প্রেসিডেন্টের মর্জি, তাই রাস্তায় কালো গাড়ি মানা

1

তোমার কথার রঙ কি লাল, হলুদ সবুজ হালকা নীল অথবা শুভ্র শরৎকাল... সেই গানে রাজনীতির রং নিয়ে কথা কথান্তর করেছিলেন কবীর সুমন। দেশকাল নির্বিশেষে রঙ আর রাজনীতি মিলে মিশে গিয়েছে। গেরুয়া ভারতে কমলা রঙের দারুণ দাপট। চিন চেনে রক্তের লাল রঙ। কোথাও দেখবেন সোনালি হলুদের বিস্তার। জয়পুর যখন গোলাপি হল তখনও রীতিমত উন্মাদনার স্তরে চলে গিয়েছিল। রাতারাতি বাড়ির রঙ বদলে গোলপি করার হিরিক দেখেছিল রাজস্থান। ২০১১ সালের পর যখন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় ক্ষমতায় এলেন তারপর আমরা সবাই প্রত্যক্ষ করেছি। লাল মহাকরণ সাদা নীল আলোয় ঢেকে ফেলা হল। মাদার টেরেজার কলকাতায় এখন নীল আর সাদা রঙের সাজ। 

গুরবাঙ্গুলি বেরদিমুখামেডভ, তুর্কমেনিস্তানের প্রেসিডেন্ট
গুরবাঙ্গুলি বেরদিমুখামেডভ, তুর্কমেনিস্তানের প্রেসিডেন্ট

এবার চলুন তুর্কমেনিস্তানে। সেখানে গোটা দেশটাই ধবধবে সাদায় ঢাকা। কালো কিংবা গাঢ় রং সে দেশের প্রেসিডেন্টের দু চক্ষের বিষ। এতটাই, যে সব বাড়ির রঙ সাদা করতে বাধ্য করেছেন তিনি। এবার কালো গাড়ি নিয়ে রাস্তায় বেরলেই সরকার সেটা সিজ করে নেবে বলে হুমকি দিয়েছেন। নিজের দেশের রাস্তায় একটিও কালো গাড়ি দেখতে চান না গুরবাঙ্গুলি বেরদিমুখামেডভ। তুর্কমেনিস্তানের প্রেসিডেন্টের এমন অদভুতুড়ে খেয়ালে মাথায় হাত সেদেশের কালো গাড়ির মালিকদের। মাথায় হাত দিয়ে বসে সময় নষ্ট করলে তো আর চলবে না। গাড়ির গায়ে নতুন রঙ না চড়ালে যে কোনও সময় হাপিস! তুলে নেওয়া হবে গাড়ি। কারণ ইতিমধ্যে দেশের রাজধানী আশগাবাতে কালো গাড়ি নিষিদ্ধ হয়ে গিয়েছে।

আসলে কালো গাড়ি ব্যান করার স্বৈরাচারী সিদ্ধান্ত বিশাল হিমশৈলের চূড়া মাত্র। সেদেশের নাগরিক জীবনের প্রতিটি পদক্ষেপ সরকার দ্বারা নিয়ন্ত্রিত। মানবাধিকার কমিশনের পর্যবেক্ষণ, ‘বিশ্বের সবচেয়ে উৎপীড়নকারী রাষ্ট্র তুর্কমেনিস্তান। ব্যাক্তি স্বাধীনতার কোনও মূল্য নেই, সংবাদমাধ্যাম আর ধর্মীয় স্বাধীনতাও নেই। মানবাধিকার ও সমাজকর্মীরা সরকারের রক্তচক্ষুর শিকার’।

এহেন দেশে কালো গাড়ির মালিকরা ভয়ে শিঁটিয়ে আছেন। যেকোনও সময় তাদের গাড়ি তুলে নিয়ে যেতে পারে সরকারি কর্মীরা। যতদিন পর্যন্ত সাদা রং করা হবে না ততদিন পর্যন্ত সরকারের ঘরেই জমা থাকবে গাড়িগুলি। সমস্যা হল উর্ধ্বমুখী চাহিদার কারণে গাড়ি রং করার খরচ প্রতিদিনই বাড়ছে। অনলাইন সংবাদপত্র দ্য ডিপ্লোম্যাট জানাচ্ছে, গাড়ি নতুন করে রং করতে এখন ৭০০০ মানাটস মানে ১৯৯৬ ডলার খরচ করতে হচ্ছে। এক সপ্তাহ দেরি করলে সেটা দাঁড়াবে ৩,১৩৭ ডলারে। অথচ শহরের বেশিরভাগ মানুষের গড় আয় ১০০০ মানাটস। যদিও গাড়ির রং নিয়ে নতুন আইন চাপানোর কোনও লিখিত প্রমাণ নেই। তবু প্রেসিডেন্টের সফেদ প্রেমের কথা অজানা নয় কারও। সারা আশগাবাত শহর সাদা বাড়িতেই ঢেকে দিতে চান তিনি। আকাশ থেকে একটা সাদা দেশ যাতে চোখে পড়ে এমন ভাবে সাজাতে চান তুর্কমেনিস্তানকে।

প্রেসিডেন্টের শখের ঠ্যালায় অবশ্য সবচেয়ে বেশি সাদা বিল্ডিংয়ের জন্য গিনেস বুকে নাম তুলে ফেলেছে আশগাবাত শহর।

এদিকে পরিহাস দেখুন। দেশ কিন্তু রসাতলে যাচ্ছে। আর্থিক সঙ্কট তৈরি হয়েছে। বিঘ্নিত হচ্ছে দেশের নিরাপত্তা। এতে সবচেয়ে বেশি ভুক্তভুগি দেশের জনসংখ্যার বড় অংশ। এমন পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে আটা, চিনি, তেলের দাম ক্রমশ বাড়ছে। নগদ টাকা বাজার থেকে কমে যাচ্ছে। এটিএম ফাঁকা পড়ে থাকছে। এমনকী বিদেশে তুর্কেমেনদের দিনে ৫০ ডলারের বেশি ক্যাশ তোলা বারণ হয়ে গিয়েছে। এরই মধ্যে সেপ্টেম্বরে এশিয়ান ইন্ডোর ও মার্শাল আর্টে ভালো ফলের জন্য আশগাবাতে সরকারি কর্মীদের বেতন ২০ থেকে ৩০ শতাংশ বাড়িয়ে দেওয়া হয়েছে। নিন্দুকেরা বলছে ওটা আসলে সরকারিমোহর লাগানো ‘ঘুষ’!