ঘরোয়া টোটকার হাত ধরে সফল ব্যবসা

0

মাত্র ২৭ বছর বয়সেই কষ্টকর শারীরিক সমস্যায় ভুগছিলেন শ্রেয়া সারন। অ্যালার্জি আর ত্বকের সমস্যা তাঁকে কুড়ে কুড়ে খাচ্ছিল। ‌যখন সব ওষুধই জবাব দিয়েছে তখন নেহাতই নিজের তৈরি ঘরোয়া জিনিস দিয়ে স্নান শুরু করেন শ্রেয়া। সেইসঙ্গে খাওয়া দাওয়ার ধরণে বদল ও জীবন ধারণ পদ্ধতিতে বদল আনেন তিনি। আর তাতেই ম্যাজিক। কিছুদিনের মধ্যেই জীবন থেকে বিদায় নেয় দীর্ঘদিনের অ্যালার্জি ও ত্বকের সমস্যা। তাঁর এই টোটকার কথা নিজেই বিস্তারিতভাবে একটি সোস্যাল নেটওয়ার্কে জানান শ্রেয়া। শ্রেয়া অবাক হয়ে যান সোস্যাল নেটওয়ার্কে তাঁর এই ঘরে তৈরি টোটকার সম্বন্ধে বিস্তারিত জানতে কত মহিলা লিখে পাঠাচ্ছেন। বাজারে যে ত্বকের যত্নের জন্য প্রয়োজনীয় প্রাকৃতিক জিনিসের একটা বিশাল চাহিদা আছে তা তাঁর বুঝতে দেরি হয়না।

বাজার চাহিদা বুঝতে পারার পর আর সময় নষ্ট করেন নি শ্রেয়া। দ্রুত চাকরিতে ইস্তফা দিয়ে সাবানের বাজার, স্কিন কেয়ার ফরমুলেশন ও প্রসাধনী শিল্প সম্বন্ধে বিস্তর পড়শোনা শুরু করেন। সেই সঙ্গে বাড়িতেই চলে বিভিন্ন ত্বক পরিচর্যার সামগ্রি তৈরির জন্য গবেষণা। ২০১০ থেকে ২০১২ সাল পর্যন্ত নিরলসভাবে এই পড়াশোনা ও গবেষণার কাজ চালিয়ে যান শ্রেয়া সারন। অবশেষে ২০১২ সালে তাঁর হাত ধরে জন্ম নেয় ‘বাস্ট অফ হ্যাপিনেস’। এখানে বিভিন্ন ধরণের ত্বকের জন্য পণ্য তৈরি শুরু করেন শ্রেয়া। উল্লেখজনকভাবে তাঁর তৈরি সব পণ্যই হয় ভেগান এবং কীটনাশকহীন।

এখানেই থেমে থাকেননি শ্রেয়া। মানুষ ঠিক কী ধরণের ত্বকচর্চার সামগ্রি চাইছেন তা জানতে একটা নির্দিষ্ট সময়ের ব্যবধানে মতামত সংগ্রহ শুরু করেন তিনি। যা তাঁকে চাহিদামত নতুন নতুন ত্বকচর্চার সামগ্রি তৈরিতে উৎসাহ যোগায়। তবে একাজ শুনতে যতটা সহজ কাজে করা ততটা নয় সহজ নয়। একটা নতুন পণ্যকে বাজারে আনতে কয়েকমাসের পরিশ্রম লাগে। প্রথমে খুঁজতে হয় চাহিদামত জিনিস বানাতে ঠিক কী কী উপাদান প্রয়োজন। তেল থেকে শুরু করে উদ্ভিদজাত সামগ্রি খুঁজে বার করতে যথেষ্ট পড়াশোনা লাগে বলে জানালেন শ্রেয়া। এরপর দেখা হয় এগুলো কতটা পরিমাণ করে মেশালে তবেই সবচেয়ে ভাল ফল পাওয়া যায়। একটা সাবান জাতীয় সামগ্রি তৈরি করতে অনেকগুলি মিশ্রন তৈরি করা হয়। তারপর সেগুলিকে বিভিন্ন মরশুমে পরীক্ষা করা হয়। কোনও রাসায়নিক না থাকায় খুব স্বাভাবিকভাবেই এগুলি বিভিন্ন মরশুমে বিভিন্ন রকমভাবে সামনে আসে। এবার এগুলি বন্ধুবান্ধব ও ইচ্ছুক স্বেচ্ছাসেবীদের ওপর ব্যবহার করেন শ্রেয়া। তারপর তার ফলাফলের ওপর ভিত্তি করেই নতুন পণ্যের চূড়ান্ত রূপ দেন তিনি।

নিজের কর্মচারি তো আছেই। কিন্তু ‌যখন কাজের চাপ খুব বেশি থাকে তখন সাবান কাটা, সেগুলোকে প্যাক করা, লেবেল লাগানোর মত কাজে পরিবার ও বন্ধুদের থেকে প্রচুর সাহা‌য্য পান শ্রেয়া। তবে শ্রেয়ার এই পথচলা প্রথম দিকে খুব সুগম ছিল না। অর্থনৈতিক একটা সমস্যা তো ছিলই। সেইসঙ্গে সব কাজ নিজেকে করতে হত। যত দিন এগোলো শ্রেয়া বুঝতে পারলেন তাঁর কাজকে দ্রুত এগিয়ে নিয়ে যেতে হলে বাইরে থেকে কিছু কাজ করিয়ে আনাও জরুরি। ত্বকচর্চার বিভিন্ন সাবান তৈরি করতে গিয়ে বহু মানুষের কাছে তাঁকে যেতে হয়েছে। অভিজ্ঞদের কাছ থেকে তথ্য যোগাড় করতে হয়েছে। তবে সেনা পরিবারের মেয়ে শ্রেয়া কখনও হার মানেনি। সবকিছু অতিক্রম করে এগিয়ে যাওয়ার শক্তি তিনি পারিবারিক সূত্রেই পেয়ে গিয়েছিলেন।

সেনা পরিবারেই জন্ম। সেনা পরিবারেই বিয়ে। ফলে সারা জীবন দেশের বিভিন্ন শহরে ঘুরতে হয়েছে তাঁকে। তবে ছাত্রাবস্থার অনেকটা কেটেছে পুনেতে। তাই নিজেকে পুনের বাসিন্দা বলতেই ভালবাসেন শ্রেয়া। পুনের ফারগুশন কলেজ থেকে অর্থনীতিতে স্নাতক। তারপর মুম্বইয়ের জেভিয়ার ইন্সটিটিউট থেকে অ্যাডভারটাইজিং এণ্ড মার্কেটিংয়ে পিজিডিএম করেন তিনি। পরে আবার পুনে গিয়ে সিম্বায়সিস ইন্সটিটিউট থেকে এমবিএ সম্পূর্ণ করেন শ্রেয়া সারন। এমবিএ শেষ করে নিজের পছন্দের মানুষের সঙ্গেই ঘর বাঁধেন শ্রেয়া। এককথায় না করে দেন বিশাল সংস্থায় চাকরি। সেখানে স্বামীর সঙ্গে ঘোরাকেই জীবন হিসাবে বেছে নেন তিনি। শ্রেয়া মনে করেন তাঁর মধ্যে একটা জিপসি হৃদয় আছে। ‌যা তাঁকে নতুন নতুন জায়গা আবিষ্কার করার অনুপ্রেরণা দেয়।

শ্রেয়া তাঁর কাজে কর্মচারি হিসাবে অধিকাংশ স্কুলে না যাওয়া মহিলাদের চাকরি দিয়েছেন। শ্রেয়ার মতে, এঁরা সংস্থার কাগজে কলমের কাজে সাহায্য করতে পারে না। ইংরাজিতে লেখা হওয়ায় লেবেল পড়তে পারেন না। কিন্তু এঁরা নিজেদের মত করে গুছিয়ে কাজ করেন। তাঁদের সুবিধার জন্য সংস্থায় সব কাজ হিন্দিতে শুরু করেছেন শ্রেয়া। তাঁরা বিশ্বাস, কাউকে নতুন কিছু ভাবার স্বাধীনতা দিলে তাঁর মধ্যে দুর্দান্ত একটা সমস্যা সমাধানের দক্ষতা তৈরি হয়।

শ্রেয়ার এগিয়ে চলার অনুপ্রেরণা তাঁর ক্রেতা ও পরিবারের লোকজন। ক্রেতারা যখন শ্রেয়ার তৈরি কোনও সামগ্রি ব্যবহার করে সুফল পান তখন চিঠি লিখে ভাল ভাল কথা লেখেন। পরিবারের লোকজন বাহবা দেন। এগুলোই তাঁকে এগিয়ে চলার শক্তি দেয়। আপাতত তাঁর সবচেয়ে বেশি সংখ্যক ক্রেতা ২৫ থেকে ৩৫ বছর বয়সী মহিলা। আগামী দিনে শিশুদের জন্যও সাবান তৈরিতে হাত দিয়েছেন শ্রেয়া সারন। এখন সেই লক্ষ্যপূরণেই ব্যস্ত তিনি।