বিক্রির জন্যে সেজে গুজে তৈরি বাংলার মণীষিরা

0

রাজা পোদ্দার। ফিল্মের অ্যাসিটেন্ট ডিরেক্টর হিসেবে কাজ করেছেন। সাহিত্যকর্মী লেখক, পেশায় সাংবাদিক এবং শেষ পর্যন্ত দু দুটি পাবলিকেশনের কর্নধার। তাঁর জীবনে একটা লক্ষ্য আছে। তিনি জিনিয়াস খুঁজে বেড়ান। পাশাপাশি তিনি চান সত্যজিৎ রায়, সুকুমার রায়, চার্লি চ্যাপলিনদের প্রাত্যাহিক জীবনের অংশ করে তুলতে। কিন্তু কীভাবে? আসুন রাজা পোদ্দারের সেই গল্পই শুনি।

নবদ্বীপে জন্ম, বড় হওয়া এবং স্কুলে পড়াশোনা। কলকাতায় মামার বাড়ি। সেখানে থেকে পড়াশোনার সময় শুধুমাত্র শখের বশেই টালিগঞ্জের স্টুডিও পাড়ায় যাতায়াত শুরু হয়। প্রোডিউসর, ডিরেক্টর, কুশলীদের সঙ্গে ধীরে ধীরে বন্ধুত্ব গড়ে ওঠে। একসময় রাজা ছিলেন টলিপাড়ার চেনা মুখ। ঘোরাঘুরি করতে করতেই শতরূপা সান্যাল, সীমান্ত চক্রবর্তীর সঙ্গে সহকারী পরিচালকের কাজ করার সুযোগ পান। তার সঙ্গে চলতে থাকে নানা ম্যাগাজিনে লেখা। ফ্রিল্যান্স করতেন আজকালের মতো পত্রিকায়। এরই মধ্যে চাকরি পেয়ে যান নিউজ চ্যানেলে। এনই বাংলা, আর প্লাস, চ্যানেল টেন, ওঙ্কারে সাংবাদিকতা করেন দীর্ঘদিন। কিন্তু নিজের ব্যবসা বা তেমন একটা কিছু করার ইচ্ছে মাথায় ঘুরত সবসময়।

উনজন, দ্য মাইনরিটি নামে বন্ধুর একটি পাবলিকেশন ছিল। বন্ধুর অফিসে মাঝে মাঝেই ঢুঁ মারতেন। কাজ দেখতেন। উদ্বুদ্ধ হয়ে খুলে ফেলেন খোয়াবনামা নামে নিজের পাবলিকেশন। ২০১৩ সালে নবীন কবি সুব্রত রায়ের ‘কবিতা লেখাটা ছল’ নামে কবিতা এবং ছবির বই প্রকাশ দিয়ে শুরু হয় খোয়াবনামার যাত্রা। কিন্তু চাকরি আর ব্যবসা, দুটো একসঙ্গে চালানো সম্ভব হচ্ছিল না রাজার পক্ষে। খোয়াবনামায় সেভাবে সময় দিতে পারছিলেন না। ঠিক সেই সময় বাংলা মিডিয়ারও টালমাটাল অবস্থা। রাজা ঠিক করলেন, আর চাকরি নয়, মন দেবেন খোয়াবনামায়।

বছর দেড়েক আগে বন্ধুর উনজনকেও অধিগ্রহণ করে নেয় রাজার খোয়াবনামা। দু দুটো পাবলিকেশন একরকম একার হাতেই চালান তরুণ উদ্যোক্তা। রাজা বলেন, ‘খোয়াবনামা হল প্রান্তজনের কথা। যাদের কথা লোকে কম বলে। চারপাশে অনেক প্রতিভা রয়েছে যাদের কথা জানতেই পারে না কেউ। তাদের সামনে নিয়ে আসাই খোয়াবনামার খোয়াব’। এখনও পর্যন্ত রাজার এই পাবলিকেশন দুটি বই প্রকাশ করেছে। প্রথমটি হল শাহজাদ ফিরদাউসের ‘অঙ্গুলি মাল’। দ্বিতীয়টি প্রকাশিত হবে এবারের বইমেলায়। বেশ মজার নাম। ‘দশ শব্দ, দশ গল্প, দশ ছবি’। লেখকও দশ জনই। কোনও গল্পই দশ শব্দের বেশি নয়। রাজার আশা, বই মেলায় নজর কাড়বে এই বইটি। উনজনের ৬টি বই ইতিমধ্যে প্রকাশিত হয়েছে। বাদল সরকারের শেষ সাক্ষাৎকার, সবুজ মুখোপাধ্যায়ের ‘২৪ নম্বর শ্যামাপদ রোড’, বিশ্বদেব মুখোপাধ্যায়ের ‘কালো ফসল’, রন্তিদেব সেনগুপ্তর দুটি বই ‘জঙ্গলমহলের ডায়েরি’ এবং ‘সন্ন্যাসীর ঠিকানা’ প্রকাশিত হয়েছে।

খোয়াবনামার নতুন ভেঞ্চার পোস্টার ডিজাইন, বুকমার্ক, কফি মাগ ডিজাইনিং। রাজা বলেন, ‘পোস্টারে চার্লি চ্যাপলিন, বব ডিলনদের যেভাবে দেখা যায় রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, সত্যজিৎ রায়, সুকুমার রায়, জীবনান্দ দাসদের দেখা যায় না বললেই চলে। নতুন প্রজন্মের কজন চোখে গোল চশমার ফ্রেম আঁটা সুকুমার রায়কে দেখেছে বলা মুশকিল। জীবনানন্দ, বিনয় মজুমদার, ভাস্কর চক্রবর্তীর মুখ অনেকে চেনেই না। সিনেমার দৌলতে ঋত্বিক ঘটক, সত্যজিৎ রায়দের মুখগুলো অবশ্য এখনও বিস্মৃতি অতলে তলিয়ে যায়নি। আমাদের পোস্টারে উঠে আসবেন বাংলার সেই মনীষিরা। বাংলার নতুন প্রজন্মের কাছে ভূমিপুত্রদের প্রাত্যাহিক জীবনের সঙ্গে জড়িয়ে দিতে চাই’। পোস্টার থেকে বুকমার্ক, কফিমাগের গায়ে সত্যজিৎ, সুকুমার, জীবনানন্দের মুখ জ্বলজ্বল করে খোয়াবনামার দৌলতে।

রাজার সঙ্গে রয়েছেন দুই ডিজাইনার কুশল চক্রবর্তী এবং সুব্রত রায়। একেবারে নিজের পুঁজির ওপর ভরসা করে শুরু করছিলেন ব্যবসা। প্রথমে ভালো লাগার জায়গা থেকে কাজ শুরু করেন, পরে অবশ্য রুজির টানে পাকাপাকিভাবে ব্যবসায় নেমে পড়া। ধীরে ধীরে ব্যবসা আরও বাড়াতে চান। সেই সঙ্গে নিজের সংস্থায় বহু লোকের কর্মসংস্থান হবে বলেও আশা তরুণ উদ্যোক্তার।