প্রতিটি পুরুষের মতোই নিজের মেধার জোরে সেই যুদ্ধে লড়াই করতে চায়, যার সঙ্গে তাঁর লিঙ্গের কোনও সম্পর্ক নেই। সদর্থক কাজের গুরুত্ব রয়েছে, গুরুত্ব রয়েছে মহিলাদের বিভিন্ন প্যানেলে অংশগ্রহণেরও। কিন্তু এগুলি মূলস্রোতের অভিমুখে সাময়িক যাত্রাপথ হতে পারে, পথের শেষ কখনোই নয়।

টেকস্পার্কস ২০১৫ এর কথাই ধরুন, এতে হ্যাকাথন ছিল, আগামী দিনের সবথেকে সম্ভাবনাময় টেক স্টার্টআপ বা প্রযুক্তি শুরুয়াতিদের নিয়ে আসা হয় এখানে (টেক৩০), ৩০০০ অংশগ্রহণকারী ও ১২টিরও বেশি স্পনসর ছিল এই অনুষ্ঠানে। এটা আয়োজন করেছিল ইওরস্টোরি, একটি মহিলা পরিচালিত সংস্থা। কিন্তু আমরা জেন্ডার-অ্যাগনস্টিক, এবং সেটা আমরা গর্বের সঙ্গে বলি। আমরা আমাদের ওয়েবসাইটে একটা ফর্ম দিয়েছিলাম যেখানে আপনি নিজের নাম একজন বক্তা বা প্যানেলিস্ট হিসেবে মনোনীত করতে পারেন। আমরা মোট ২০০ টি মনোনয়ন পেয়েছিলাম যার মধ্যে একডজনেরও কম মহিলা। অনেক ক্ষেত্রে মহিলারা পুরুষের নাম মনোনয়নের জন্য পাঠিয়েছেন।

তাই মহিলা উদ্যোগপতিদের কাছে আমার আবেদন, উদ্যোগের এই ইকো সিস্টেমে নিজেকে দৃশ্যমান করুন, দৃশ্যমান হোন নিজের কাজের ক্ষেত্রে এবং বাড়িতে। মহিলা প্রতিনিধিত্ব কম নিয়ে ময়না তদন্ত না করে নিজের অধিকার দাবি করুন। মহিলা উদ্যোগপতিরাই রোল মডেল হয়ে উঠতে পারেন। নিজের এই অবস্থানকে ব্যবহার করুন অন্যদের এগিয়ে আসার জন্য উত্সাহিত করতে। আপনি যদি নিজে না করেন অন্যরা কি করে জানবে যে এটা করা যায়?

সমাজ হিসেবে, বাবা-মা হিসেবে, ভাই-বোন-স্বামী-স্ত্রী হিসেবে, আত্মীয় হিসেবে, প্রফেসর, শিক্ষক এবং মেন্টর হিসেবে, বন্ধু হিসেবে আমাদের মহিলা ও মহিলা উদ্যোগপতিদের সহায়তা করতে হবে, তাঁরা ছেলে হলে ঠিক যেমনটা করা হত। এরজন্য নারীবাদী হওয়ার প্রয়োজন নেই, একজন ভালো মানুষ হিসেবেই আপনি তা করতে পারেন। আর মহিলাদের উদ্দেশ্যে বলব, কারও সাহায্যের ওপর নির্ভর করার প্রয়োজন নেই। সাফল্যের দিকে এগোনোর ক্ষেত্রে তা আপনার গতিকে রুদ্ধই করবে। মহাত্মা গান্ধীর একটি বক্তব্যকে সবসময় আমি মানি, “তুমি নিজে সেই পরিবর্তন হয়ে ওঠো যে পরিবর্তন তুমি এই পৃথিবীতে দেখতে চাও”।